সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দুটি টিম বাংলাদেশে মিশন নিয়ে এসেছিল। এডিবির মূল উদ্দেশ্য যদিও ছিল আর্থিক খাতের সংস্কার, আইএমএফের লক্ষ্য ছিল—রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, আর্থিক খাত সংস্কার আর মূল্যস্ফীতি হ্রাস। এডিবি আর্থিক খাত সংস্কারের শর্তে সরকারকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা দেবে। আইএমএফের কাছে সরকারের আশা অনেক বেশি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নতুন ঋণ পাওয়ার চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে নতুন আস্থা অর্জন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সম্ভাব্য ৬ বিলিয়ন থেকে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন কর্মসূচি তাই কেবল আরেকটি ঋণচুক্তি নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের একটি নতুন অধ্যায়।
গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানা ধাক্কা সামলেও প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রেখেছিল। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা সেই শক্ত ভিতকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এ বাস্তবতায় অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন অর্থ নয়; বরং নতুন আস্থা। আর সেই আস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে নীতির ধারাবাহিকতা, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
আগের আইএমএফ কর্মসূচি প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। কারণ, অর্থের অভাব ছিল না, অভাব ছিল কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আইএমএফের অবস্থান আরও স্পষ্ট। তারা জানতে চায়, বাংলাদেশ কত ঋণ নেবে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশ কতটা পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত।
এবার কি সত্যিই সংস্কার হবে? উত্তরটা আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হতে শুরু করবে। কারণ, ইতিহাস বলে, অর্থের সংকট কোনো দেশকে দীর্ঘদিন পিছিয়ে রাখে না। পিছিয়ে রাখে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা। সেই ভুল থেকে বেরিয়ে আসাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
সংস্থাটি যে পাঁচটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, সেগুলো নতুন নয়। রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা চলছে। নতুন বিষয় হলো, এবার এসব বিষয়ে সময় সীমাবদ্ধ এবং পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি দেখতে চাওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতির জায়গা থেকে বাস্তবায়নের জায়গায় যাওয়ার চাপ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাজস্ব। একটি দেশ যখন মধ্যম আয়ের অর্থনীতি থেকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে যেতে চায়, তখন রাষ্ট্রের নিজস্ব আয়ই উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্নগুলোর একটি। এর অর্থ রাষ্ট্র তার উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ নিজে সৃষ্টি করতে পারছে না। ফলে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এ বাস্তবতা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হতে পারে না।
তবে রাজস্ব সংস্কার মানেই করের হার বৃদ্ধি নয়। প্রকৃত সংস্কার হলো কর প্রশাসনকে প্রযুক্তিনির্ভর করা, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো এবং স্বেচ্ছায় কর প্রদানের পরিবেশ তৈরি করা। রাষ্ট্র ও করদাতার সম্পর্ক যদি আস্থার ভিত্তিতে গড়ে না ওঠে, তাহলে কেবল আইন পরিবর্তন করে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব নয়।
সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং খাত। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং মূলধনের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা তখনই কার্যকর হয়, যখন আমানতকারী নিশ্চিন্ত থাকেন এবং উদ্যোক্তা বিশ্বাস করেন যে যোগ্যতার ভিত্তিতে অর্থায়ন পাওয়া সম্ভব। সেই আস্থা ক্ষয়ে গেলে পুরো অর্থনীতিই তার মূল্য দেয়। তাই ব্যাংক সংস্কারকে আর কেবল আর্থিক খাতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্রীয় ইস্যু।
আইএমএফের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসও তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সরকার যেখানে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেখানে আইএমএফ ৩ দশমিক ৫ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছে। এই পার্থক্য কেবল দুটি সংখ্যার ব্যবধান নয়; এটি নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা এবং আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্বের প্রতিফলন। সেই দূরত্ব কমানোর একমাত্র পথ বাস্তবভিত্তিক সংস্কার।
অন্যদিকে সরকারের অবস্থানও বিবেচনার দাবি রাখে। নির্বাচিত সরকারকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও সামাল দিতে হয়। হঠাৎ কঠোর সংস্কার অনেক সময় সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ধাপে ধাপে এগোনোর কৌশল অযৌক্তিক নয়। তবে সেই ধাপগুলোর সময়সীমা, অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়নের দায়বদ্ধতা স্পষ্ট না থাকলে সংস্কারের গতি আবারও শ্লথ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে নীতিগত সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপ এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হলে কেবল স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।
এ প্রেক্ষাপটে আইএমএফের নতুন কর্মসূচিকে কেবল ঋণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি অর্থনৈতিক নীতির প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় সফলতা নির্ভর করবে কত দ্রুত ঋণের অর্থ আসে, তার ওপর নয়; বরং নির্ভর করবে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর কর্মপরিকল্পনায় রূপ নেয় এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা দৃঢ় থাকে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে তাই মূল প্রশ্ন একটাই। এবার কি সত্যিই সংস্কার হবে? উত্তরটা আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হতে শুরু করবে। কারণ, ইতিহাস বলে, অর্থের সংকট কোনো দেশকে দীর্ঘদিন পিছিয়ে রাখে না। পিছিয়ে রাখে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা। সেই ভুল থেকে বেরিয়ে আসাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
মামুন রশীদ অর্থনীতি বিশ্লেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
