নেকড়ের স্বাধীনতা মানে ছাগলের মরণ

হ্যাঁ, আমাদের ভীষণভাবেই একটি মুক্তবাজার দরকার; তবে সেই বাজারকে একচেটিয়া অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হবে।
ফাইল ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টি বহু বছর ধরে নিজেকে আমেরিকান পতাকায় মুড়িয়ে রেখেছে এবং দলটি নিজেদের বরাবরই ‘স্বাধীনতা’র সমর্থক বলে দাবি করে থাকে। দলটি বিশ্বাস করে ব্যক্তির আগ্নেয়াস্ত্র বহন করার স্বাধীনতা থাকা উচিত; ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য উগরে দেওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত, এমনকি যে কারও টিকা না নেওয়া এবং মুখে মাস্ক না পরার স্বাধীনতা থাকা উচিত।

করপোরেশনগুলোর বিশ্বাস ও আদর্শিক অবস্থান রিপাবলিকান পার্টির মতোই। তাদের কাজ কারবারে যদি পৃথিবী নামক এই গ্রহ ধ্বংসও হয়ে যায় এবং জলবায়ুচক্রকে স্থায়ীভাবে বদলেও দেয়, তাহলেও তারা মনে করে ‘মুক্ত বাজারের’ ওপর আস্থা রাখতেই হবে।

করপোরেশনগুলো মনে করে, ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কারণে যদি সমগ্র দেশের অর্থনীতিতে ধসও নামে, তাহলেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক বিধি-বিধান থেকে ‘মুক্ত’ রাখতে হবে।

২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দা, মহামারি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট ত্বরান্বিত হওয়ার পর স্বাধীনতা সংক্রান্ত ধারণা আধুনিক বিশ্বের জন্য অত্যন্ত স্থূল ও বিবেচনাবহির্ভূত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা এখনো এ ধরনের ধারণাকে সমর্থন করেন, হয় তাদের বিচারবুদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেছে, নয়তো তাঁরা আসলেই নষ্ট হয়ে গেছেন। এটি সমর্থন করলে উনিশ শতকের বিখ্যাত দার্শনিক ইসাইয়াহ বার্লিনের উক্তি ‘নেকড়ের স্বাধীনতার মানে ছাগলের মরণ’ কথাটিকেই সত্য বলে ধরে নিতে হয়। অর্থাৎ একজনের কাছে যেটি স্বাধীনতা, সেটি অন্যজনের কাছে পরাধীনতা।

যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকদের আগ্নেয়াস্ত্র বহন করার অধিকার দেওয়ার পরও সেখানে স্কুল বা দোকান থেকে গুলি খেয়ে মারা না পড়ে অক্ষত অবস্থায় ঘরে ফিরতে পারাটাকে বড় স্বাধীনতা মনে করা যেতে পারে। এই অস্ত্র রাখার স্বাধীনতার ধারণাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সেখানে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে (যাদের একটা বড় অংশই হলো শিশু) নির্বিচারে গুলির ঘটনার শিকার হয়ে মরতে হয়েছে। ভয় না পাওয়ার যে অধিকারকে ফ্রাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, লাখ লাখ মার্কিন নাগরিক সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে।

সারা বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রী ও উদারপন্থীদের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ‘মুক্তি’ শব্দটির অর্থকে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। এটিই তাদের এজেন্ডা যা সত্যিকার অর্থে মানুষকে মুক্তি দেয়, যা ব্যক্তির সুযোগ-সুবিধার পরিসর বাড়ায় এবং এমন বাজার তৈরি করে যা সত্যিকার অর্থেই মুক্ত। হ্যাঁ, আমাদের ভীষণভাবেই একটি মুক্তবাজার দরকার; তবে সেই বাজারকে একচেটিয়া অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হবে।

আসলে একটি সমাজে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। ভিন্ন ভিন্ন স্বাধীনতা অবশ্যই পরস্পরের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ হতে হবে এবং যে কোনো যুক্তিযুক্ত আলোচনা উঠলে সেখানে অবশ্যম্ভাবীভাবে যে উপসংহার টানতে হবে, সেটি হলো: অন্যদের বেঁচে থাকার অধিকারের চেয়ে এআর-১৫ নামক স্বয়ংক্রিয় রাইফেল রাখার অধিকার মহত্তর হতে পারে না।

এই জটিল আধুনিক সমাজে এমন অগণিত পন্থা আছে যার মাধ্যমে একজন দশজনের ক্ষতি করে কোনো রকম দায় না নিয়েই ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার করে যাচ্ছে।

যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য প্রচারের মাধ্যমে আমাদের ‘তথ্য বাস্তুসংস্থান’কে ধারাবাহিকভাবে কলুষিত করে যাচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকাকে নিরপেক্ষ দাবি করে থাকে; কিন্তু তাদের অ্যালগরিদমগুলো সামাজিকভাবে ক্ষতিকর তথ্য-উপাদান প্রচার করে যাচ্ছে। সেই ক্ষতিকর তথ্য তাদের প্ল্যাটফর্মে ঠাঁই পাওয়ায় অগণিত মানুষ ক্ষতির মুখে পড়লেও তার জন্য কোনো রকম ক্ষতিপূরণ তাদের দেওয়া লাগছে না, উল্টো প্রতি বছর তারা শত শত কোটি ডলার কামিয়ে নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ১৯৯০ এর দশকের এমন একটি আইনের মাধ্যমে দায় এড়ানো নিশ্চিত করছে, যে আইনটি মূলত ডিজিটাল অর্থনীতিতে উদ্ভাবনের জন্য বানানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এখন এই আইনটি থাকা উচিত কিনা তা বিবেচনা করছে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি এড়াতে পারে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

অর্থনীতিবিদদের বিবেচনায় স্বাধীনতার স্বাভাবিক পরিমাপ নির্ধারিত হয় একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে যতটুকু করতে পারে তার পরিসরের ওপর ভিত্তি করে। কারও ‘সুযোগের পরিসর’ যত বিস্তৃত হবে, তার স্বাধীনতা তত বিস্তৃত হবে।

না খেয়ে মরতে বসা মানুষটি যা করে থাকে, তা হলো বাঁচার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে কিছু না কিছু করা। সে ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে সে আর স্বাধীন থাকে না। সেই ভাবে বিষয়টিকে দেখলে বলা যায়, কোনো কারও ভেতরকার সম্ভাব্যতাকে বুঝতে পারার ক্ষমতা হলো স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা।

জনকল্যাণ খাতে (যেমন শিক্ষা, অবকাঠামো এবং মৌলিক গবেষণা) বিনিয়োগ সব ধরনের নাগরিকের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করে এবং তা প্রকারান্তরে কার্যকরভাবে সবার স্বাধীনতা উপভোগের সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই ধরনের জনকল্যাণমুখী খাতে বরাদ্দ বাড়াতে পর্যাপ্ত নাগরিক করের প্রয়োজন হয় এবং অনেক নাগরিক তাঁদের কাছে রাষ্ট্রের প্রাপ্য কর না দিয়ে তা এড়ানোর মতলবে থাকেন।
এটি বহুকাল ধরে চলে আসা অতি পুরোনো সমস্যা। সে ক্ষেত্রে আমরা শুধুমাত্র জনকল্যাণ খাত সমৃদ্ধ করতে এই নাগরিকদের জোর জবরদস্তি করে কর দিতে বাধ্য করতে পারি। এটি করা গেলে যাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে কর আদায় করা হয়, ওই লোকসহ সমাজের সবাই এর সুফল ভোগ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে জবরদস্তিই মুক্তির একটি অন্যতম উৎস হয়ে উঠতে পারে।

নব্য উদারবাদী অর্থনীতিবিদেরা এই বিষয়গুলোকে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষা করে আসছেন এবং তার বদলে তাঁরা করপোরেশনগুলোর (যাদের অনেকগুলো সরকারি ব্যয় থেকে নিজেরাই বিপুল অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকে) ওপর তাঁদের ভাষায় যন্ত্রণাদায়ক বিধি ও ট্যাক্স বসিয়ে অর্থনীতিকে ‘মুক্ত’ করার কথা বলে থাকেন। কিন্তু শিক্ষিত শ্রমশক্তি, ঠিকাদারি কাজগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইনের শাসন অথবা পণ্য পরিবহনে অত্যাবশ্যকীয় মহাসড়ক ও বন্দর না থাকলে আমেরিকার ব্যবসা-বাণিজ্য খাত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

সারা বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রী ও উদারপন্থীদের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ‘মুক্তি’ শব্দটির অর্থকে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। এটিই তাদের এজেন্ডা যা সত্যিকার অর্থে মানুষকে মুক্তি দেয়, যা ব্যক্তির সুযোগ-সুবিধার পরিসর বাড়ায় এবং এমন বাজার তৈরি করে যা সত্যিকার অর্থেই মুক্ত। হ্যাঁ, আমাদের ভীষণভাবেই একটি মুক্তবাজার দরকার; তবে সেই বাজারকে একচেটিয়া অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

  • জোসেফ ই স্টিগলিৎজ নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ