ডিগ্রি নয় দক্ষতাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজে প্রায়ই শোনা যায় ‘স্কিলস গ্যাপ’ বা দক্ষতার ঘাটতি এবং ‘ভবিষ্যতের কর্মশক্তি’ নিয়ে আলোচনা। প্রশ্নটি এখন আর শুধু চাকরি পাওয়া বা না–পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর। কোন ধরনের দক্ষতা বাংলাদেশকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে পারে। দ্রুত বদলে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কর্মবাজারের বাস্তবতায় কেবল প্রচলিত জ্ঞান আর ডিগ্রি কি যথেষ্ট?

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ইতিমধ্যেই আমাদের কর্মজগতে নিয়ে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, বিগ ডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস এবং ব্যাপক স্বয়ংক্রিয়তা। এর ধারাবাহিকতায় দরজায় কড়া নাড়ছে পঞ্চম শিল্পবিপ্লব, যেখানে প্রযুক্তির পাশাপাশি গুরুত্ব পাবে মানবকেন্দ্রিক উদ্ভাবন, টেকসই উন্নয়ন এবং সামাজিক সহনশীলতা। এই রূপান্তর আমাদের সামনে একদিকে সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে তৈরি করছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

এই নবযুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু প্রযুক্তিগত বা কারিগরি দক্ষতা যথেষ্ট নয়। এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে অভিযোজনক্ষম দক্ষতা। অর্থাৎ দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে নতুন কিছু শেখার, প্রয়োজনে পুরোনো ধারণা পরিত্যাগ করার এবং আবার নতুনভাবে শেখার সামর্থ্য। এই দক্ষতা মানুষকে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করে এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে।

অভিযোজনক্ষম দক্ষতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সহযোগিতা, আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, নমনীয়তা এবং আজীবন শেখার মানসিকতা। ভারী দক্ষতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো হয়ে যায়। একসময় যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা খুব মূল্যবান ছিল, নতুন প্রযুক্তি আসার পর সেটি আর ততটা কার্যকর নাও থাকতে পারে। কিন্তু অভিযোজনক্ষম দক্ষতা মানুষকে যেকোনো পরিবেশে প্রাসঙ্গিক ও প্রতিযোগিতামূলক রাখে।

প্রথম তিনটি শিল্পবিপ্লব নির্ভর করেছিল নির্দিষ্ট জ্ঞান ও একই কাজের পুনরাবৃত্তির ওপর। কাজের ধরন ছিল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি, সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তর একসঙ্গে তৈরি করছে জটিল সমস্যা। এসব মোকাবিলায় দরকার বহুমুখী চিন্তা ও উদ্ভাবনী সমাধান। অভিযোজনক্ষম দক্ষতা মানুষকে সমস্যাকে সামগ্রিকভাবে বুঝতে, বিভিন্ন জ্ঞান একত্র করে প্রয়োগ করতে এবং নতুন পথ খুঁজে পেতে শেখায়।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে জোর দেওয়া হয়েছে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান এবং কিছু সফট স্কিল অর্জনের ওপর। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখন আর যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে যে শুধু জানা জ্ঞান আঁকড়ে ধরে রাখা দিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। অভিযোজনক্ষম দক্ষতা মানুষকে নতুন সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়ায় দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে শেখায় এবং পুরোনো হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে মুক্ত করে। এই পরিবর্তনের অগ্রদূত হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের আন্তবিষয়ক শিক্ষা, প্রজেক্টভিত্তিক ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখা, আজীবন শিক্ষার নমনীয় পথ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা, সৃজনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

তবে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বেই এই কাজ শেষ হয় না। সরকারের তৈরি করতে হবে ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ও কৌশল। শিল্প খাতকে কেবল শ্রমশক্তির সরবরাহকারী হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ করতে হবে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে। আপস্কিলিং ও রিস্কিলিং এখন বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার শর্ত। একই সঙ্গে প্রত্যেক ব্যক্তিকেও নিজের দক্ষতার বিকাশের দায়িত্ব নিতে হবে সক্রিয়ভাবে।

পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে মানুষ কাজ করবে বুদ্ধিমান মেশিনের পাশাপাশি। সেখানে অভিযোজনক্ষম দক্ষতাই মানুষকে সাহায্য করবে অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগাতে, অথচ মানবিক গুণাবলি যেমন সহমর্মিতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতা অক্ষুণ্ণ রাখতে।

বাংলাদেশের জন্য এটি কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়। তৈরি পোশাকশিল্পে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিমধ্যেই বাস্তবতা। কৃষিতে তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। সেবা খাতে ডিজিটাল বা অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। অর্থনীতির ভিত্তি বদলে যাচ্ছে চোখের সামনে।

এই বাস্তবতায় অভিযোজনক্ষম দক্ষতাসম্পন্ন কর্মশক্তিই হবে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন, যারা প্রবৃদ্ধি আনবে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে এবং পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষানির্ভর কাঠামোয় আবদ্ধ, যা ভবিষ্যতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের আন্তবিষয়ক শিক্ষা, প্রজেক্টভিত্তিক ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শেখা, আজীবন শিক্ষার নমনীয় পথ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা, সৃজনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও উদীয়মান পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। অভিযোজনক্ষম দক্ষতাই হবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও মানবিক উন্নয়নের সেতুবন্ধ। আমরা কতটা দক্ষভাবে উদ্ভাবনকে কাজে লাগাতে পারব, আমাদের শিল্প কতটা প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং মানুষ কতটা স্থিতিশীল ও অর্থবহ জীবন গড়তে পারবে, তার অনেকটাই নির্ভর করছে এই দক্ষতার ওপর। অভিযোজনক্ষম দক্ষতা ছাড়া বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। আর এই দক্ষতা অর্জন করতে পারলে আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারব।

  • এম শহিদুল হাসান ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও অধ্যাপক (অব.), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

* মতামত লেখকে নিজস্ব