এ ছাড়া চীনের উত্থানের তুলনায় আমেরিকার পতন এবং মহামারি ও ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নতুন শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব এক ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাইডেন ও সি চিনের মধ্যে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ই হতে পারে বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত। বাইডেন ও সির মতো ঝানু নেতাদের কাছ থেকে আরও বেশি রাজনৈতিক বিচক্ষণতা প্রত্যাশিত।

চীনের উত্থান শুরুর কালে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ‘নোঙর’ ফেলেন। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের কাছে চীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। বাইডেন ও সির মধ্যে সম্পর্ক অনেক পুরোনো। ভাইস প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং-ই চীনের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন, এ বিষয় একসময় পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সে সময়কার ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডনকে ‘সি চিন পিংকে জানার কোনো দায়িত্ব’ দেওয়া হয়েছিল, সেটা এখনো এক রহস্য। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সি যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলে বাইডেন মাঝেমধ্যেই তাঁর বিমানসঙ্গীও (যুক্তরাষ্ট্রের এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়ার সময়) হতেন। দুজনের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনাও হতো।

স্বল্প মেয়াদে কোনো অর্জন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ক্ষেত্রে প্রায়ই ফলপ্রসূ হয় না। গত বৃহস্পতিবার বাইডেন-সি সংলাপ তারই দৃষ্টান্ত। প্রথাপালনের আরেক দফা সংলাপ শেষ হওয়ার পর চীনের গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, সি বাইডেনকে বলেছেন, ‘আপনি যদি আগুন নিয়ে খেলেন, তাহলে সেই আগুনে আপনিই পুড়ে যাবেন।

সি চিন পিং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন চীন সফর করেছিলেন। সে সময় দুজনের মধ্যে পাঁচ ঘণ্টা আলাপ হয়েছিল। সে খবর গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রেসিডেন্ট সি প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। সে সফরে সি চিনের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন বাইডেন।

বাইডেন ও সির মধ্যকার এ আলাপ ও দীর্ঘ ভ্রমণ দুজনের ব্যক্তিত্বে এমন কোনো উষ্ণতা ও রসায়ন তৈরি করতে পেরেছে কি, যেটা দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিরসন করতে পারে? সেটা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বাইডেনকে মাথা গরম ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মোকাবিলা করতে হয়েছিল। প্রচারণাকালে সির প্রতি কঠোর মনোভাব দেখিয়েছিলেন বাইডেন, তাঁকে ‘ঠগ’–এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। নির্বাচনে জেতার সাময়িক কৌশল হিসেবে এটা ঠিক হতে পারে। কিন্তু বাইডেন তাঁর চীন নীতিতে ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি। আর এ অস্পষ্টতা থেকে বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক (বিশেষ করে তাইওয়ান প্রশ্নে) ক্রমান্বয়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।

সব পক্ষই শব্দের খেলায় এবং কৌশলগত অস্পষ্টতার ভেতর নিজেদের লুকানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এর সাম্প্রতিক দৃষ্টান্তটা হলো, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের খবর এবং সেই খবরকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়া। পেলোসি সফরের বিষয়টি নিশ্চিতও করেননি কিংবা অস্বীকারও করেনি। প্রেসিডেন্ট বাইডেন এক বক্তব্যে পেলোসিকে এ সফর না করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীও এ ধরনের সফরের বিরোধী। ওদিকে ন্যান্সি পেলোসি আগুনে আরেকটু ঘি ঢেলে দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, সেনাবাহিনী কি চীনাদের হাতে তাঁর বিমান আক্রান্ত হবে বলে মনে করছে? এ ধরনের এড়ানোর কৌশল যুক্তিকেই অস্বীকার করে।

স্বল্প মেয়াদে কোনো অর্জন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ক্ষেত্রে প্রায়ই ফলপ্রসূ হয় না। গত বৃহস্পতিবার বাইডেন-সি সংলাপ তারই দৃষ্টান্ত। প্রথাপালনের আরেক দফা সংলাপ শেষ হওয়ার পর চীনের গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, সি বাইডেনকে বলেছেন, ‘আপনি যদি আগুন নিয়ে খেলেন, তাহলে সেই আগুনে আপনিই পুড়ে যাবেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমও কোনো অংশে কম যায়নি। তাদের দাবি, তাইওয়ান প্রণালির স্থিতাবস্থা বিনষ্ট হয় কিংবা সেখানকার শান্তি ও স্থিতিশীলতা নস্যাৎ হয়, এমন কোনো প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

শরণ সিং ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন