আমিরাতবিহীন ওপেক কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিরতা ডেকে আনবে

কোলাজ

প্রায় ছয় দশকের সদস্যপদ শেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এই তেল জোটের কাঠামোয় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনে সক্ষম এবং ভবিষ্যতে আরও উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য ধরে রাখা তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক সদস্যকে হারানোর ফলে ওপেক জোটের মূল কাজ, অর্থাৎ তেলের জোগান নিয়ন্ত্রণ ও দাম স্থিতিশীল রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠবে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে গেলে আমিরাত নিজের মতো করে উৎপাদন বাড়াতে পারবে। আর সেটি তারা করলে তা তেলের দাম কমিয়ে দিতে পারে এবং বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্ত শুধু জ্বালানিনীতির পরিবর্তন নয়।

এর মধ্যে আরও বড় বার্তা লুকিয়ে আছে। এটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত আর নিজেকে আটকে রাখতে চাইছে না। বরং তারা বিশ্বাস করছে, তাদের ভবিষ্যৎ উপসাগরীয় ঐক্যের ওপর নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার ওপর নির্ভর করছে।

সংযুক্ত আবর আমিরাতের ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়টাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং যুদ্ধপরিস্থিতির কোনো সমাধান না থাকায় উপসাগরের সব তেল উৎপাদকই এখন চাপে আছে।

এ অবস্থায় আমিরাতের জ্বালানিমন্ত্রী সুহাইল মোহাম্মদ আল মাজরুই জানিয়েছেন, তাঁদের ওপেক ত্যাগের ফলে স্বল্পমেয়াদে তেলের দামে বড় প্রভাব পড়বে না। এতে ওপেক ও তার সবচেয়ে বড় সদস্য সৌদি আরব তাৎক্ষণিক চাপ থেকে বেঁচে যাচ্ছে। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরেকটি সত্য। সেটি হলো—স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাদের এই সিদ্ধান্ত অনেক বেশি প্রভাব ফেলত। অর্থাৎ, যুদ্ধপরিস্থিতির আড়ালে আমিরাত এমন একটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে, যা তারা আগে থেকেই নিয়ে রেখেছিল।

এর ভূরাজনৈতিক প্রভাবও গভীর। ওপেককে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের ক্ষমতার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো। সেই জোট থেকে বেরিয়ে এসে আমিরাত কার্যত সৌদি নেতৃত্বকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। দুই দেশের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই অবনতির দিকে যাচ্ছিল। গত কয়েক বছরে আমিরাত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের বাইরে প্রায় ৩০টি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি করেছে। এতে বোঝা যায়, এই জোটের ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় তারা কতটা বিরক্ত ছিল।

পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে আমিরাতের এই পদক্ষেপ আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হতে পারে। কারণ, এতে তেলের জোগান বাড়বে, দাম কমবে, ওপেক দুর্বল হবে এবং উপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হবে। কিন্তু এর জন্য পশ্চিমকে অনেক মূল্যও দিতে হবে। আমিরাত যত বেশি স্বাধীন হবে, তত বেশি তারা অন্য শক্তির ওপর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে সৌদি আরব পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে এমন পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যেগুলো নির্দিষ্ট শ্রমনীতির শর্ত পূরণ করে না। পাশাপাশি বহুজাতিক সংস্থাগুলোকে সৌদিতে আঞ্চলিক সদর দপ্তর স্থাপন করতে চাপ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা সরকারি চুক্তি পেতে পারে। গত এপ্রিল থেকে এই নিয়ম আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়েছে। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

তবু অর্থনৈতিক দিক থেকে দুই দেশ এখনো গভীরভাবে যুক্ত। তাদের বাণিজ্য ও আর্থিক সম্পর্ক হঠাৎ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট—আমিরাত আর সৌদি নেতৃত্বের অধীন থেকে সিদ্ধান্ত নিতে রাজি নয়। তারা এমন কোনো আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে থাকতে চায় না, যা তাদের কাছে খুব সীমাবদ্ধ বা সৌদি আরবের পক্ষে বেশি সুবিধাজনক বলে মনে হয়।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন ঘটছে। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘর্ষ আমেরিকা, আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে এক নতুন নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও জোরদার করেছে।

আরও পড়ুন

এই সম্পর্কের ভিত্তি আগেই স্থাপিত হয়েছিল আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর যৌথ প্রতিক্রিয়ায় অসন্তুষ্ট ছিল আমিরাত। ফলে তারা এখন মনে করছে, তাদের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ওয়াশিংটন ও জেরুজালেম, রিয়াদ নয়। ওপেক ত্যাগের সিদ্ধান্ত তাই শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং বিশ্ববাজারের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। সেই বার্তাটি হলো—আমিরাত এখন বৈশ্বিক জোটের মাধ্যমে নিজের পথ তৈরি করবে, সৌদি নেতৃত্বের ছায়ায় নয়।

এই পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই অঞ্চলজুড়ে দেখা যাচ্ছে। এমনকি আরব লিগ বা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ থেকেও বেরিয়ে যাওয়ার মতো বিষয় নিয়ে এখন আমিরাতের নীতিনির্ধারক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে এমন কোনো পদক্ষেপের সম্ভাবনা নেই, কিন্তু এটুকু নিশ্চিত—দীর্ঘদিন ধরে আরব কূটনীতিতে সৌদি আরবের যে প্রভাব ছিল, তা আর আগের মতো স্বতঃসিদ্ধ নয়।

এর ফলে অঞ্চলের বিভিন্ন সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। ইয়েমেন, সুদান, সোমালিয়া, সিরিয়া ও লিবিয়ায় দুই দেশ ইতিমধ্যেই ভিন্ন পক্ষকে সমর্থন করছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইয়েমেনে হুতিবিরোধী জোটের ভেঙে পড়া এই বিভেদের একটি বড় উদাহরণ। ভবিষ্যতে এই প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে, যেখানে দুই দেশই নিজেদের প্রভাব বিস্তারে আরও বেশি বিনিয়োগ করবে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতগুলো আরও দীর্ঘায়িত হবে।

পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে আমিরাতের এই পদক্ষেপ আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক মনে হতে পারে। কারণ, এতে তেলের জোগান বাড়বে, দাম কমবে, ওপেক দুর্বল হবে এবং উপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হবে। কিন্তু এর জন্য পশ্চিমকে অনেক মূল্যও দিতে হবে। আমিরাত যত বেশি স্বাধীন হবে, তত বেশি তারা অন্য শক্তির ওপর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে সৌদি আরবও তার প্রভাব পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন করে চাপের মুখে পড়বে। উপসাগরের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি যখন আর সমন্বয়ের ভানও করছে না, তখন ছোট দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন নতুন মিত্র খুঁজবে। এতে সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়বে।

তেলের বাজারে দাম কমা বা ওঠানামা সামলানো সম্ভব। কিন্তু উপসাগরের যে আঞ্চলিক কাঠামো এত দিন স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল, সেটি ভেঙে পড়লে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আরও বিভক্ত, অনিশ্চিত ও অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠতে পারে।

  • রাবাহ আরেজকি আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তারিক এম ইউসুফ ব্রুকিংস দোহা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক।
    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।