আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে নতুন লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনফাইল ছবি: রয়টার্স

আমেরিকায় নির্বাচনী এলাকার সীমানা নতুন করে নির্ধারণ নিয়ে যে রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়েছে, তা এখন রিপাবলিকান পার্টির সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী কৌশলকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নিয়ন্ত্রিত আইনসভা এবং দুর্বল বিচারব্যবস্থার সহায়তায় এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে। তবে এখন এটি কেবল একটি নির্বাচনী কৌশল নয়; বরং প্রতিনিধিত্বের অর্থ নিয়ে এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

জেরিম্যান্ডারিং বলতে বোঝায় রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনী এলাকার সীমানা আঁকা। এটি আমেরিকার ইতিহাসের পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলগুলোর একটি। এই শব্দের উৎপত্তি হয় এলব্রিজ গেরির নাম থেকে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের একজন এবং পরে দেশটির পঞ্চম ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। ১৮১২ সালে ম্যাসাচুসেটসের গভর্নর থাকাকালে তিনি এমনভাবে সিনেট নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করেন, যাতে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানরা (যাঁরা আজকের ডেমোক্রেটিক পার্টির পূর্বসূরি) অতিরিক্ত সুবিধা পান। সেই এলাকার আকৃতি সালামান্ডারের মতো হওয়ায় এক সংবাদপত্র এই কৌশলকে বিদ্রূপ করে ‘জেরিম্যান্ডারিং’ নাম দেয়।

আরও পড়ুন

গত কয়েক দশকে এই কৌশলের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন রিপাবলিকানরা। বারাক ওবামার দুই মেয়াদের সময় তাঁরা প্রায় এক হাজার অঙ্গরাজ্য আইনসভা আসন জিতে নেন, যার ফলে বহু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আইনসভা রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত হয় এবং অঙ্গরাজ্য রাজনীতির ভারসাম্য বদলে যায়। ডেমোক্র্যাটরাও কিছু ক্ষেত্রে একই কৌশল ব্যবহার করেছেন, তবে তাঁরা সাধারণত এটিকে ‘ন্যায্যতা’র যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন এবং অঙ্গরাজ্য রাজনীতিকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছেন; কারণ তাঁরা মনে করতেন, মূল ক্ষমতা ওয়াশিংটনের কেন্দ্রীয় সরকারে।

এর গভীরে গেলে দেখা যায়, ক্ষমতা অর্জনের জন্য রিপাবলিকানদের যে কোনো সীমা পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত থাকার বিষয়টি ডেমোক্র্যাটরা দীর্ঘদিন ধরেই যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বোঝেননি। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্ব নেওয়ার পর থেকে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন দলটির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতা দখল, তা ধরে রাখা এবং আরও বিস্তৃত করা।

গত বছর রিপাবলিকান–শাসিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানরা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের নির্বাচনী মানচিত্র নিজেদের পক্ষে সাজানোর চেষ্টা করেন। এর জবাবে ডেমোক্র্যাটরা এবার সরাসরি পাল্টা পদক্ষেপ নেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় গণভোটের মাধ্যমে তাঁরা ‘নির্বাচনী কারচুপির জবাব আইন’ পাস করেন, যার ফলে রাজ্যটিতে রিপাবলিকান আসন প্রায় সম্পূর্ণভাবে কমে যায়।

তবে এই লড়াইয়ে সব জায়গায় ডেমোক্র্যাটরা সফল হননি। ভার্জিনিয়ায় একটি গণভোটের মাধ্যমে এমন একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, যাতে কংগ্রেসের ১১টি আসনের মধ্যে ১০টি ডেমোক্র্যাটদের জন্য নিশ্চিত করা যায়; কিন্তু রাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট আইনি সমস্যার কারণে তা বাতিল করে দেয়। ফলে সেখানে আগের মতোই ৬–৫ আসনের বিভাজন বহাল থাকে।

এরপর বিচার বিভাগও ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। নির্বাচনী মানচিত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণত ১৯৬৫ সালের ভোটাধিকার আইন ব্যবহার করা হতো; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট গত এক দশকে ধীরে ধীরে এই আইনের কার্যকারিতা কমিয়ে আনে এবং শেষ পর্যন্ত এক রায়ে এর গুরুত্বপূর্ণ ধারা কার্যত অকার্যকর করে দেয়, যা ভোট প্রক্রিয়ায় বর্ণভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করত।

আরও পড়ুন

এই রায় ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যেই একাধিক রিপাবলিকান-শাসিত অঙ্গরাজ্য কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা ভেঙে নতুন করে মানচিত্র আঁকতে শুরু করে। লুইজিয়ানার রিপাবলিকান গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রি এমনকি চলমান প্রাইমারি নির্বাচন স্থগিত করে দেন, যাতে নতুন সীমানা অনুযায়ী ভোট পুনর্গঠন করা যায়।

যেসব মানুষ ইতিমধ্যে ভোট দিয়েছিলেন, তাদের ভোট কার্যত অর্থহীন হয়ে যায়—যা ছিল একেবারেই নজিরবিহীন ঘটনা। ল্যান্ড্রি এক নির্বাহী আদেশে ‘ভোটার নিরাপত্তা, অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা রক্ষা’র মতো অস্পষ্ট যুক্তি দেন এবং স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা তা মেনে নেন। এতে স্পষ্ট হয়, আমেরিকার বিকেন্দ্রীভূত ও দুর্বলভাবে পরিচালিত নির্বাচনব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণা যত এগোচ্ছে, দুই দলই তাদের দুর্বল দিকগুলো আবারও প্রকাশ করছে। ৪৩৫টি হাউস আসনের মধ্যে মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ এখন সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। রিপাবলিকানরা দাবি করছে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে দেশ নিরাপদ, অর্থনীতি শক্তিশালী এবং মানুষ ভালো আছে—যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ডেমোক্র্যাটরা আবার মূলত নিয়ম পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অর্থাৎ তারা খেলাটির নিয়ম বদলাতে চায়।

ডেমোক্র্যাটরা আরও ভালো করতে পারতেন। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জীবনযাত্রার ব্যয়–সংকটের ফলে। এতে নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের বড় সুবিধা তৈরি হয়েছে; তবুও দলটি মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য একটি স্পষ্ট ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে ব্যর্থ।

এর ফলে গত দেড় বছরে ডেমোক্র্যাটরা কার্যকর বিরোধী দল হিসেবেও নিজেদের প্রমাণ করতে পারেনি। এমনকি হাউস সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিসের মতো নেতাদের ‘আমরা নভেম্বরে জিতব’ বা ‘অতি দক্ষিণপন্থী চরমপন্থীদের পরাজিত করব’—এই ধরনের বক্তব্যও এখন অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।

ভার্জিনিয়ার আইনি পরাজয় এবং ভোটাধিকার আইনের দুর্বল হয়ে পড়া ডেমোক্র্যাটদের দাতা ও কর্মীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে রিপাবলিকানদেরও মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য কোনো আকর্ষণীয় বা গঠনমূলক রাজনৈতিক পরিকল্পনা নেই। ফলে দুই দলের কাছেই এখন মূল অস্ত্র হয়ে উঠেছে কৌশল, নীতি নয়। এই বাস্তবতাই জেরিম্যান্ডারিং নিয়ে চলা লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় সত্য তুলে ধরে।

ফলে ভোটারদের সামনে আবারও খুব সীমিত বিকল্প—খারাপ আর আরও খারাপের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়া। শেষ পর্যন্ত যে দলই জিতুক, আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো সমাধানহীনই থেকে যাবে।

  • রিড গ্যালেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন দ্য লিংকন প্রজেক্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা।

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত