সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের একটি গভীর দুর্বলতা সামনে এনে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যে হুমকি দিয়েছিলেন, পরে দাভোসে গিয়ে সেখান থেকে সরে আসেন। কিন্তু এরপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা অনিচ্ছাকৃতভাবেই ফাঁস হয়ে যায়।
ওহাইওর টলিডো শহরের একটি শিল্পভিত্তিক শিপিং কারখানায় বক্তব্য দিতে গিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, আমেরিকা নাকি আবার ‘দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে’। তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে দায়ী করেন। কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ বলে ফেলেন—‘টাইটানিককে তো চট করেই ঘুরিয়ে ফেলা যায় না।’
কিন্তু বাস্তবতা হলো, টাইটানিক কখনোই ঘুরে দাঁড়ায়নি। সেটি আইসবার্গে ধাক্কা লেগে ডুবে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র যদি আজ একই পরিণতির দিকে এগোয়, তবে তার কারণ হবে ভুল যুক্তি আর ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা।
ট্রাম্প ও তাঁর মতো শুল্কপ্রেমী রাজনীতিকেরা ইতিহাস থেকে দুটি সময়কে উদাহরণ হিসেবে নেন। এক. উনিশ শতক; যখন নাকি যুক্তরাষ্ট্র কঠোর সুরক্ষা নীতির
মাধ্যমে নিজেকে রক্ষা করেছিল। দুই. ১৯৩০-এর দশক, অর্থাৎ মহামন্দার পরের সময়টা। এই দুই সময় থেকে তারা একটি শিক্ষা নেয়: বড় বাজার থাকলে, সেই বাজারে ঢোকার সুযোগ দিয়ে অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে ছাড় আদায় করা যায়।
এই ধারণা থেকেই ট্রাম্প কখনো ফরাসি মদের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দেন, কখনো কানাডার সব পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলেন। কিন্তু এই যুক্তি তখনই ভেঙে পড়ে, যখন আলোচনায় আসে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। যেমন সেমিকন্ডাক্টর, দুর্লভ খনিজ বা রেয়ার আর্থ, জ্বালানি ও খনিজ। ২০২০-এর দশকের ভূ-অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব মূলত সরবরাহ সংকটকে ঘিরে। এই সংকট আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে সমাধান করা যায় না।
ট্রাম্প শুল্ককে শুধু বাণিজ্যনীতির চোখে দেখেন না। তিনি এটিকে দেখেন রাজনৈতিক ও আবেগের জায়গা থেকে। নিজের সমর্থকদের খুশি করতে এবং নিজের মানসিক তাড়নায় তিনি প্রতিনিয়ত অপমানজনক বক্তব্য দেন। এতে দর-কষাকষি অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ সম্ভাব্য যেকোনো সমঝোতার ভিত্তি তিনি নিজেই নষ্ট করে ফেলেন।
এর সবচেয়ে লজ্জাজনক উদাহরণ হলো চীনের সঙ্গে তাঁর পরাজয়। যুক্তরাষ্ট্রের উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল—চীনই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক নীতির চ্যালেঞ্জ। কিন্তু ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে এই লড়াইয়ে হেরে যান।
মনে রাখা দরকার, জাহাজের ক্যাপ্টেন যদি নিজেই পাগল হয়ে জাহাজের ব্রিজ থেকে অসহায়ভাবে চিৎকার করতে থাকেন তাহলে যাত্রীরা আর তার ওপর ভরসা রাখে না। তারা নিজেরাই চুপচাপ লাইফবোটে উঠে নিরাপদে সরে যাওয়ার পথ খোঁজে।
এর কারণ, ট্রাম্প বোঝেননি যে চীন শুধু খেলনা বা কাপড় রপ্তানি করে না। চীন হলো রেয়ার আর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর প্রধান উৎস। এগুলো ছাড়া ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর এবং ফিউশন প্রযুক্তির মতো দ্রুত বিকাশমান ও কৌশলগত শিল্প খাত চলে না। তাহলে প্রশ্ন হলো অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে কি ট্রাম্পের শুল্ক-হুমকি কাজ করবে?
ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল নথিতে দেখা যায়, সেখানে রাশিয়া বা চীনের চেয়ে ইউরোপকে বেশি আদর্শিক হুমকি হিসেবে দেখানো হয়েছে। ইউরোপকে অভিযুক্ত করা হয়েছে ‘সভ্যতার বিলুপ্তি’ ডেকে আনার জন্য।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্যঘাটতি আছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—ইইউ কি ট্রাম্পের শুল্ক আক্রমণের সামনে দুর্বল?
প্রথমে ইউরোপকে সত্যিই দুর্বল মনে হয়েছিল। ইউরোপীয় শিল্প বিদেশি বাজারের জন্য মরিয়া। গত বছর ইউরোপীয় কমিশন ট্রাম্পের ১৫ শতাংশ শুল্ক মেনে নেওয়ায় সে দুর্বলতার ইঙ্গিতও পাওয়া গিয়েছিল। ইউরোপের হাতে চীনের মতো কোনো শক্তিশালী পাল্টা অস্ত্র ছিল না। উপরন্তু, তারা ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
আর ইউরোপের দৃশ্যমান রপ্তানি পণ্য—জার্মান গাড়ি, ফরাসি মদ, শ্যাম্পেন—এসব মূলত ধনী আমেরিকানরা কেনে। সাধারণ ‘মাগা’ সমর্থকেরা নয়। তাই ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল, তারা শক্ত অবস্থানে আছে।
কিন্তু এখন ইউরোপ পাল্টা পদক্ষেপ নিচ্ছে। তারা নিজেদের বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে আছে ‘অ্যান্টি-কোয়ারশন ইনস্ট্রুমেন্ট’—যাকে বলা হয় ইউরোপের ‘ট্রেড বাজুকা’। এর মাধ্যমে দ্রুত শুল্ক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়। পাশাপাশি মেধাস্বত্ব ও বিদেশি বিনিয়োগ নিয়েও কড়াকড়ি আরোপের চিন্তা চলছে।
ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল জায়গাগুলোও চিহ্নিত করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—ইইউ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত হলো ওষুধশিল্প। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রে ইইউর মোট রপ্তানির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। এর মধ্যে আছে ওজন কমানোর যুগান্তকারী জিএলপি-ওয়ান ওষুধ। এসব ওষুধের মূল উপাদান আসে আয়ারল্যান্ডের কাউন্টি কর্ক থেকে।
আরেকটি সম্ভাব্য অস্ত্র হলো—যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপীয় বিনিয়োগের ওপর কর বসানো। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ফেডারেল বাজেট ঘাটতি মেটাতে যে ঋণ নেওয়া হয়, তা আরও কঠিন হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য ও আচরণ ইউরোপকে আরও কঠোর হতে উৎসাহিত করেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইউরোপের মিত্ররা ন্যাটোর দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেনি। তিনি বলেছেন, তারা আফগানিস্তানে ‘সামনের সারিতে ছিল না’।
এই বক্তব্য ইউরোপে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করে। কারণ বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। আফগানিস্তানে ৪৪ জন ডেনিশ, ৪৫৭ জন ব্রিটিশ, ১৫০ জন কানাডীয় ও ৯০ জন ফরাসি সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। এই তথ্য ট্রাম্পের বক্তব্যকে ভয়াবহভাবে মিথ্যা প্রমাণ করে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়—ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টাদের আচরণই যুক্তরাষ্ট্রকে টাইটানিকের মতো পথে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে তারা ঘৃণিত। প্রশংসা পাচ্ছেন শুধু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো নেতাদের কাছ থেকে।
মনে রাখা দরকার, জাহাজের ক্যাপ্টেন যদি নিজেই পাগল হয়ে জাহাজের ব্রিজ থেকে অসহায়ভাবে চিৎকার করতে থাকেন তাহলে যাত্রীরা আর তার ওপর ভরসা রাখে না। তারা নিজেরাই চুপচাপ লাইফবোটে উঠে নিরাপদে সরে যাওয়ার পথ খোঁজে।
ঠিক একইভাবে ট্রাম্পের আচরণের কারণে বিশ্ব আজ ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হ্যারল্ড জেমস প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ