ইরানের বদলে যেভাবে তুরস্ক হয়ে উঠছে ইসরায়েলের জন্য হুমকি

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ (বাঁয়ে) ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসগ্লু। ইস্তাম্বুল, তুরস্ক, ২৯ জানুয়ারিছবি: রয়টার্স

তুরস্কের প্রতি কাতারের সমর্থন থাকায় এখন ইরানের বদলে তুরস্কই হয়ে উঠছে ইসরায়েলের জন্য বড় কৌশলগত হুমকি। এ কথা ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের। তাঁর এ আলাপ শুধু সাধারণ সতর্কবার্তা নয়, বরং গভীর উদ্বেগের প্রকাশ। ইসরায়েল হয়তো এমন এক সময়ের দিকে যাচ্ছে, যখন দেশটিকে আবারও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ কোনো দেশের সঙ্গে নতুন করে টানাপোড়েনে জড়াতে হতে পারে। এই পরিস্থিতির ঐতিহাসিক দিকও রয়েছে।

অনেক বছর ধরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা চিন্তার মূল কেন্দ্র ছিল ইরান ও তার শিয়া জোট। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র এবং সিরিয়া ও লেবাননে অঘোষিত সংঘাত—সবকিছু মিলিয়ে ইসরায়েলের নীতি ও কৌশল গড়ে উঠেছে মূলত তেহরানকে সামনে রেখে।

কিন্তু বেনেটের বক্তব্য বলছে, পরিস্থিতি বদলাতে পারে। ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক অর্থনীতির দিক থেকে শক্তিশালী। বিশ্বরাজনীতিতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধারণ করা দেশটি একটি সুন্নি জোট গড়ে তুলছে। অনেকের মতে, এই জোট ভবিষ্যতে ইরানের শিয়া জোটের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।

তুরস্ককে নতুন 'ইরান' হিসেবে দেখলে ভুল কৌশলগত সিদ্ধান্ত হতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় সংঘাতের পথ খুলে যেতে পারে। আলতুনিশিকের মতে, তুরস্ককে নতুন ইরান হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তা উত্তেজনা কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক মেলিহা আলতুনিশিকের মতে, রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান দক্ষ ও হিসাবি নেতা। তিনি বোঝেন, কীভাবে আদর্শকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হয়। ইরানের মতো শুধু কঠোর আদর্শিক অবস্থানে না থেকে তুরস্ক বাস্তবতা ও মতাদর্শ দুটোই একসঙ্গে ব্যবহার করে। এ কারণেই তুরস্ককে একদিকে গ্রহণযোগ্য মনে হয়, আবার অন্যদিকে তাদের কৌশল পুরোপুরি অনুমান করা কঠিন।

ইসরায়েলি কৌশলবিদদের মতে, শুধু তুরস্ক নয়, তুরস্ক ও কাতারের একসঙ্গে অবস্থানই বড় উদ্বেগের কারণ। তাদের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ আছে। ইসরায়েলি কৌশলবিদেরা মনে করছে, তারা এমন একটি আদর্শিক প্রভাব ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা ইরানের শিয়া কট্টরপন্থার মতোই শক্তিশালী হতে পারে।

সিরিয়া ও গাজায় তাদের প্রভাব বাড়ছে বলেও মনে করা হচ্ছে। এমনকি সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সম্পর্কোন্নয়ন থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, তুরস্ক ও কাতারের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান যুক্ত হয়ে নতুন একটি শক্তিশালী জোট গড়ে উঠতে পারে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক স্টিভেন কুকের মতে, এত দিন ইসরায়েল তার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা সাজিয়েছে ইরানের সামরিক শক্তিকে সামনে রেখে।

কিন্তু তুরস্ক যদি সৌদি আরবকে নিজের দিকে টানতে পারে বা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে, তাহলে পুরো কৌশলগত চিত্র দ্রুত বদলে যেতে পারে। তখন উদ্বেগ শুধু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন একটি সুন্নি শক্তির সম্ভাবনাও সামনে আসবে।

ইসরায়েল ও তুরস্কের বিরোধ শুধু মতাদর্শ বা সামরিক বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়, এর অর্থনৈতিক দিকও আছে। ২০২৪ সালের মে মাসে তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করে দেয়। এর আগে সিমেন্ট, অ্যালুমিনিয়াম, সারসহ ৫৪টি পণ্যের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ অভিযোগ করেন, হামাসকে সমর্থন দিতে গিয়ে এরদোয়ান নিজের দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছেন। ইসরায়েলের কাছে এই বাণিজ্য বয়কট শুধু বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি স্পষ্ট বার্তাও। তুরস্ক চাইলে তার অর্থনৈতিক শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে পারে।

জি-টুয়েন্টির অন্তর্ভুক্ত দেশ হিসেবে তুরস্কের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। বাণিজ্য বিশ্লেষক সানি মানের মতে, শুধু রাজনৈতিক কারণে এভাবে পুরোপুরি বাণিজ্য বন্ধ করার ঘটনা তুরস্কের ক্ষেত্রে আগে দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার পেছনে ইতিহাসও বড় ভূমিকা রাখছে। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিন ছিল উসমানীয় খিলাফতের অধীন। তাই বিষয়টির সঙ্গে একধরনের ঐতিহাসিক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

এরদোয়ান প্রায়ই উসমানীয় ঐতিহ্য ও প্রতীকের কথা বলেন এবং তুরস্ককে মুসলিম ভূখণ্ডের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেন। আরিয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আসা ওফিরের মতে, তুরস্কের অনেক মানুষের কাছে ফিলিস্তিন প্রশ্নটি শুধু সংহতির বিষয় নয়, বরং ঐতিহাসিক দায়িত্ব ও উত্তরাধিকারের অংশ।

এই ঐতিহাসিক দিকটি ইসরায়েলের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। ইরান শিয়া মতাদর্শভিত্তিক এবং অনেক আরব সমাজের কাছে সাংস্কৃতিকভাবে কিছুটা দূরের দেশ। কিন্তু তুরস্ক ওই অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

উসমানীয় ঐতিহ্যের কারণে এরদোয়ানের বক্তব্য অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়, যা ইরানের বিপ্লবী ভাষণে দেখা যায় না। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েলের এই সতর্কবার্তা কি বাস্তব পরিস্থিতির মূল্যায়ন, নাকি রাজনৈতিক উসকানি?

অনেকে মনে করেন, এটি ভবিষ্যৎ সংঘাতের জন্য প্রস্তুতির বার্তা, যা প্রয়োজনে আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার যুক্তি তৈরি করতে পারে।

আবার অন্যরা সতর্ক করছেন, তুরস্ককে নতুন 'ইরান' হিসেবে দেখলে ভুল কৌশলগত সিদ্ধান্ত হতে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় সংঘাতের পথ খুলে যেতে পারে। আলতুনিশিকের মতে, তুরস্ককে নতুন ইরান হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তা উত্তেজনা কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

মোশে দায়ান সেন্টারের গবেষক জনাথন ঘারিয়ানির মতে, ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্ক সব সময়ই টানাপোড়েনের মধ্যে ছিল। কখনো সহযোগিতা, কখনো সংঘাত।

নব্বইয়ের দশকে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। ৭ অক্টোবরের পর উত্তেজনা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু এমন টানাপোড়েন আগে কখনো হয়নি—এমনও নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ঝুঁকি ও গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

তুরস্ককে ইসরায়েলের পরবর্তী ‘ইরান’ হিসেবে দেখার ধারণার পেছনে শুধু চারদিক থেকে ঘেরাও হওয়ার ভয় কাজ করছে না। এর সঙ্গে আছে এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর আশঙ্কা, যে শুধু আদর্শভিত্তিক নয়, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং যার সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে।

ইরানকে ইসরায়েল বিপজ্জনক মনে করে, তবে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এবং নানা নিষেধাজ্ঞার মুখে। তুরস্কও ইসরায়েলের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে, কিন্তু সে একই সঙ্গে বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এবং একটি বড় বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রভাবশালী।

বেনেটের বক্তব্য সতর্কবার্তা হোক বা রাজনৈতিক কৌশল, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। ইসরায়েল এখন শুধু শত্রুর বৈরিতাকেই গুরুত্ব দিচ্ছে না, তাদের সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতাকেও বিবেচনায় নিচ্ছে।

জেরুজালেমের নীতিনির্ধারকেরা আবেগি কথা আর বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য কতটা ঠান্ডা মাথায় বিচার করতে পারবেন, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে। তা না হলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও নতুন এক সংঘাতের ঘূর্ণিতে জড়িয়ে পড়তে পারে, যেখানে তুরস্ক হয়ে উঠবে প্রধান কেন্দ্র।

  • জাসিম আল-আজ্জাবি মধ্যপ্রাচ্যের সাংবাদিক

    মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত