বছর তিনেক আগেও শ্রীলঙ্কা হয়ে উঠেছিল এক ব্যর্থ অর্থনীতির প্রতীক। পেট্রলপাম্পে গাড়ির সারি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, হাসপাতালে ওষুধের হাহাকার আর খাদ্যদ্রব্যের আকাশছোঁয়া দাম ইত্যাদির প্রতিক্রিয়া ক্ষুব্ধ জনতার গণবিক্ষোভে তৎকালীন প্রেসিডেন্টের দেশত্যাগের সেই দৃশ্য বিশ্ববাসী ভুলে যায়নি। অথচ ধ্বংসের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই শ্রীলঙ্কাই আজ অবিশ্বাস্য গতিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে সম্ভব হলো এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন?
গত বছরের শেষ দিকে নেপালের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমার পরিচয় হয় শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান, দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রসচিব এবং ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোটের সাবেক রাষ্ট্রদূত রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) অধ্যাপক ড. জয়নাথ কলম্বাগের সঙ্গে। পরে আমার অনুরোধে আমাদের বিভাগে ‘গণ-অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্র পুনরুদ্ধার: শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা’ বিষয়ে একটি অনলাইন বক্তৃতা দেন তিনি। একজন নীতিনির্ধারকের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি যে বিশ্লেষণ তুলে ধরেন, তা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই এক বড় পাঠ।
ড. কলম্বাগ শুরুতেই একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় হঠাৎ করে আসে না। আর্থিক সংকট দৃশ্যমান হওয়ার অনেক আগেই ভুল নীতি, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এর ভিত্তি তৈরি করে।
শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা ঠিক এই কথাই প্রমাণ করে। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০২১ সালের মধ্যে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও, অনেক প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল আসেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ২০১৯ সালের ব্যাপক করছাড়। রাজনৈতিকভাবে এটি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত হলেও এর ফলে রাষ্ট্রের রাজস্ব ধসে পড়ে। কর-জিডিপি অনুপাত নেমে আসে মাত্র ৮ শতাংশে। ফলে সরকারকে টিকে থাকতে ঋণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা ছাপানোর ওপর নির্ভর করতে হয়।
শ্রীলঙ্কার গল্পটি তাই একই সঙ্গে আশা ও সতর্কতার। সঠিক নেতৃত্ব, বাস্তববাদী নীতি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র যেকোনো সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের চেয়ে সেই অগ্রগতিকে ধরে রাখা অনেক বেশি কঠিন।
তৎকালীন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ২০১৯ সালের ইস্টার সানডের সন্ত্রাসী হামলা এবং পরে কোভিড মহামারির কারণে দেশের জিডিপির অন্যতম প্রধান উৎস পর্যটন খাত পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। প্রবাসী আয়ও কমে ঠেকে তলানিতে।
তবে সংকটকে খাদের কিনারায় ঠেলে দেয় একটি মারাত্মক নীতিগত ভুল। ২০২১ সালে সরকার কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই রাসায়নিক সার আমদানি নিষিদ্ধ করে সম্পূর্ণ জৈব কৃষিতে রূপান্তরের ঘোষণা দেয়। ইতিবাচক উদ্দেশ্যে প্রণীত হলেও, এর ফলে দেশটির কৃষি উৎপাদন ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ড. কলম্বাগের ভাষায়, ‘কোনো নীতি যত ভালোই হোক, বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে তা উন্নয়নের পরিবর্তে বিপর্যয় ডেকে আনে।’
২০২২ সালে পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয়। স্বাধীনতার পর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমে আসে ১ বিলিয়ন ডলারের নিচে। বিদ্যুৎ–বিভ্রাট দিনে ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে শুরু করে। এই অর্থনৈতিক সংকটই দ্রুত রূপ নেয় রাজনৈতিক সংকটে। ‘আরাগালয়া’ বা গণ-আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
কিন্তু শ্রীলঙ্কার গল্প সেখানে শেষ হয়নি। ড. কলম্বাগের মতে, পুনরুদ্ধারের প্রথম শর্ত ছিল ‘বাস্তবতা স্বীকার করা’। সরকার সংকট অস্বীকার না করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করে।
একই সঙ্গে নেওয়া হয় কিছু অত্যন্ত কঠিন ও রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় পদক্ষেপ। বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন, করব্যবস্থা সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পুনর্বিন্যাস, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই সিদ্ধান্তগুলোর কারণে সাময়িকভাবে জনগণের কষ্ট বেড়েছে, কর বেড়েছে, ভর্তুকি কমেছে। ড. কলম্বাগ অকপটে স্বীকার করেন, রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে এই সাময়িক ত্যাগ ছিল অনিবার্য। সংকটের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দ্রুত বদলাতে পারে, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার মান ফিরতে সময় লাগে।
কঠিন সংস্কারের ফল কিন্তু এখন দৃশ্যমান। ২০২২ সালে যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ, বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১ শতাংশের নিচে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। পর্যটন খাত আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে, বছরে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
বক্তৃতায় ড. কলম্বাগ বাংলাদেশের প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সংকটের সেই অন্ধকার সময়ে বাংলাদেশ যে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল, তিনি তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
শ্রীলঙ্কার এই পুনরুত্থান বাংলাদেশের জন্যও এক মস্ত বড় শিক্ষা। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য নেওয়া অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত দীর্ঘ মেয়াদে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা শ্রীলঙ্কা দেখিয়েছে। শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি অসম্ভব। সংকটকে অস্বীকার না করে সময়মতো বাস্তবসম্মত ও সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
শ্রীলঙ্কার গল্পটি তাই একই সঙ্গে আশা ও সতর্কতার। সঠিক নেতৃত্ব, বাস্তববাদী নীতি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র যেকোনো সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ, অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের চেয়ে সেই অগ্রগতিকে ধরে রাখা অনেক বেশি কঠিন।
ড. মো. সাহাবুল হক অধ্যাপক, রাজনৈতিক অধ্যয়ন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
