রোবট কুকুরের ঘটনা ভারতকে যে শিক্ষা দিয়ে গেল

রোবোডগ নিয়ে ভারতে সর্বশেষ যা ঘটে গেল, আগামী দিনে তা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা উঠবে।

ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিটের মঞ্চে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ভারতের আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ শোনা যাওয়ার কথা ছিল। এটি হওয়া উচিত ছিল জাতীয় গুরুত্ব ও প্রযুক্তিগত পরিণতির এক প্রদর্শন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই মঞ্চে নেমে এল অস্বস্তির ছায়া।

ঘটনা হলো, গ্যালগোটিয়াস বিশ্ববিদ্যালয় একটি রোবোটিক কুকুর প্রদর্শন করে সেটিকে তাদের ‘ইন-হাউস ইনোভেশন’ বলে দাবি করেছিল। নামও দেওয়া হয়েছিল ‘ওরিয়ন’। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিনিধিরা বলেছিলেন, তাঁদের এআই খাতে বড় বিনিয়োগ হয়েছে এবং নিজস্ব সেন্টার অব এক্সেলেন্সে তৈরি হয়েছে এই রোবোডগ। কিন্তু তৎক্ষণাৎ প্রযুক্তিসচেতন দর্শক ও অনলাইনের নজরদারি জানিয়ে দিল, এটি আদতে চীনা সংস্থা ইউনিট্রি রোবোটিকসের বাজারচলতি একটি মডেল। অর্থাৎ নিজেদের উদ্ভাবন বলে যা দেখানো হচ্ছিল, তা আসলে আমদানি করা যন্ত্র।

এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলায়। বিশ্ববিদ্যালয় এক পর্যায়ে জানায়, তারা রোবোডগটি তৈরি করেনি; শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করাতেই তারা এটির প্রদর্শন করেছে। কিন্তু ততক্ষণে জল অনেক দূর গড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত আয়োজকদের পক্ষ থেকে স্টল সরিয়ে নিতে বলা হয়।

আরও পড়ুন

এ ঘটনাকে নিছক জনসংযোগের ভুল বললে ভুল হবে। এটি বড় কেলেঙ্কারি নয়, তবে বড় লক্ষণ। এটি গভীরে থাকা এক বড় অসুখের উপসর্গ। এই একটি ফ্রেমেই ধরা পড়ে ভারতের বর্তমান এআই-বাস্তবতার ভঙ্গুরতা। বয়ান ও সক্ষমতার ব্যবধান, প্রদর্শন ও উৎপাদনের দূরত্ব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা মঞ্চস্থ করা আর বাস্তব শক্তি নির্মাণের ফারাক—সব একসঙ্গে দৃশ্যমান।

এআই শাসন, অন্তর্ভুক্তি, দায়িত্বশীল প্রয়োগ, ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কণ্ঠস্বর—এসব নিয়ে ভারত বিশ্বকে একত্র করতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষা অমূলক নয়। সম্মেলন আয়োজন ভূরাজনৈতিক উচ্চাশার ভাষাও বটে। কিন্তু আমরা কি খুব দ্রুত দৃশ্যমানতাকে ফলাফলের জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছি?

ভারতের জি২০ বর্ষ নিখুঁত মঞ্চায়নের দৃষ্টান্ত হলেও বহু শহরে স্থায়ী নাগরিক উন্নয়নের বদলে চোখে পড়েছিল অস্থায়ী সাজসজ্জা—ভিনাইলের পর্দা। দৃশ্যমানতা ছিল কিন্তু রূপান্তর কতটা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এআই ক্ষেত্রেও কি সেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে? অর্থাৎ ভিত গড়ার আগেই কি প্রদর্শনের ঝলক দেখা যাচ্ছে?

বিশ্ববিদ্যালয় যদি কঠোর গবেষণার ইঞ্জিন না হয়ে প্রদর্শনীর থিয়েটার হয়ে ওঠে, তবে ডেমো-দক্ষ স্নাতক পাওয়া যাবে, কিন্তু যুগান্তকারী উদ্ভাবক পাওয়া যাবে না।

এআই এমন ক্ষেত্র নয়, যেখানে কথার জোরে ভিতের অভাব ঢেকে রাখা যায়। ফ্রন্টিয়ার উদ্ভাবন এখনো সীমিত কয়েকটি পশ্চিমা ও চীনা গবেষণাগারে কেন্দ্রীভূত। কারণ, তারা ভালো সম্মেলন করে বলে নয়, বরং তারা জমা করেছে অপরিহার্য সম্পদ—বৃহৎ কম্পিউট ক্ষমতা, বিশ্বমানের গবেষণা পরিবেশ, সেমিকন্ডাক্টর দক্ষতা, নিজস্ব আর্কিটেকচার, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি এবং বিশ্বাসযোগ্যতার কঠোর সংস্কৃতি। ব্র্যান্ডিং দিয়ে এ সঞ্চয়কে প্রতিস্থাপন করা যায় না।

রোবোডগ নিয়ে সর্বশেষ যা ঘটে গেল, আগামী দিনে তা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা উঠবে। কেউ বলবে তুচ্ছ ভুল–বোঝাবুঝি। কেউ রাজনৈতিক আখ্যান বানাবে। কেউ বলবে, তারা জানতই না।

কিন্তু যে প্রশ্নটা থেকেই যাবে, সেটি হলো যে দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যতের শক্তি বলে মানে, তার ইকোসিস্টেমে এমন সহজে দক্ষতার ভান মঞ্চস্থ হওয়া কি স্বাভাবিক কোনো ঘটনা?

বিশ্ববিদ্যালয় যদি কঠোর গবেষণার ইঞ্জিন না হয়ে প্রদর্শনীর থিয়েটার হয়ে ওঠে, তবে ডেমো-দক্ষ স্নাতক পাওয়া যাবে, কিন্তু যুগান্তকারী উদ্ভাবক পাওয়া যাবে না। করপোরেট ভারত যদি এআইকে জাতীয় সক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে না নিয়ে ব্র্যান্ডিংয়ের আস্তরণ হিসেবে নেয়, তবে আমরা আরেক জায়গায় বানানো মডেল ব্যবহার করব, অন্যের অবকাঠামোয় তা চালাব, আর অন্যের লেখা মানদণ্ডে চলব। নীতিনির্ধারকেরা যদি দৃশ্যমানতাকেই প্রস্তুতি ভেবে নেন, তবে ভারত হয়ে উঠবে এক বিশাল বাজার ও পরীক্ষাগার। সেখানে ভারত ফ্রন্টিয়ার নির্মাতা হবে না, বরং দেশটি হবে প্রযুক্তি-শক্তিধরদের খেলার মাঠ।

আরও পড়ুন

এ ঘটনা আরও একটি ঘাটতির দিক দেখায়। সেটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ডের অভাব। এআইতে উৎসের স্বচ্ছতা জরুরি। দাবির সততা জরুরি। গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা জরুরি। যে দেশ দায়িত্বশীল এআই নিয়ে বৈশ্বিক মান নির্ধারণে ভূমিকা চাইছে, তাকে আগে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে সেই মানদণ্ড গড়ে তুলতে হবে। সেন্টার অব এক্সেলেন্স অলংকার নয়; তাদের মাপতে হবে গবেষণা-প্রবন্ধ, পেটেন্ট, দেশীয় আর্কিটেকচার, নিরাপত্তা কাজ এবং বৈশ্বিক মানের প্রতিভা দিয়ে। নইলে ইকোসিস্টেম ভেসে যাবে হাইপের ঢেউয়ে আর ক্ষয়ে যাবে আস্থা।

তাই প্রশ্নটা সরাসরি—ভারত কি এআই সার্বভৌমত্ব গড়ছে, না এআই থিয়েটার করছে?

এআই খাতে উন্নতি করতে প্রথমত, বিনিয়োগ চাই মৌলিক গবেষণায়। দ্বিতীয়ত, কম্পিউট ও অবকাঠামোকে দেখতে হবে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে। চিপ, উচ্চক্ষমতার প্রশিক্ষণ—এসবের দেশীয় গভীরতা না থাকলে নির্ভরতা কাঠামোগতভাবে স্থায়ী হয়ে যায়। তৃতীয়ত, প্রয়োজন নীতিগত স্বচ্ছতা, যেখানে প্রকৃত অবদান পুরস্কৃত হবে, আর ভাঁওতাবাজি নিরুৎসাহিত হবে।

এসবের সঙ্গে যুক্ত আরও একটি কঠিন সত্য হলো ভারতের স্টেম ও দক্ষতাব্যবস্থা এখনো ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তির চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। মুখস্থভিত্তিক সনদ আর সেকেলে পাঠ্যক্রম দিয়ে এআই নির্মাতা তৈরি করা যায় না; বড়জোর তৈরি করা যায় ভোক্তা।

এআই কেবল প্রযুক্তি নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, শ্রমবাজার, যুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে। তাই প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যারা প্রদর্শনের চেয়ে গভীরতাকে, মঞ্চায়নের চেয়ে সক্ষমতাকে, করতালির চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেয়।

‘রোবোডগ’ ঘটনা হয়তো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সবাই ভুলে যাবে। কিন্তু যে আয়নায় তা আমাদের মুখ দেখিয়েছে, সেই প্রতিবিম্ব থেকে আমাদের চোখ ফেরানো উচিত হবে না।

  • শ্রীনাথ শ্রীধরন ভারতের একজন করপোরেট উপদেষ্টা

  • ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত