তাহলে কি সিরিয়ার দীর্ঘ সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি হতে চলেছে?
২০ জানুয়ারি কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয় সিরিয়া। এর আগে সরকারি বাহিনী দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেয়। এই চুক্তির ফলে পূর্ব সিরিয়ার বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ এখন কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ফিরে আসবে এবং এসডিএফ যোদ্ধাদের সিরিয়ান সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই চুক্তি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে এটি এসডিএফের ভেঙে পড়া এবং উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা কুর্দি স্বায়ত্তশাসনের অবসানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আহমেদ আল–শারার নেতৃত্বে ২০১২ সালের পর এই প্রথম দামেস্ক সরকার সিরিয়ার বিশাল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করল। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত এসেছে ওয়াশিংটন থেকে।
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় গঠিত হওয়ার পর থেকেই এসডিএফ নিজেকে ওয়াশিংটনের সুরক্ষিত মিত্র হিসেবে দেখে এসেছে। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সহযোগী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নীরবে সেই অবস্থান বদলেছে।
গত বছরের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আহমেদ আল-শারার বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আইএসবিরোধী জোটে যোগ দেয় সিরিয়া। এতে ওয়াশিংটনের কাছে এসডিএফের কৌশলগত গুরুত্ব কার্যত ফুরিয়ে যায়।
এই কারণে আল–শারার সেনাবাহিনী যখন এসডিএফের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়েছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র যে এতে সম্মতি দিয়েছে, সেটা মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না।
পিছু হটছে ওয়াশিংটন
২০ জানুয়ারি তুরস্কে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-বিরোধী প্রধান শক্তি হিসেবে সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) যে মূল ভূমিকা ছিল, তা এখন অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে।’
ওয়াশিংটনের এই অবস্থানকে প্রকাশ্য বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন এসডিএফ ও অনেক কুর্দি। টম ব্যারাকের বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এসডিএফ কমান্ডার মাজলুম আবদি। তাঁর অভিযোগ, যেকোনো সমঝোতায় কুর্দিরা কুর্দি–অধ্যুষিত এলাকা নিজেরা শাসন করতে পারবে এবং তাদের সুরক্ষায় কিছু এসডিএফ যুদ্ধ ইউনিট টিকে থাকবে, আগের দেওয়া এমন প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছেন টম ব্যারাক।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবস্থান পরিবর্তনের ঘটনা নতুন কিছু নয়।
প্রথম মেয়াদেই ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দফায় এসডিএফকে পরিত্যাগ করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ইসলামিক স্টেট পরাজিত বলে ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প পূর্ব সিরিয়ায় মোতায়েন করা দুই হাজারের বেশি মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করার কথা বলেছিলেন। এতে এসডিএফকে একেবারে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেওয়া হচ্ছিল। পরে তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের হস্তক্ষেপে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন ট্রাম্প।
২০১৯ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প আবারও প্রায় এক হাজার সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। ঠিক একই সময় তাল–আবিয়াদের কাছে এসডিএফ অবস্থানে হামলা চালায় তুরস্ক। তবে পেন্টাগনের আপত্তিতে ট্রাম্প আবারও পিছু হটতে বাধ্য হন। তাদের আশঙ্কা ছিল, এসডিএফকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করলে রাশিয়া ও এর মিত্র তৎকালীন সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ লাভবান হবেন। সে সময় তুরস্কের বিরুদ্ধে বিকল্প সুরক্ষাকারী হিসেবে আসাদের সঙ্গে মৈত্রী করারও আলোচনা করেছিলেন মাজলুম আবদি।
কুর্দি স্বায়ত্তশাসনের এই অধ্যায় হয়তো শেষের পথে। তবে ভবিষ্যতে সিরিয়া কিংবা অন্য কোথাও, বৃহত্তর স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো শক্তির কুর্দি যোদ্ধাদের প্রয়োজন হলে নতুন আরেকটি অধ্যায় শুরু হতে পারে। আশঙ্কা থেকেই যায়, স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রথমে সমর্থন দিয়ে এরপর পরিত্যাগ করে চলে যাওয়ার সেই পুরোনো চক্রটি আবারও ফিরে আসবে কি না।
বাধা এখন অনেক কম
ট্রাম্পের অবস্থান কখনোই বদলায়নি। তিনি বরাবরই সিরিয়া থেকে অবশিষ্ট মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে ছিলেন। টম ব্যারাকও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘সিরিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আগ্রহ নেই।’
এবারের বাস্তবতা ২০১৮ বা ২০১৯ সালের মতো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন ট্রাম্প। পেন্টাগন কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা এখন আর আগের মতো ট্রাম্পের বিরোধিতা করতে আগ্রহী নন।
সিরিয়ায় আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। সিরিয়ায় ঘাঁটি থাকলেও রাশিয়ার প্রভাবও কমেছে। ফলে এসডিএফকে ছেড়ে দিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীরা লাভবান হবে—এই আশঙ্কাও এখন তুলনামূলক কম।
এর পাশাপাশি ইসলামিক স্টেট–বিরোধী লড়াইয়ে ওয়াশিংটনের প্রধান অংশীদার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা আহমেদ আল-শারার প্রস্তাব এসডিএফের ওপর নির্ভরতার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। কারণ, শারা একজন স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের প্রতিনিধি, আর এসডিএফ একটি অ-রাষ্ট্রীয় বাহিনী। এ ছাড়া এসডিএফকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র তুরস্ক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের কারণে কিছু প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। মিত্র পরিত্যাগ করা ভালো বার্তা দেয় না। তবে এসব বিবেচনায় ট্রাম্প খুব একটা পাত্তা দেন না।
বিশ্বাসঘাতকতার পুনরাবৃত্তি
সিরিয়ার কুর্দিদের এভাবে বিক্রি করে দেওয়ার নজিরটি ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি কুর্দিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসঘাতকতার সর্বশেষ উদাহরণ।
২০১৭ সালে স্বাধীনতা নিয়ে অনানুষ্ঠানিক স্বাধীনতা গণভোটের পর বাগদাদ সরকার যখন কিরকুক দখল করে নেয়, তখন ইরাকি কুর্দি মিত্রদের কোনো সহায়তা দেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এরও আগে, ১৯৯১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের উৎসাহে ইরাকি কুর্দি ও শিয়ারা সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ওয়াশিংটন প্রত্যাশিত সামরিক সহায়তা দেয়নি। এর ফলে বাগদাদ সরকার অনেক বিদ্রোহীকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। যদিও এরপর পশ্চিমা দেশগুলোর সুরক্ষায় একটি কুর্দি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গড়ে ওঠে।
১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রেজা শাহ পাহলভির মিত্র হিসেবে বাগদাদের বিরুদ্ধে ইরাকি কুর্দি বিদ্রোহীদের গোপনে সহায়তা করেছিল। কিন্তু ইরান ও ইরাকের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ওয়াশিংটন তাদের পরিত্যাগ করেছিল। এর পরপরই কুর্দিদের মিত্রদের ওপর ভয়াবহ দমন–পীড়ন নেমে আসে।
সর্বশেষ পরাজয়ের গ্লানি যখন থিতু হয়ে আসবে, তখন মাজলুম আবদি ও এসডিএফের নেতাদের হয়তো আত্মপোলব্ধি হবে, মার্কিনদের ওপর ভরসা করাটা তাঁদের জন্য কতটা কৌশলগত ভুল ছিল।
কুর্দিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অতীত বিশ্বাসঘাতকতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান থেকে জো বাইডেন প্রশাসনের সেনা প্রত্যাহারের মতো ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে অনেকেই বলবেন, ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করাটা কুর্দিদের জন্য ছিল বোকামি।
বাস্তবে, ২০১৮ সালেই হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ এসডিএফকে সঠিকভাবেই সতর্ক করেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কখন, কাকে বিক্রি করে দেবে—আপনি তা জানেন না।’
সামনে বিকল্প কম
এসডিএফ জানে, স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার লক্ষ্যে থাকা প্রতিটি কুর্দি আন্দোলনের মতো তারাও শুরু থেকেই দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। কুর্দি–অধ্যুষিত অঞ্চল ঘিরে থাকা চার রাষ্ট্র—তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক ও ইরান—সবকটিই কুর্দি স্বাধীনতার বিরোধী। দেশগুলো বারবার করে কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের উদ্যোগ দমনের চেষ্টা করেছে।
এই বাস্তবতা কুর্দি জাতীয়তাবাদীদের যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কখনো কখনো ইসরায়েলের মতো বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।
কিন্তু সিরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এর ফলে তারা এমন শক্তির ওপর নির্ভর করে, যাদের অগ্রাধিকার যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। এতে পরিত্যক্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। তবু কৌশলগতভাবে দুর্বল অবস্থানের কারণে তাদের সামনে বিকল্প খুবই কম।
কুর্দি স্বায়ত্তশাসনের এই অধ্যায় হয়তো শেষের পথে। তবে ভবিষ্যতে সিরিয়া কিংবা অন্য কোথাও, বৃহত্তর স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো শক্তির কুর্দি যোদ্ধাদের প্রয়োজন হলে নতুন আরেকটি অধ্যায় শুরু হতে পারে। আশঙ্কা থেকেই যায়, স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রথমে সমর্থন দিয়ে এরপর পরিত্যাগ করে চলে যাওয়ার সেই পুরোনো চক্রটি আবারও ফিরে আসবে কি না।
ক্রিস্টোফার ফিলিপস লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং দ্য ব্যাটল ফর সিরিয়া বইয়ের লেখক
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত