শক্তিশালী হয়ে ওঠা ব্রিকস আসলে কী চায়

এবারের ব্রিকস সম্মেলন অ–পশ্চিমা বিশ্বের বড় কূটনৈতিক সমাবেশে পরিণত হয়েছেছবি: রয়টার্স

বিশ্বরাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকসের ২০২৬ সালের সম্মেলন। সম্প্রসারিত এই জোটে সদস্যসংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্বও।

কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো নেতাদের অংশগ্রহণ এবারের সম্মেলনকে অ–পশ্চিমা বিশ্বের বড় কূটনৈতিক সমাবেশে পরিণত করেছে। এ কারণেই ব্রিকস বড় ধরনের আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্রিকসের চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের চতুর্থ মেয়াদ অবশ্য বেশ নিরুত্তাপ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনের মতো এবার জাঁকজমক দেখা যাচ্ছে না। সে সময় কয়েক মাস ধরে রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছিল। বিভিন্ন স্থানে রঙিন দেয়ালচিত্র আঁকা হয়েছিল। বিদেশি অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশাল বিলবোর্ডও ছিল। এবার প্রস্তুতি অনেকটাই নীরব ও সংযত।

ব্রিকস এখন যুক্তরাষ্ট্রের নজরেও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ব্রিকসের ১১টি সদস্যদেশ ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথে এগোলে তাদের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করা হবে।

অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বিরোধও সামনে এনেছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সংঘাতে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। ফলে জোটটি যত বড় হয়েছে, তাকে একমত করানো তত কঠিন হয়েছে।

অথচ ১১ বছর আগে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর উল্লেখযোগ্য বাস্তব সাফল্যের তালিকা খুব দীর্ঘ নয়।

তারপরও ভারতের জন্য এবারের সম্মেলন একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগ। নয়াদিল্লির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, তার দুই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে একই জায়গায় এনে একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করানো।

ভারত যদি তা করতে পারে, তাহলে পশ্চিম এশিয়ার পরস্পরবিরোধী দুই দেশের মধ্যে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার ভূমিকা আরও জোরালো হবে।

এমন সাফল্য পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ভারতের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হবে। পাকিস্তান কিছুদিন আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতায় সাফল্যের দাবি করেছিল। কিন্তু ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে।

ভারত সফল হলে সেটি ২০২৩ সালে জি-২০ সম্মেলনে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অভিন্ন ভাষা তৈরির সাফল্যের ধারাবাহিকতা হবে।

ভারতের জন্য এবারের সম্মেলনে কোনো বড় বিরোধ ছাড়াই বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে পারা একটি কূটনৈতিক সাফল্য হবে। কিন্তু তাতেও ১১টি দেশের সামনে থাকা সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর মিলবে না। ব্রিকস শেষ পর্যন্ত কী হতে চায়; একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ, নাকি পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি।

একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনকে আলোচনার টেবিলে আনায় ভারতের প্রচেষ্টাও শক্তিশালী হবে। গত মাসে কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে মোদি পুতিনকে ‘অন্তহীন যুদ্ধ থেকে অবসানের’ পথে যাওয়ার আহ্বান জানান। কয়েক দিন পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফর করে বলেন, যুদ্ধ বন্ধে সংলাপ ও কূটনীতির কোনো বিকল্প নেই। ইউক্রেন যুদ্ধ প্রায় পাঁচ বছরে পা দিতে চলেছে।

এসব কারণে ভারতের এবারের ব্রিকস সভাপতিত্বের গুরুত্ব অনেক বেশি। শুক্রবার বিকেলে মোদি পুতিনের সঙ্গে এবং পরে সন্ধ্যায় ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। উভয় বৈঠকেই বৈশ্বিক সংঘাত এবং তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে খাদ্য, সার ও জ্বালানির ওপর সংঘাতের প্রভাব ছিল আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ব্রিকসের শুরু অবশ্য ভূরাজনীতি দিয়ে হয়নি। ২০০১ সালে গোল্ডম্যান স্যাকসের একটি গবেষণাপত্রে ‘ব্রিক’ শব্দটির জন্ম। সেখানে বলা হয়েছিল, ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্ব আগামী দিনে আরও বাড়বে। পরে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও উৎপাদনশিল্পের বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ব্রাজিল, রাশিয়া ও ভারতও গত ২৫ বছরে বিভিন্ন মাত্রায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

২০০৬ সালে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রথমবার বৈঠক করেন। ২০০৯ সালে হয় প্রথম নেতাদের সম্মেলন। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে ব্রিকস পাঁচ সদস্যের জোটে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তখন অগ্রগতি হচ্ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার চার বছরের মধ্যেই নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। উন্নয়ন সহায়তার জন্য এটি ছিল একটি নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রচলিত ভূমিকার বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটিই ছিল ব্রিকসের প্রথম বড় পদক্ষেপ।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ভূরাজনীতি দ্রুত ব্রিকসের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ২০২০ সালে গালওয়ানে ভারত ও চীনের সংঘর্ষ হয়। ২০২২ সালে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউসে ফিরে আসেন।

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২০২৩ সালে ব্রিকস সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রাজিল ও ভারত সম্প্রসারণের জন্য কিছু নিয়ম তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল, নতুন সদস্যদের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করতে হবে।

সৌদি আরবকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও দেশটি মূল ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠায়নি। শুধু আউটরিচ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিল।

আরও একটি নতুন দিক হলো, ভারত এখন ব্রিকসের আর সম্প্রসারণের বিরোধিতা করছে। কিন্তু তাতে মূল প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে, ১১টি সদস্যদেশ আসলে ব্রিকসের মাধ্যমে কী অর্জন করতে চায়?

ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে থাকা সংঘাত ব্রিকসকে আবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। বিশ্বের বড় উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে কী ভাবছে, ব্রিকস তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে।

ভারতের জন্য এবারের সম্মেলনে কোনো বড় বিরোধ ছাড়াই বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে পারা একটি কূটনৈতিক সাফল্য হবে। কিন্তু তাতেও ১১টি দেশের সামনে থাকা সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর মিলবে না। ব্রিকস শেষ পর্যন্ত কী হতে চায়; একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ, নাকি পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প একটি ভূরাজনৈতিক শক্তি? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি।

কেশব পদ্মনাভন দ্য প্রিন্ট-এর প্রধান প্রতিবেদক 

দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ