এ রকম বিদ্যা অর্জন করতে করতে পাখিটা একদিন মারা যায়। পাখির শিক্ষাদানের দায়িত্বে নিয়োজিত ভাগিনাকে ডেকে রাজা বলেন, ‘“ভাগিনা, এ কী কথা শুনি।” ভাগিনা বলিল, “মহারাজ, পাখিটার শিক্ষা পুরা হইয়াছে।” রাজা শুধাইলেন, “ও কি আর লাফায়?” ভাগিনা বলিল, “আরে রাম!” “আর কি ওড়ে?” “না।” “আর কি গান গায়।” “না।” “দানা না পাইলে আর কি চেঁচায়।” “না।”’

মুন্সী প্রেমচাঁদের বড়দাও শিক্ষকদের চাপে এই একই পদ্ধতি বেছে নিতে বাধ্য হন। ‘তিনি সব সময় বই নিয়ে বসে থাকেন’, আর ছোট ভাইকে উপদেশ দেন, ‘বিদ্যা অর্জন করতে হয় কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে। সব সময় বই মুখস্থ করতে হয়। নইলে একটা অক্ষরও পারবে না তুমি।’

ছোট ভাই খেলতে চাইলে তিরস্কার করে বলেন, ‘আমি রাতদিন বসে আছি, সেটা তো তুমি দেখতে পাচ্ছ। তুমি তো দেখতে পাচ্ছ আমি কোনো উৎসব-অনুষ্ঠানে যোগ দিই না। আমি কখনো ক্রিকেট বা ফুটবল খেলি না বা তার থেকে অনেক দূরে থাকি। তবুও আমি একেক ক্লাসে দু-তিন বছর পার করে দিই...বিদ্যাশিক্ষা অত সহজ ব্যাপার নয়।’ তীব্র তিরস্কারে ছোট ভাইয়ের হুঁশ ফেরে। কঠিন প্রতিজ্ঞা করে। কিন্তু ‘মাঠের সেই সোনালি ঘাস, মৃদুমন্দ বাতাসের হাতছানি, ফুটবল, কাবাডি ও ভলিবল খেলার উত্তেজনায়’ সেই প্রতিজ্ঞা বাতাসে উড়ে যেতে
দেরি হয় না।

বড়দা যে এই শিখন-শেখানো পদ্ধতি পছন্দ করতেন, তা নয়। জ্যামিতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলছেন, সবকিছু মুখস্থ করার পরও এ বি সির জায়গায় এ সি বি লিখলেই সব শেষ। কোনো পরীক্ষকই ছাত্রদের কথা চিন্তা করেন না। বইয়ের রচনায় যা আছে, তা–ই তাঁরা অভ্রান্ত বলে ধরে নেন। ছেলেদের তাই শিখতে বলেন। তাঁরা চান, ছেলেরা প্রতিটি লাইন যেন হুবহু পরীক্ষার খাতায় উগরে দেয়। আর এই উগরে দেওয়ার নামকেই সাদা বাংলায় বলে শিক্ষা।

এই সব নীরস বিষয় পড়ে কার কী উপকার হবে, বলা শক্ত। ‘অন্তত বড়দার নিজের তো কোনো লাভ হয় না। তাঁকে তো এক এক ক্লাসে দু-তিন বছর পার করতে হয়।’ অন্যদিকে লেখাপড়ার পাশাপাশি ইচ্ছেমতো খেলাধুলায় মজে থাকলেও ছোট ভাই ক্লাসে প্রথম হতে থাকে।

তবে তোতা পাখির মতো মুখস্থ করা কি কোনো কাজেই আসে না? কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে কাজে আসে না, তা নয়। যেমন ইংরেজি যেসব শব্দের বানান নিয়ম মেনে চলে না, সেগুলো তো মুখস্থ করতেই হবে। নামতা মুখস্থ না করলেই বরং বিপদ। সংগীতের ক্ষেত্রেও তা–ই। প্রার্থনার সময় যদি সুরা বা মন্ত্র মুখস্থ না থাকে, তাহলে আপনার মনোযোগ বিঘ্নিত হবে। অন্যদিকে এমন মানুষও আছেন, যাঁরা বোঝার ঝামেলায় না গিয়ে সরাসরি মুখস্থ করতেই বেশি পছন্দ করেন।

তবে সব মিলিয়ে তোতা পাখির মতো মুখস্থ করলে যে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি, তা বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। লিন্ডা জ্যাকবসন দেখেছেন, এ ধরনের বিদ্যাচর্চা একটি গোটা জাতির সূক্ষ্মচিন্তনদক্ষতা কমিয়ে দেয়। অ্যাটকিনসন নামের আরেকজন গবেষক দেখেছেন, তোতা পাখির মতো শব্দ মুখস্থ করলে তার মাত্র ২৮ শতাংশ মনে রাখা যায়। আর আবেগ-অনুভূতি দিয়ে, বুঝেশুনে এবং ‘নেমোনিক’ বা ‘মেমোরি প্যাল’-এর মতো কৌশল ব্যবহার করে শব্দ শিখলে কমপক্ষে ৮৮ শতাংশ মনে রাখা সম্ভব।

নিউরোবিজ্ঞানে এর খুব পরিষ্কার ব্যাখ্যা আছে। মানুষ কোন জিনিস সহজে মনে রাখতে পারবে আর কোনটি পারবে না, সেটা তার মাথা স্ক্যান করলেই বোঝা যায়। যেমন কোনো শব্দ শেখার সময় কোনো শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্স, হিপোক্যাম্পাস এবং প্যারাহিপোক্যাম্পাল কর্টেক্সের আশপাশের এলাকাগুলো যদি সক্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে, সে ওই শব্দ মনে রাখতে পারবে।

কিন্তু যদি দেখা যায় যে শুধু ফ্রন্টাল কর্টেক্সটাই সামান্য নড়াচড়া করছে, তাহলে বুঝতে হবে যে শিক্ষার্থীর পক্ষে শব্দটি মনে রাখা কঠিন হবে। আমরা যখন বুঝেশুনে, আবেগ-অনুভূতি বা সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কোনো কিছু শিখি, তখন মস্তিষ্কের সংশ্লিষ্ট সব অংশ তৎপর হয়ে ওঠে আর তোতা পাখির মতো মুখস্থ করলে কেবল ফ্রন্টাল কর্টেক্স সক্রিয় হয়।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে তোতা পাখি বা বড়দার মতো করেই লেখাপড়া করে আসছি। কিন্তু এখন সেই পদ্ধতি পাল্টানোর সময় এসেছে। আশা করি, নতুন শিক্ষাক্রমে এ বিষয়ে নজর দেওয়া হবে।

  • সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক মাউশি ও নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক