কারও ব্যক্তিগত আয় ও সম্পদ নিয়ে নাক গলানো বা কথা বলাটা অস্বস্তিকর এবং অন্যায়ও। কিন্তু যেসব রাজনীতিবিদ দেশ সেবার ব্রত নিয়ে নির্বাচন করে এমপি ও মন্ত্রী হতে চান, তাঁদের কথা আলাদা। তাঁদের জন্য নির্বাচন কমিশন একটা আইন করে দিয়েছে—জাতীয় নির্বাচনের সব প্রার্থীকে তাঁদের ব্যক্তিগত আয় ও সম্পদের বিবরণ দিতে হবে হলফনামা করে।
অন্য সংবাদ যেহেতু খুব নেই, সংবাদপত্রগুলো তাই এসব হলফনামার সারসংক্ষেপ প্রকাশ করছে।
২.
আজকাল বাংলাদেশের মানুষ খুব রাজনীকি সচেতন। জনগণের অনেকেই এখন চিত্রনায়িকাদের প্রেম ও বিচ্ছেদের খবরের চেয়েও রাজনীতিবিদদের পয়সাকড়ি নিয়ে খবরাখবর রাখতে বেশি পছন্দ করেন। নির্বাচন কমিশন সম্ভবত ব্যাপারটা বুঝতে পেরে এই হলফনামার ব্যবস্থা করেছে।
নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়ে অবশ্যই কোনো প্রশ্ন নেই বরং এই উদ্যোগে তাদের সদিচ্ছাই প্রতিফলিত হয়েছে। তারা সম্ভবত বলতে চাচ্ছে—আমাদের নেতাদের টাকাকড়ি কী আছে নির্বাচনের আগেই দেখে নিন। তাঁরাই এমপি হবেন, মন্ত্রী হবেন; তখন মিলিয়ে নিতে পারবেন, নেতারা নিজেদের টাকাকড়ি বাড়াবার চেষ্টা না করে জনগণের কাজে নিজেদের কতটা উৎসর্গ করেছেন।
৩.
রাজনৈতিক নেতাদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার ব্যাপারে দুটি চিন্তাধারা আছে। এক পক্ষের মতে—হলফনামায় টাকাকড়ি খুব কম করে দেখাবেন। এতে ভোটে সুবিধা হবে, জনগণের আস্থা বাড়বে। জনগণ ভাববে, আপনি ওদেরই একজন; ওদের মতো আপনিও টেনেটুনে সংসার চালান; তাঁরাও বউয়ের শখ-আহ্লাদের আবদার মিটান ধার করে।
আবার অন্য চিন্তাধারাও আছে—রাজনীতি এক দিনের নয়, আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করতে হবে। এমপি-মন্ত্রী হওয়ার পর আপনার গুলশানের বাড়ি এবং বিএমডব্লিউ ও মার্সিডিজ গাড়ি যখন দৃশ্যমান হবে, তখন লোকের নজরে পড়বে; নানা জনে নানা কথা বলবে। তবে নির্বাচনের আগে যদি অনেক বেশি সম্পদ দেখিয়ে দেন, তাহলে পরে সাফাই দেওয়া সহজ হবে।
যা হোক, এটা প্রত্যেক রাজনীতিবিদের নিজস্ব পছন্দ, এই নিয়ে আমাদের কোনো পরামর্শ নেই।
সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে রাজনীতিবিদদের একটা সুবিধা হয়েছে। এখন এত বেশি অপতথ্য ও গুজব ছড়ানো হয় যে জনগণ সত্য-মিথ্যা খবর নিয়ে নানা বিভ্রান্তিতে ভুগছে। সামাজিক মাধ্যমের মিথ্যাবাদ, রাজনৈতিক নেতাদের অনেক সত্য কথাও লুকাতে সাহায্য করে। ‘সবই মিথ্যা, আমাকে হেয় করার প্রচেষ্টা’—এই ধরনের বিবৃতি এখন অনেক দেখা যায়।
এইবারের নির্বাচনের মনোনয়নের সঙ্গে দেওয়া হলফনামা দেখে যা বুঝেছি, পুরোনো রাজনীতিবিদদের হলফনামা খুব বোরিং। বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কিংবা এলডিপির কর্নেল অলি আহমদ অনেকবার নির্বাচন করেছেন। তাঁদের সেই একই হলফনামা। তবে এখন যাঁরা নতুন বা তরুণ নেতা, তাঁদের হলফনামায় চমক আছে।
৪.
এইবারের নির্বাচনের মনোনয়নের সঙ্গে দেওয়া হলফনামা দেখে যা বুঝেছি, পুরোনো রাজনীতিবিদদের হলফনামা খুব বোরিং। বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কিংবা এলডিপির কর্নেল অলি আহমদ অনেকবার নির্বাচন করেছেন। তাঁদের সেই একই হলফনামা। তবে এখন যাঁরা নতুন বা তরুণ নেতা, তাঁদের হলফনামায় চমক আছে।
জুলাই আন্দোলনের তরুণ নেতারা, যাঁরা মাত্র দেড় বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়েছেন এবং যাঁরা এখন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃস্থানীয় পদে আছেন; হলফনামায় দেখা যাচ্ছে তাঁরা আর্থিক দিক দিয়ে বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁদের সময়ের অনেক শিক্ষার্থী এখনো বিসিএসের বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করছেন বা চাকরি খুঁজছেন। সেই তুলনায় এই তরুণ নেতাদের সাফল্য অন্য তরুণদের জন্য ঈর্ষণীয়।
এনসিপির ২৭ বছর বয়সী আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বার্ষিক আয় ১৬ লাখ টাকা, আয়কর রিটার্নে তিনি ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক (সম্মান)। হলফনামায় পেশা সম্পর্কে তিনি পরামর্শক হিসেবে কাজ করার কথা উল্লেখ করেছেন।
পরামর্শক হিসেবে নাহিদ ১৬ লাখ টাকা বছরে আয় করতেই পারেন। তিনি কিছুদিন আগেও সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা ছিলেন, ওপরের স্তরের অনেকের সঙ্গেই তাঁর পরিচয়। যুক্তরাষ্ট্রেও সরকারের ভূতপূর্ব মন্ত্রীদেরকে অনেক কোম্পানিই ‘লবিস্ট’ বা পরামর্শক হিসেবে ব্যবহার করে এবং অনেক টাকা ফি দেয়। সুতরাং নাহিদের বেশ টাকাকড়ি থাকলেও আশ্চর্যের কিছু নেই।
হাসনাত আবদুল্লাহ যিনি এনসিপির আরেকজন পদস্থ নেতা, তিনিও খুব পিছিয়ে নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করা হাসনাতের পেশা হিসেবে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে ব্যবসা। কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে এনসিপি মনোনীত প্রার্থী মো. আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) বছরে আয় সাড়ে ১২ লাখ টাকা। তাঁর স্থাবর-অস্থাবর মিলে ৫০ লাখ টাকার সম্পদ আছে।
নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ। হান্নান মাসউদের কাছে বর্তমানে টাকা রয়েছে ৩৫ লাখ। হলফনামায় হান্নান মাসউদ নিজেকে ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়েছেন। তিনি নিজেকে আলিম (উচ্চমাধ্যমিক সমমান) পাস উল্লেখ করে ঢাকায় একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক বলে উল্লেখ করেছেন। এতে তাঁর বাৎসরিক আয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তাঁর বাবা সারা জীবন শিক্ষকতা করে যে টাকা জমিয়েছেন, বিগত ১৮ মাসে তার চেয়ে তিনি ১৮ গুণ বেশি টাকা জমিয়েছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী পেশায় একজন মার্কেটিং কনসালট্যান্ট। তাঁর বার্ষিক মোট আয় চার লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৩ টাকা। নির্বাচনী হলফনামায় ৪০ লাখ টাকার সম্পদের হিসাব দিয়েছেন।
তুলনামূলকভাবে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা কিছুটা কম সম্পদের মালিক। সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে পদত্যাগ করা এই প্রার্থী পেশায় একজন চিকিৎসক, শিক্ষক এবং উদ্যোক্তা। নির্বাচনী হলফনামায় দেখা যায়, তাঁর দেশে সম্পদ রয়েছে ২২ লাখ ৩০ হাজার ১৯০ টাকার। বার্ষিক আয় সাত লাখ ১৩ হাজার ৫৯৭ টাকা।
তরুণ রাজনৈতিক নেতারা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাঁদের আর্থিক সাফল্যের মতো নির্বাচনেও সাফল্য আনতে পারবেন কি না, তা দেখার জন্য আমাদের নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
৫.
বিএনপির নেতা তারেক রহমান যেহেতু নির্বাচনে দুটি আসনে প্রতিযোগিতা করতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, তাঁকেও হলফনামা দাখিল করতে হয়েছে। তাঁর আয়কর রিটার্নে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সম্পদ আছে ১ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ১৮৫ টাকার। বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা। আয়কর দিয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৪৫৩ টাকা।
যাঁরা এত দিন টেবিল থাপড়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে ‘বড় ধনী কে— এই নিয়ে তর্ক-বিতর্কে অনেক সময় কাটিয়েছেন; তাঁরা দারুণ নিরাশ হবেন। আবার অনেকে বলবেন, রাজনৈতিক নেতাদের আর্থিক হিসাব-নিকাশ নিজের চেয়েও প্রতিপক্ষরাই বেশি জানেন। হয়তো কথাটায় কিছুটা সত্য আছে।
৬.
এই আর্থিক হিসাব–নিকাশ ও হলফনামায় আরও একটা বড় বিষয় লুকিয়ে আছে; সেটা হলো ‘গুডউইল’ বা সুনাম। মনোনয়নের সময় একজন নেতার যদি ভালো ভাবমূর্তি থাকে, তাহলে তিনি হলফনামায় যা–ই লিখবেন, তা–ই লোকে বিশ্বাস করবে। আর তিনি যদি ক্ষমতায় গিয়ে ভালো কাজ করতে পারেন, তখন তাঁর আর্থিক সম্পদের চেয়েও কাজের সুনামটাই বেশি বড় করে দেখা হবে।
একজন নেতা যদি ক্ষমতায় গিয়ে ভালো কাজ না করেন, তাহলে তিনি আর্থিক দুর্নীতি না করলেও লোকে বদনাম করবে। লোকে বলবে—‘দেশের উন্নতি হবে কী করে, নেতা যে সব লুটপাট করে খেয়েছেন’ কিংবা ‘বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়।’ এটাই আমাদের দেশের বাস্তবতা।
তাই বলছিলাম, একজন রাজনীতিবিদের অর্থের বৈধতা দেবে দেশের জন্য তাঁর ভালো কাজ এবং কাজ করে কুড়ানো সুনাম।
কথাটা বোধ হয় তারেক রহমানের জন্য আরও বেশি প্রযোজ্য, যদি তাঁর দল নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। বাবা ও মায়ের রেখে যাওয়া সুনাম বা গুডউইলের ভরসা না করে তাঁর কাজ হবে দেশকে শক্ত হাতে নেতৃত্ব দিয়ে নিজের জন্য গুডউইল তৈরি করা। তিনি যদি বিফল হন, তবে তাঁর হলফনামায় অনেক তারতম্য বের হয়ে আসবে এবং লোকজন বসে পড়বে টেবিল থাপড়ে তর্ক–বিতর্কে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব
