এই কলোকিয়ামের মুখ্য বিষয় ছিল, অথেন্টিক সায়েন্টিফিক পাবলিকেশনস অর্থাৎ, বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল সহজ এবং বোধগম্য উপায়ে বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছানোই গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের উদ্দেশ্য। এই ফলাফল পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের অন্য যেকোনো গবেষক তাঁর গবেষণায় কিংবা উৎপাদনে ব্যবহার করতে পারেন। সংগত কারণেই গবেষণার ফলাফল প্রকাশের আগে তা সঠিক, গবেষণাগারে পুনঃপুন পরীক্ষিত এবং তাত্ত্বিক গবেষণা হলে, তা সুস্পষ্ট গাণিতিক বিশ্লেষণ দ্বারা প্রমাণিত কি না, এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েই প্রবন্ধ প্রকাশ করতে হয়।

মুক্তবাজার অর্থনীতির বর্তমান বিশ্বে সবকিছুর সঙ্গে বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা শিল্পও অনেকাংশে বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। তবে পেশাদার সোসাইটি, যেমন আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি থেকে প্রকাশিত জার্নালগুলো বৈজ্ঞানিক কমিউনিটির প্রতি দায়বদ্ধতাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। অন্যরা ব্যবসায়িক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হলেও তাদের মধ্যে যেগুলো ভালো জার্নাল, তারাও বিজ্ঞান গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের সঠিক পন্থা অবলম্বন করে। প্রতিটি জার্নালের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ এডিটরিয়াল বোর্ড থাকে। যেকোনো গবেষণা প্রবন্ধ জার্নালে প্রকাশের আগে তা ওই গবেষণা ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ গবেষক দ্বারা মূল্যায়ন করা হয় এবং প্রকাশের উপযোগী হলেই কেবল প্রকাশ করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে জার্নালের গ্রাহকদের কাছ থেকে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইব্রেরি থেকে প্রাপ্ত গ্রাহক চাঁদার অর্থই প্রকাশকের আয়ের প্রধান উৎস ছিল। যদিও গ্রাহক চাঁদার চড়া হারের কারণে এর বিরুদ্ধে কিছু আন্দোলনও গড়ে ওঠে। আবার কিছু জার্নাল যথাযথ মূল্যায়ন শেষে প্রকাশিত প্রবন্ধের জন্য আর্টিকেল প্রসেসিং চার্জ বা এপিসি গ্রহণ করত। আজকাল ওপেন অ্যাকসেস নীতির কারণে গবেষণা প্রবন্ধ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার একটা প্রয়াস রয়েছে, আর অনেক ক্ষেত্রে এর জন্য জার্নালগুলো প্রবন্ধের লেখকদের কাছ থেকে একটি ওপেন অ্যাকসেস ফি বা বর্ধিত এপিসি গ্রহণ করে। গবেষণা জার্নালের এ বিষয়গুলো সবার কাছে কম-বেশি গ্রহণযোগ্য এবং স্বীকৃত ছিল।

তবে এর বাইরে একটি প্রকাশনা জগৎ রয়েছে, যা এক যুগ আগেও এতটা সরব ছিল না। কিন্তু বর্তমানে জার্নাল প্রকাশনার লেখক অর্থায়নকৃত এই অর্থনৈতিক মডেলের সুযোগে তারা জেগে উঠেছে। তাদের আর জার্নাল বিক্রি নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে না। শুধু তাদের এমন গবেষক প্রয়োজন, যারা তাদের চাকরি বা প্রমোশনের জন্য অর্থের বিনিময়ে তাদের জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ করতে প্রস্তুত, এমনকি আগ্রহী। সংক্ষেপে তাদের বলা হয় প্রিডেটরি প্রকাশনা এবং প্রকাশিত জার্নালগুলোকে বলা হয়ে থাকে প্রিডেটরি জার্নাল। তারা শিকারি, অর্থ উপার্জনের জন্য তরুণ, অনভিজ্ঞ কিংবা লোভী; কিন্তু অভিজ্ঞ গবেষকদের শিকার করাই তাদের প্রধান কাজ, তাই তাদের প্রিডেটরি বা শিকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রায় সারা বিশ্বে আখ্যায়িত করা হয়। তারা ক্রমেই আরও চতুর ও বাহ্যিক অবয়বে আকর্ষণীয় তথা বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠছে।

প্রিডেটরি জার্নালে বিশেষজ্ঞ এডিটরিয়াল বোর্ড থাকে না, কখনো নামমাত্র একটি এডিটরিয়াল বোর্ড থাকে, যাদের গবেষণা অভিজ্ঞতা খুবই নগণ্য এবং অপ্রাসঙ্গিক। এ ধরনের জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ জমা প্রদানের জন্য সাধারণত কোনো সাবমিশন প্ল্যাটফর্ম থাকে না, ই-মেইলের মাধ্যমে প্রবন্ধ লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রবন্ধ লেখকদের বারবার ই-মেইল করে গবেষণা প্রবন্ধ জমা প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হয়। গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের আগে তারা স্বীকৃত ইনডেক্সড জার্নালের মতো পিয়ার রিভিউ পদ্ধতি অনুসরণ করে না, রিভিউ করলেও সেটা হয় অনেকটা লোকদেখানো। তারা অনেক সময়ই ইনডেক্সিং, বা তাদের ঠিকানা নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রবন্ধ লেখক জানতে পারেন যে তাঁদের গবেষণা প্রবন্ধ জার্নালে প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়েছে। তাঁদের আর্টিকেল পাবলিকেশন ফি দ্রুত প্রদান করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। ফি প্রদানের সঙ্গে সঙ্গেই ওয়েবসাইটে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।

প্রিডেটরি প্রবণতা শুধু জার্নাল প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অর্থ উপার্জনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থানে অর্থের বিনিময়ে প্রিডেটরি কনফারেন্স আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে প্রকৃত জ্ঞানচর্চা হয় না, শুধু বেড়ানো, আর সামান্য কিছু উপস্থাপনা থাকে।

সারা পৃথিবীর বিজ্ঞান একাডেমিগুলো এসব প্রিডেটরি প্রকাশনা ও কনফারেন্সের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, বিশেষ করে ইন্টার-একাডেমি পার্টনারশিপ তরুণ গবেষকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০২১ সালে ইন্টার-একাডেমি পার্টনারশিপ কর্মসূচির আওতায় আমরা এনওয়াইএবি থেকে প্রিডেটরি প্রকাশনার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করি। এনওয়াইএবির এ কার্যক্রমে মুগ্ধ হয়ে ইন্টার-একাডেমি পার্টনারশিপ অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ বোনাস হিসেবে প্রদান করে, যা দিয়ে এই কলোকিয়ামের আয়োজন করা হয়।
প্রথম দিনে ভার্চ্যুয়াল সেশনের পর দ্বিতীয় দিন শুরু হয় বুয়েটে তরুণ গবেষকদের গবেষণা পোস্টার উপস্থাপনের মাধ্যমে। এরপর তরুণ এবং অভিজ্ঞ গবেষকদের সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠান। সেখানে পোস্টারে প্রদর্শিত বিভিন্ন গবেষণা কীভাবে অথেনটিক জার্নালে প্রকাশ করতে হবে, এ বিষয় তরুণ গবেষকদের সম্যক ধারণা ও তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়।

১৫ জুলাই ২০২২ বিকেলের সেশনে কোনো ধরনের জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করা উচিত এবং কোনো ধরনের জার্নালে উচিত নয়, সেটি নিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ শামস বিন তারিক এবং প্রকাশনায় নৈতিকতা বিষয়ে বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের শিক্ষক হাসীব মুহাম্মদ ইরফানুল্লাহ। বিকেল পাঁচটায় অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। মোট ২৪ জন তরুণ গবেষককে পুরস্কার প্রদান করা হয়, যার মধ্যে ছিল নয়টি ‘বেস্ট প্রেজেনটেশন অ্যাওয়ার্ড’। অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, নয়টি পুরস্কারের পাঁচটি পেয়েছেন আমাদের তরুণ নারী গবেষকরা। একসময় মনে করা হতো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল বিদ্যা কিংবা গণিত মেয়েদের পড়ার বিষয় নয়। এমন ধারণা যে অমূলক, তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক অনুষ্ঠানে আমাদের নারী গবেষকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং সাফল্য থেকে প্রমাণিত হয়েছে।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির সেক্রেটারি ও ইউজিসি অধ্যাপক হাসিনা খান প্রিডেটরি প্রকাশনার বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক তরুণ গবেষক মানসম্মত গবেষণা করে পিএইচ ডিগ্রি অর্জন করছেন। অথচ দেশে চাকরির ক্ষেত্রে তাদের যোগ্যতা ও গবেষণা কর্মের মান যাচাই না করে বিদেশি ডিগ্রিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা কোনো ভাবেই সমীচীন নয় বলে অধ্যাপক হাসিনা খান উষ্মা প্রকাশ করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বুয়েটের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল জব্বার খান জানান, বুয়েটের যেকোনো নিয়োগ কিংবা পদোন্নতি কিংবা প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে একমাত্র ইনডেক্সড জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ বিবেচনা করা হয়। শিক্ষা এবং গবেষণায় বুয়েটে যেন বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে খুব ভালো একটি অবস্থানে চলে আসতে পারে, তার জন্য বুয়েটে গৃহীত সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো তিনি তুলে ধরেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল তাঁর বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত জার্নালগুলো ইনডেক্সড জার্নালের আওতায় নিয়ে আসার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানান। প্রিডেটরি জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নিয়োগ কিংবা পদোন্নতিতে গৃহীত হয় না এবং ভবিষ্যতেও হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধান অতিথি বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদার তাঁর বক্তব্যে দল-গবেষণার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে আমাদের তরুণ গবেষকদের পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির করার পরামর্শ দেন। তিনি আরও বলেন যে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জগদীশ চন্দ্র বসু, মেঘনাদ সাহা ছিলেন এ মাটির সন্তান। বাংলাদেশের সন্তান বিজ্ঞানী জাহিদ হাসান আমেরিকায় যুগান্তকারী সব গবেষণা কর্মের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমাদের তরুণ প্রজন্ম অনেক মেধাবী, মেধার পরিচর্যা করলে এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে বাংলাদেশে বসে তারাও বিশ্বমানের গবেষণা করতে সক্ষম হবে।

শুধু চাকরি বা প্রমোশনের জন্য মূল্যহীন জার্নাল প্রকাশ কিংবা জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ সবার স্বার্থে বন্ধ করা উচিত বলে কলোকিয়ামে বক্তারা মত প্রকাশ করেন। এই কলোকিয়ামে অধ্যাপক জাহিদ হাসানকে বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাদের তরুণ প্রজন্ম তাঁকে দেখে, তাঁর মতো বিজ্ঞানীর কথা শুনে যেন অথেনটিক গবেষণা করার বিষয়ে অনুপ্রাণিত হয়। শুধু অথেনটিক জার্নালেই গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করা উচিত, প্রিডেটরি জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করা অর্থহীন, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকাশনা অনেক বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে—এই বার্তাটুকু তারা যেন পায় এবং এই মানসিকতা তারা যেন অন্তরে লালন করে।

শুরুর দিনে বিজ্ঞানী জাহিদ হাসানের আশাবাদ দিয়েই এই লেখাটা শেষ করছি। তিনি বলেন, তাঁর ছাত্ররা পৃথিবী বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করছে। কর্মক্ষেত্রে তারা অসামান্য সফলতা অর্জন করছে। ছাত্রদের এমন অর্জনই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার এবং স্বীকৃতি। কোনো একদিন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক শুধু শিক্ষা এবং গবেষণায় নিজেদের সব শ্রম এবং মেধা ব্যয় করবেন, ছাত্রের সাফল্যকে নিজেদের সেরা অর্জন হিসেবে উপলব্ধি করবেন, এমন প্রত্যাশায় রয়েছে পুরো জাতি।

  • মোহাম্মদ আবদুল বাছিত প্রেসিডেন্ট, ন্যাশনাল ইয়ং একাডেমি অব বাংলাদেশ (এনওয়াইএবি) এবং অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, বুয়েট।