বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কি শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করবে, নাকি নতুন উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী নেতৃত্বও তৈরি করবে—এই প্রশ্ন এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একদিকে দেশে জাতীয় বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ, বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৫ দশমিক ৯০ লাখ; অন্যদিকে প্রতিবছর ২০-২২ লাখ তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। ২০২৩ সালে বেকারত্বের গড় হার ছিল ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ শ্রমবাজারে চাপ কমেনি; বরং শিক্ষিত তরুণদের উদ্বেগ বেড়েছে। এই বাস্তবতায় তরুণদের জন্য সিড ফান্ডিং কেন জরুরি—সেই প্রশ্ন এখন জাতীয় আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত।
এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সিড ফান্ডিংয়ের ধারণা তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সিড ফান্ডিং চালুর যে ঘোষণা বা অঙ্গীকার এসেছে, তা তরুণদের চাকরিনির্ভর মানসিকতা থেকে উদ্যোক্তামুখী চিন্তার দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এটিকে যদি উচ্চশিক্ষা সংস্কার ও কর্মসংস্থান কৌশলের অংশ করা যায়, তবে এটি কেবল একটি ঘোষণা নয়, বাস্তব পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে।
সিড ফান্ডিং কী
সিড ফান্ডিং বলতে বোঝায় কোনো নতুন উদ্যোগ, স্টার্টআপ বা উদ্ভাবনী ধারণাকে একেবারে শুরুর পর্যায়ে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া। যেমন কোনো শিক্ষার্থীর মাথায় যদি কৃষিপ্রযুক্তি, নিরাপদ খাদ্য, ডেইরি-পোলট্রি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা বা ডিজিটাল সেবা নিয়ে ভালো ধারণা থাকে, কিন্তু শুরু করার মতো অর্থ, প্রশিক্ষণ বা পরামর্শ না থাকে—সিড ফান্ডিং সেই প্রথম দরজাটি খুলে দিতে পারে।
অর্থাৎ এটি শুধু টাকা দেওয়ার বিষয় নয়; বরং একটি আইডিয়াকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়ার প্রাথমিক সহায়তা। এই সহায়তার সঙ্গে যদি প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ ও বাজারসংযোগ যুক্ত থাকে, তাহলে একজন শিক্ষার্থী শুধু চাকরি খোঁজার বদলে নিজেই কাজ তৈরির পথে হাঁটতে পারেন।
তরুণদের জন্য সিড ফান্ডিং কেন জরুরি
এই প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য শ্রমবাজারের বাস্তবতা দেখতে হবে। দেশে মোট শ্রমশক্তি ৭ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার, যার মধ্যে কর্মরত ৭ কোটি ৪ লাখ ৭০ হাজার। কিন্তু কর্মরত মানুষের একটি বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। অর্থাৎ কাজ আছে, কিন্তু মানসম্মত, স্থিতিশীল ও উৎপাদনশীল কাজের ঘাটতি রয়ে গেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন শ্রমশক্তির চাপ। প্রতিবছর ২০-২২ লাখ নতুন তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে আসেন। সবাইকে সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই নতুন কর্মসংস্থানের উৎস তৈরি করতে হবে। সেখানেই সিড ফান্ডিং জরুরি—কারণ এটি তরুণদের চাকরি খোঁজা থেকে কাজ তৈরি করার মানসিকতায় নিয়ে যেতে পারে।
টাকা দিলেই কি উদ্যোক্তা তৈরি হবে
না। শুধু টাকা দিলে উদ্যোক্তা তৈরি হয় না। একটি ভালো ধারণাকে টেকসই উদ্যোগে পরিণত করতে দরকার প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ, ব্যবসা পরিকল্পনা, বাজার বোঝার সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং জবাবদিহি। তাই সিড ফান্ডিং মানে শুধু অর্থ বিতরণ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সহায়ক কাঠামো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ইনোভেশন ও এন্টারপ্রেনিউরশিপ সেল গড়ে ওঠে, সেখানে শিক্ষক, গবেষক, সফল উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, শিল্প খাতের প্রতিনিধি ও প্রযুক্তিবিদদের যুক্ত করা হয়, তাহলে ফান্ড পাওয়া শিক্ষার্থীরা পথনির্দেশনাও পাবে। এতে অর্থ অপচয় কমবে, সফল উদ্যোগের সম্ভাবনা বাড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধু ডিগ্রি দেবে
এই সহায়ক কাঠামোর কথা বললেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা সামনে আসে। কারণ, শিক্ষিত বেকারত্বের চিত্র উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয় পাস বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। যুব বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, স্নাতক ও স্নাতকোত্তরদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। আবার বেকারদের ৮৩ শতাংশই তরুণ, যাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে।
এই পরিস্থিতি দেখায়, বিশ্ববিদ্যালয় যদি শুধু সনদ দেয়, তা যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা, উদ্ভাবন, সমস্যা সমাধান ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হতে হবে। কৃষি, নিরাপদ খাদ্য, ডেইরি, পোলট্রি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, পরিবেশ—বিভিন্ন খাতে শিক্ষার্থীদের আইডিয়াকে বাস্তব পণ্য বা সেবায় রূপ দিতে পারলে উচ্চশিক্ষার অর্থবহ ব্যবহার হবে।
রাষ্ট্রীয় ঘোষণা থেকে জাতীয় কর্মসূচি—কীভাবে
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নতুন ভূমিকা কার্যকর করতে হলে শুধু ক্যাম্পাসভিত্তিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। এখানে বাস্তবতার আরেকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বছরে গড়ে মাত্র ৭১ হাজার। ‘শোভন’ চাকরির এক-চতুর্থাংশই সরকারি খাতে। বিসিএসে একটি পদের বিপরীতে গড়ে ২০০ আবেদন পড়ে। আবার ৭৮ শতাংশ তরুণ কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন। অর্থাৎ তরুণদের বড় অংশ এখনো চাকরির সংকীর্ণ পথেই ভিড় করছে, আর সেই পথ সবার জন্য পর্যাপ্ত নয়।
তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিড ফান্ডিং উদ্যোগকে কেবল একটি প্রতিশ্রুতি হিসেবে না দেখে জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ফান্ড, আইডিয়া প্রতিযোগিতা, মেন্টরিং, প্রোটোটাইপ সহায়তা, শিল্প খাতের সংযোগ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ—এসব একসঙ্গে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে তরুণদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি হবে।
কোন খাতগুলো অগ্রাধিকার পাবে
জাতীয় কর্মসূচি হিসেবে ভাবলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—কোন খাতে এই সিড ফান্ডিং দেওয়া হবে? সিড ফান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে সেই খাতগুলোকে, যেগুলো বাংলাদেশের বাস্তব অর্থনীতি, জনজীবন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। যেমন কৃষিপ্রযুক্তি, নিরাপদ খাদ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ডেইরি ও পোলট্রি শিল্প, মৎস্য, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশবান্ধব পণ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল সেবা ও শিক্ষাপ্রযুক্তি।
এতে উদ্যোগগুলো শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসা হবে না; বরং জাতীয় সমস্যা সমাধানের অংশ হবে। ফলে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হবে, পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
ঢাকার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি সমান সুযোগ পাবে
কিন্তু খাত নির্ধারণের পাশাপাশি আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—এই সুযোগ কি শুধু রাজধানী বা বড় বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে? সুযোগ যদি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক হয়, তাহলে এ উদ্যোগের সুফল সীমিত থাকবে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ—সব অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তি আছে। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থানীয় সমস্যা ও সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করেই উদ্যোক্তা উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এতে সিড ফান্ডিং কাগজে নয়, বাস্তব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
স্বচ্ছতা না থাকলে উদ্যোগ ব্যর্থ হবে না তো?
তবে ভালো পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা না থাকলে পুরো উদ্যোগ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। যেকোনো ভালো উদ্যোগ স্বজনপ্রীতি, দলীয় বিবেচনা, কাগুজে প্রকল্প বা অস্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হতে পারে। তাই প্রকল্প বাছাই হতে হবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। স্বাধীন মূল্যায়ন বোর্ড থাকতে হবে। কে কত টাকা পেল, কেন পেল, কী অগ্রগতি হলো—এসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ধাপে ধাপে অর্থায়ন করলে জবাবদিহি বাড়বে।
শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা কী
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্যাম্পাসের ভেতরের নেতৃত্বও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শুধু ক্লাস নেওয়ার মানুষ নন; তিনি হতে পারেন মেন্টর, পরামর্শক ও উদ্ভাবনের পথপ্রদর্শক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে পারেন, পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিতে পারেন, ব্যর্থ হলেও শিখতে পারেন। উদ্যোক্তা তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে শিক্ষক-প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নই আসল
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের হালনাগাদ চিত্র স্পষ্ট—একদিকে ২৫ দশমিক ৯০ লাখ বেকার, অন্যদিকে প্রতিবছর ২০-২২ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে; একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পাস প্রায় ৮ লাখ বেকার, অন্যদিকে চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা। এই বাস্তবতায় তরুণদের জন্য সিড ফান্ডিং শুধু একটি অর্থায়ন উদ্যোগ নয়; এটি হতে পারে কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির বাস্তব পথ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ ঘোষণা বাস্তব রূপ পেলে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী তরুণও গড়ে তুলতে পারবে। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, মেন্টরশিপ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থাকলে সিড ফান্ডিং সত্যিই তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির নতুন পথ হয়ে উঠতে পারে।
• ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির শিক্ষক, গবেষক ও লেখক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। [email protected]