গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। জাতিসংঘের কোনো অনুমোদন তো দূরের কথা, কোনো পূর্বঘোষণাও ছিল না। ওই হামলায় ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
তার মাত্র দুই মাস আগে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি চমকপ্রদ অভিযান চালায়। মার্কিন বিশেষ বাহিনী কারাকাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বাসভবনে অভিযান চালিয়ে তাঁকে অপহরণ করে। পরে তাঁকে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ফেডারেল আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ দুই ঘটনার মাঝখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও একাধিক নাটকীয় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জাতিসংঘের ৩১টি সংস্থাসহ মোট ৬৬টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন। পাশাপাশি তিনি ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করেন, যার চেয়ারম্যান তিনি নিজেই। ট্রাম্প এমনও ইঙ্গিত দেন—এ প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে জাতিসংঘের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, ১৯৪৫ সালে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, আজ তা আর তাদের স্বার্থ পূরণ করছে না।
প্রায় আট দশক ধরে এই আন্তর্জাতিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও সামরিক শক্তি ব্যয় করেছে। এই শক্তি কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু সেই অঙ্গীকারের পরিসর ছিল বিস্ময়কর। আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি করতে যুক্তরাষ্ট্রকে কেউ বাধ্য করেনি। তারা নিজেই সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্ব ১৯৪৫ সালের বিশ্বের মতো নেই। ইউরোপ পুনর্গঠিত হয়েছে। চীন একটি বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং উপসাগরীয় অনেক দেশ এখন ধনী রাষ্ট্র। ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, ভারত, ভিয়েতনামসহ আরও অনেক দেশ দ্রুত উত্থান ঘটাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আজকের বিশ্ব যে হুমকির মুখোমুখি, জাতিসংঘ সনদ রচনার সময় সেগুলোর অনেকটাই কল্পনার বাইরে ছিল। ফলে মার্কিন নাগরিকেরা যদি প্রশ্ন তোলেন—এমন এক ব্যবস্থার (যার জন্ম হয়েছিল এক ভিন্ন যুগে) জন্য কেন তাঁদের এখনো অসমানভাবে বড় দায়ভার বহন করতে হবে, তা অযৌক্তিক নয়।
১৯৪৫ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি উদার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—পিছু হটার বদলে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সেই সিদ্ধান্তই আমাদের পাওয়া পৃথিবীকে গড়ে দিয়েছে।
তবে এখানেই মূল প্রশ্ন উঠে আসে—বাকি বিশ্ব কী করতে চায়? দীর্ঘদিন ধরে বহুপক্ষীয়তা যেন এমন একটি ব্যবস্থা ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছে আর অন্যরা ব্যবহার করেছে।
ইউরোপের অনেক দেশ মার্কিন নিরাপত্তা–ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছে, আবার একই সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনাও করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের দাবি তুলেছে, কিন্তু অর্থের জন্য নির্ভর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। আর ক্যারিবীয় অঞ্চলের মতো ছোট দেশগুলো আন্তর্জাতিক আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে, কিন্তু তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে সামান্যই।
যদি সত্যিই আমরা এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে মূল্য দিই, তবে এখন সেই মূল্য শুধু কথায় নয়, সম্পদ দিয়েও প্রমাণ করতে হবে।
এর একটি শক্তিশালী প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে জাতিসংঘ সদর দপ্তর নিউইয়র্ক থেকে সরিয়ে নেওয়া। একটি দেশ যখন জাতিসংঘের এতগুলো সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে, তখন কেন বিশ্ব সংস্থাটি সেই দেশের মধ্যেই থাকবে?
সদর দপ্তর স্থানান্তর করা হলে সেটি হবে একটি বাস্তবতার স্বীকৃতি। একই সঙ্গে এটি জানিয়ে দেবে—মার্কিন অংশগ্রহণ থাকুক বা না থাকুক, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায় এবং তার ব্যয়ভারও বহন করতে প্রস্তুত।
নতুন সদর দপ্তরের জন্য বিকল্পও কম নয়। নিরপেক্ষতার জন্য জেনেভা বা ভিয়েনা উপযুক্ত হতে পারে। আবার নাইরোবি বা রিও ডি জেনিরো হলে সংগঠনটি আরও স্পষ্টভাবে গ্লোবাল সাউথের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে।
একটি দ্বীপরাষ্ট্রও হতে পারে সম্ভাব্য স্থান—অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, বার্বাডোস, জ্যামাইকা কিংবা মরিশাস। এতে একটি বার্তাও যাবে। তা হলো—এটি এখন শক্তিধরদের নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল দেশগুলোর প্রতিষ্ঠান।
বিশ্ব যখন যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক উদ্ধার কর্মসূচির জন্য ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে, তখন জাতিসংঘ সদর দপ্তর সরানোর খরচ জোগাড় করাও অসম্ভব নয়।
তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতিসংঘের অর্থায়নের নতুন কাঠামো। বর্তমানে জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশই আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তাদের অবদান আরও বেশি। এই নির্ভরতা ওয়াশিংটনকে অতিরিক্ত প্রভাব দিয়েছে এবং সংস্থাটিকে প্রায়ই মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কাছে বন্দী করে তুলেছে।
যদি আমরা সত্যিই বহুপক্ষীয়তাকে গুরুত্ব দিই, তবে এই ঘাটতি পূরণ করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপান, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে তাদের স্বার্থের অনুপাতে অবদান রাখতে হবে।
বিস্তৃত অর্থায়ন কাঠামো শুধু জাতিসংঘকে টিকিয়ে রাখবে না, বরং বহুদিন ধরে প্রত্যাশিত বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিকীকরণও সম্ভব করবে।
এই সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে চলমান সংকটগুলোর কারণে। ইরানের ওপর হামলা মধ্যপ্রাচ্যে বড় আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এতে উপসাগরীয় দেশগুলো জড়িয়ে পড়তে পারে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে এবং দুর্বল অর্থনীতিগুলো মন্দার মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের ঘটনা লাতিন আমেরিকাকে অস্থিতিশীল করেছে। এটি এমন এক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, যেখানে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রপ্রধানই একতরফা শক্তি প্রয়োগের বাইরে নন।
এরই মধ্যে গাজা ও সুদানে যুদ্ধ চলছে। পূর্ব কঙ্গোতে সংঘাত থামছে না। আর বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো।
ভেটো কাঠামোর কারণে প্রতিটি ক্ষেত্রেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। কারণ, সেখানে শক্তিধরদের স্বার্থ দুর্বলদের প্রয়োজনকে চাপা দেয়।
যদি জাতিসংঘ নতুনভাবে সংগঠিত হয়, বিস্তৃত অর্থায়নে চলে এবং কোনো একক পৃষ্ঠপোষকের ওপর নির্ভরশীল না থাকে, তাহলে হয়তো এসব সংকটের রাতারাতি সমাধান হবে না। কিন্তু অন্তত সংস্থাটি বেশি বৈধতা নিয়ে কাজ করতে পারবে এবং দ্বিচারিতা কমবে।
তখন হয়তো কোনো সদস্যের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বাধা ছাড়াই মানবিক করিডর অনুমোদন করা সম্ভব হবে। জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীলতা নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকা যাবে। যুদ্ধের অভিঘাতে বিপর্যস্ত অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য ঋণমুক্তির সমন্বয় করা যাবে। এমনকি শান্তিরক্ষা মিশনও আর কোনো এক দেশের বাজেট রাজনীতির ওপর নির্ভর করবে না।
বাস্তবতা হলো, সংস্কার করা একটি জাতিসংঘ নিখুঁত হবে না। কিন্তু বর্তমান কাঠামো এতটাই সীমাবদ্ধ যে জরুরি বৈশ্বিক সংকটে কার্যকর প্রতিক্রিয়া দেওয়া তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
প্রতিটি মাসের নিষ্ক্রিয়তা জাতিসংঘের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থাও কমে যাচ্ছে।
জলবায়ু ব্যবস্থাপনাতেও দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার ফলে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপ্টেশন ফান্ড এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ ব্যবস্থাগুলো হুমকির মুখে পড়েছে।
ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র ও জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য এগুলো কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এগুলো তাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
মার্কিন অংশগ্রহণ ছাড়াই জলবায়ু অর্থায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলার সময় খুব বেশি নেই, তবে সুযোগ এখনো রয়েছে। ইউরোপকে তার জলবায়ু নেতৃত্ব বাস্তব অর্থায়নের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। আর বিশ্বের বৃহত্তম নির্গমনকারী চীন চাইলে নৈতিক নেতৃত্ব দাবি করার জন্য বড় অবদান রাখতে পারে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য এই পরিবর্তন একদিকে বিনয় দাবি করে, অন্যদিকে উচ্চাকাঙ্ক্ষাও। বিনয়—কারণ, এত দিন আমরা এমন কাঠামোর ওপর নির্ভর করেছি, যার অর্থায়নে আমাদের অবদান ছিল সামান্য। আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা—কারণ, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আমাদের রয়েছে ১৪টি ভোট, জলবায়ু সংকটের সম্মুখসারির অভিজ্ঞতা এবং নিজের ওজনের চেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারের ঐতিহ্য।
ক্যারিবীয় কমিউনিটি বা ক্যারিকম চাইলে সদর দপ্তর স্থানান্তর ও অর্থায়ন সংস্কার নিয়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে। সমমনা রাষ্ট্রগুলোকে একত্র করতে পারে। এমনকি বৈশ্বিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে আঞ্চলিক স্তম্ভ হিসেবে ক্যারিবীয় কোর্ট অব জাস্টিসকে শক্তিশালী করতে পারে।
ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র, আফ্রিকা এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের অন্যান্য জোট যদি একসঙ্গে কাজ করে, তবে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার মতো সংখ্যাগত শক্তি তাদের আছে।
সবকিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। তার সামরিক শক্তি সবচেয়ে বেশি। বৈশ্বিক অগ্রগতির পেছনে থাকা বহু প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, করপোরেশন ও নাগরিক সংগঠনের আবাসও সেই দেশ।
বহুপক্ষীয়তায় বিশ্বাসী মার্কিন নাগরিকের সংখ্যাও কম নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার এই ব্যবস্থায় ফিরে আসতে চায়, সেই দরজা সব সময় খোলা থাকা উচিত।
কিন্তু বিশ্বের বাকি অংশ অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে পারে না—মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কবে স্থিতিশীল হবে তার জন্য।
আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক—কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে।
১৯৪৫ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি উদার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—পিছু হটার বদলে একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সেই সিদ্ধান্তই আমাদের পাওয়া পৃথিবীকে গড়ে দিয়েছে।
২০২৬ সালে একটি ভিন্ন যুক্তরাষ্ট্র ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বাস্তবতাকে ক্ষোভ নয়, ঠান্ডা মাথায় মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সি জাস্টিন রবিনসন অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাইভ আইল্যান্ডস ক্যাম্পাসের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও ক্যাম্পাস প্রিন্সিপাল।
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ