ক্ষমতাবানের জন্য শিথিল, সাধারণের জন্য কঠোর—এই দ্বিচারিতা কেন

প্রতীকী ছবি

সাম্প্রতিক সময়ে চুরি, ছিনতাই, ভাঙচুর, জমি দখল, মব আচরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পারস্পরিক কাদা–ছোড়াছুড়ি, অশ্লীলতার ব্যাপক বিস্তার—সব মিলিয়ে আমাদের চারপাশে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এসব কারণে মানুষের মনে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ভর করেছে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরি, ছিনতাই, জমি দখল ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। কার জমি কে কবে দখল করেছিল, কেন করেছিল—তারা এখন সোচ্চার হয়েছে পুরোনো জমির দখল ফিরে পেতে।

কেউ আবার প্রভাব খাটিয়ে অন্যের জমি নিজের করতে শুরু করেছে দখল–সন্ত্রাস। সংবাদমাধ্যমে অনেক সংবাদ না এলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব নিয়ে বেশ উত্তেজক শিরোনাম দেখা যায়—‘তোলপাড়’, ‘বিস্ফোরক’ ইত্যাদি সংবাদ। দিনদুপুরে কিংবা রাতের আঁধারে কারও সম্পদ ও নিরাপত্তার ওপর এ ধরনের আঘাত কারোই কাম্য নয়।

তবে ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। কিছুদিন আগে ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানের একটি প্রতিবেদনের জন্য যমুনা নদীর তীরে আলমডাঙ্গা বলে একটি গ্রামে গিয়েছিলাম। নদীভাঙনকবলিত মানুষদের দুঃখ আর অসহায়ত্ব দেখে ভীষণ কষ্ট লেগেছে। একাধিকবার ভিটাহারা মানুষ নদীতীরে বসে বসে দেখছেন নদীর স্রোত। কারও বাড়ি ভেঙেছে ২০ বার, কারও ২১ বার, কারও ১৬ বার।

আরও পড়ুন

এমনিভাবে বহুবার ভিটাহারা হয়েছেন যমুনাতীরের এই মানুষগুলো। যমুনায় বিলীন হয়েছে তাঁদের বসতভিটা। হারিয়ে যাওয়া ভিটার ওপর দিয়ে বহমান স্রোত দেখছেন নদীতীরে বসে কয়জন বৃদ্ধ। নিজের বসতভিটা হারানো মরিয়ম বিবি বললেন, ‘ভেবেছিলাম আমার ভিটাতেই মরমু, কিন্তু যে হারে ভিটা ভাঙতাছে, এহন কোন ভিটায় যে মরমু জানি না।’

শহর থেকে দূরে এক নিভৃত নির্জন গ্রামের এসব অসহায় মানুষকে নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ নেই আমাদের বড় কর্তাদের, রাজনৈতিক নেতাদের। সবাই ব্যস্ত যাঁর যাঁর কর্মসূচি নিয়ে; কিন্তু এই অসহায় মানুষগুলো যে একের পর এক ভিটা হারাচ্ছেন, দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নদীতীরের এই গ্রামগুলো, সেদিকে যেন কারও দৃষ্টি নেই।

আইনকানুন দিয়ে মানুষের জীবন, সম্পত্তি, সমাজ ও দেশ নিয়ন্ত্রিত হলেও নদীর ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। নদীর স্রোতকে থামানো যায় না। এর জন্য প্রয়োজন আবেগ-অনুভূতি-ভালোবাসা। এই মানুষগুলোর কষ্ট লাঘবে নদীভাঙন রোধে নিতে হবে কার্যকর ব্যবস্থা।

কারণ, এই মানুষগুলো কারও জমি দখল করেন না; ভাঙনের কারণে এক জায়গা থেকে সরে গিয়ে আশ্রয় নেন আরেক জায়গায়—অন্যের জমিতে। তাঁরাও ভালোবেসে তাঁদের আশ্রয় দেন, উচ্ছেদ করেন না। সবহারা এই সহজ-সরল মানুষগুলোর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।

আরও পড়ুন

আসলে অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে প্রয়োজন আইনের যথার্থ প্রয়োগ। মানুষ চায় ন্যায়বিচার, সব রকম অনিয়ম থেকে মুক্তি। কিন্তু বিচারপ্রার্থীরা যদি ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে হয়রানি, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হন, তাহলে আইনের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা থাকবে কীভাবে?

নিয়ম জানা, নিয়ম মানা, কথায়–কাজে ষোলো আনা এমনটি আজকাল প্রায় দেখাই যায় না। নিয়মিত অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মূলত আইনের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। আইন পরিবর্তনশীল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। তবে এ আইনে মানুষের বাহ্যিক আচরণকে নিয়ন্ত্রণ বা সংশোধন করতে পারলেও আমাদের নৈতিক আচরণ, নীতিবোধ, উচিত-অনুচিত, বিবেকবোধ এসবকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

তার জন্য প্রয়োজন নৈতিক বিধি, যার বড়ই অভাব আমাদের সমাজে। কারণ, বিধি অনুযায়ী ফাইল চললেও মন চলে না।

আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতির প্রধানতম কারণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করা। অর্থাৎ আইন আছে, প্রয়োগ নেই। এ কথাও ঠিক, কিছু কিছু আইন প্রয়োগে আবার একদল দাঁড়িয়ে যায় ‘মানি না, মানব না’ বলে।

আসলে অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে প্রয়োজন আইনের যথার্থ প্রয়োগ। মানুষ চায় ন্যায়বিচার, সব রকম অনিয়ম থেকে মুক্তি। কিন্তু বিচারপ্রার্থীরা যদি ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে হয়রানি, আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হন, তাহলে আইনের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা থাকবে কীভাবে?

অপরাধীরা যখন দেখে, আইন অমান্য করলেও তেমন কোনো আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে হয় না, তখন অরাজকতা আর অপরাধ বাড়তেই থাকে। আইন তখন একখণ্ড—কাগজের টুকরায় পরিণত হয়। আমাদের দেশে আইনের বাস্তবায়ন খুবই কঠিন, কারণ দুর্নীতি।

দুর্নীতির কারণে অনেক সময় আইনের রক্ষকেরাই আইন ভঙ্গ করেন। সামান্য ট্রাফিক সংকেত অমান্য করা থেকে শুরু করে প্রকাশ্য স্থানে ময়লা ফেলা বা ঘুষ দেওয়া নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। তখন আইন না মানাটাই সমাজের সংস্কৃতিতে রূপ নেয়।

আবার কিছু কিছু স্থানে দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বা প্রচলিত বিচারব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে একদল মানুষ নিজেদের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে। গণপিটুনি, ভাঙচুর ও প্রকাশ্যে হত্যা ছাড়াও সাইবার বুলিং ও ট্রলের কারণে সমাজের মূল ভিত্তি নড়ে ওঠে।

নিজেদের হাতে আইন তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার প্রতিও বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এই অস্থিরতার প্রভাব স্পষ্ট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি এর অপব্যবহারও দিন দিন বাড়ছে। মিথ্যা তথ্য, চরিত্রহনন, ব্যক্তিগত আক্রমণ, গুজব ও কাদা–ছোড়াছুড়ির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো।

পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীলতা প্রচার ও ভিউ-ভাইরাল জাতীয় জনপ্রিয়তার দৌড়ে একশ্রেণির তরুণের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ সুযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কারও কারও বেশ ভালো কাটতিও হচ্ছে। চলছে ব্লেইম গেম। এ এক অদ্ভুত মানসিকতা।

পদ্মার চর থেকে ঘাস সংগ্রহ করে নৌকায় নদী পার হয়ে বাড়ি ফিরছেন এক কৃষক দম্পতি। বালিয়াডাঙ্গী, ডিক্রিরচর, ফরিদপুর
ছবি: আলীমুজ্জামান

অন্যদিকে দেশের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় সেবা প্রাপ্তি বা দুর্নীতি কমাতে যখনই নতুন নতুন নিয়ম বা বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, সেই নিয়মগুলোই দুর্নীতির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। নিয়ম যত কঠোর হচ্ছে, ফাইল আটকে ঘুষের রাস্তা তত প্রশস্ত হচ্ছে।

ফলে একটি ছোট কাজ বা সেবা পাওয়ার জন্য ধাপে ধাপে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে নাগরিকদের। অর্থাৎ নিয়ম যত কড়া হচ্ছে, সেই নিয়ম শিথিল করে ফাঁকফোকর দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য ঘুষ বা দুর্নীতির মাত্রাও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ফলে কাগজে-কলমে নিয়ম বাড়লেও বাস্তবে বেড়েছে অনিয়ম। এর মূল কারণ আইনের সঠিক ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের অভাব।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপের কারণে অনেক সময় আইন নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না। দুর্বল ও সাধারণ মানুষের জন্য যে আইন কঠোর, প্রভাবশালী ও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের জন্য সেই আইন শিথিল।

এই দ্বিচারিতা অরাজকতার বড় জ্বালানি। সেবা পেতে গিয়ে মানুষ যখন হয়রানির শিকার হন, তখন সরকারের প্রশাসনিক উদ্যোগগুলোর ওপর বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। সুতরাং এই অস্থির পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ।

আরও পড়ুন

অপরাধী যে দলেরই হোক—সরকারি কিংবা বিরোধী, যত বড় রাজনীতিবিদ, যত বড় ব্যবসায়ী, শিল্পী, সাংবাদিক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী ব্যক্তিই হোক না কেন, তার অসদাচরণ, অন্যায়, মিথ্যাচার বা অপরাধের জন্য অবশ্যই কঠিন শাস্তি প্রদান করা উচিত। নইলে এ ধরনের অপরাধ বাড়তেই থাকবে, মিথ্যাচার ছড়াতেই থাকবে। নমনীয় মনোভাব অপরাধকে প্রশ্রয় দেবে।

অস্কারজয়ী হলিউড অভিনেতা জেফ্রি রাশের বিরুদ্ধে সিডনির দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকা একটি মিথ্যা প্রতিবেদন করায় পত্রিকাটিকে ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। তেমনি চরিত্রহননের দায়ে ইউটিউবার তাশা কে-র বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করায় পপ তারকা কার্ডি বি-কে ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।

কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের দেশে আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে অপরাধ বাড়ছে, সম্মানহানি ঘটছে, চরিত্রহনন চলছে এবং অনেকেই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

মনে রাখতে হবে, জনগণ কখনো মিথ্যার ডাকে সাড়া দেয় না। জনগণ থাকে সত্যের পক্ষে। আর এই জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। অপরাধীরা কোনোক্রমেই যাতে রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে প্রশ্রয় না পায়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সেবা কার্যক্রমকে আরও সহজ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। গুজব ও মিথ্যাচার করা অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, নিয়ম যেন দুর্নীতির কারণ না হয়ে সেবার মাধ্যম হয় এবং আইন যেন প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। সবার প্রত্যাশা এটাই।

  • হানিফ সংকেত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

    *মতামত লেখকের নিজস্ব