চব্বিশের অভ্যুত্থান ও প্রগতিশীল রাজনীতির আত্মপর্যালোচনা

১৬ জুলাই প্রথম আলোর বিশেষ সংখ্যায় (‘অভ্যুত্থানের অন্দরে’) ‘চব্বিশের কাঠগড়ায় প্রগতিশীল রাজনীতি’ শিরোনামে লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক ফিরোজ আহমেদের একটি লেখা প্রকাশিত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোয় একাধিক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। সেসব লেখার জবাব দিয়েছেন ফিরোজ আহমেদ

ফিরোজ আহমেদছবি: প্রথম আলো

সম্প্রতি আমার লেখা ‘চব্বিশের কাঠগড়ায় প্রগতিশীল রাজনীতি’ নিবন্ধের অনেকগুলো প্রতিক্রিয়া পেলাম। প্রতিক্রিয়াগুলোকে সংক্ষেপে চারটা ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায়।  

ক. অধিকাংশ প্রতিক্রিয়ায়ই চব্বিশের অভ্যুত্থানে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে; যেখানে মূলত বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচির তারিখ ও বিবরণ উঠে এসেছে।

খ. বড় অংশের প্রতিক্রিয়াতেই সমালোচনার মূল বিষয়ের চেয়ে তার পেছনের অভিসন্ধি খোঁজার চেষ্টা বেশি দেখা গেছে।

গ. প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের ভূমিকার অভাবের সঙ্গে প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগী ভূমিকাকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে।

ঘ. ফ্যাসিবাদবিরোধী বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা ছিল কি না, সেই বিষয়ক উপলব্ধির প্রায় অধিকাংশ প্রতিক্রিয়াতেই দেখা যায়নি।

সম্ভবত আমার লেখার কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও এমন কিছু বিভ্রান্তির জন্য দায়ী। ফলে সংক্ষেপে আমার দিক থেকে বিষয়টা আরেকবার পরিষ্কার করার চেষ্টা করি।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ না নেওয়ার পরিণতি

২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে প্রগতিশীলদের দূরে সরে থাকার রাজনৈতিক তাৎপর্য এখনো খুব কমসংখ্যক মানুষই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। অথচ চব্বিশে প্রগতিশীলদের বিপন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে, এমনকি এই সুযোগে সমাজে নারীর অধিকার, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইত্যাদি বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটা ঝটিকা সুযোগ দেশের উগ্র ডান রাজনৈতিক মহল পেয়ে গিয়েছিল। 

সামাজিক প্রভাব আছে, এমন রাজনৈতিক ভুলের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়, এ ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম আন্দোলন, যার নেতৃত্ব, দিকনির্দেশনা বা গড়ে তোলাকোন স্তরেই প্রগতিশীলেরা (একটা সংগঠনের ব্যতিক্রম বাদে) উপস্থিত ছিল না। 

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে দূরে থাকার তাৎপর্যগুলো সংক্ষেপে বলা যেতে পারে। প্রথমত, প্রগতিশীলদের বড় অংশ তৎকালীন কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হননি। কারণ, তাঁদের একটা বড় অংশ একে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী আন্দোলন, কিংবা ‘রাজাকার’দের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলন ইত্যাদি মনে করতেন। দ্বিতীয়ত, আন্দোলন গড়ে তোলার মাধ্যমেই আসলে রাজনৈতিক কর্মীরা নেতা হয়ে ওঠেন, শিক্ষার্থীদের কাতার থেকেও নতুন কর্মী ও নেতৃত্ব বের হয়ে আসেন। বলা যায়, আন্দোলন হলো রাজনৈতিক কর্মীদের সূতিকাগার। কোটা সংস্কার আন্দোলনের এই পরিণতির ফল হলো দেশজুড়ে নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে একদমই নতুন একদল নেতার জন্ম, ভুলত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও তাঁরা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন ও পরে জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। 

  • আন্দোলনকে নেতৃত্ব প্রদান, আন্দোলনের কাঠামোকে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রগতিশীলেরাই শিক্ষার্থী-সমাজের স্বাভাবিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারতেন।

  • জুলাইয়ের শেষ পর্বে আন্দোলনের প্রধান নেতারা আর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে না পারলেও দেশের একেক স্থানে তা একেক রকমের স্থানীয় নেতৃত্বের সংগ্রামে পরিণত হয়।

তৃতীয়ত, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে যে একটামাত্র প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়েছিল, তাদের সক্রিয় ও নেতৃত্বমূলক উপস্থিতি ও ভূমিকার ফল হিসেবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পরিসরে তারা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর সুফল হলো আন্দোলন পরিচালনাকারী কাঠামো থেকেই আদিবাসী কোটা, নারী কোটা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষণ বিষয়ে একটা স্বীকৃতি আসে। 

চতুর্থত, আন্দোলনের প্রতি বিরূপ হলেও কোটা আন্দোলনের ওপর হেলমেট বাহিনীর ভয়াবহ নিপীড়নের সময়ে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোকে তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন ও নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে। কিন্তু এই আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়ন, এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব প্রদান, আন্দোলনের কাঠামোকে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রগতিশীলেরাই শিক্ষার্থী-সমাজের স্বাভাবিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারতেন।

ফ্যাসিবাদবিরোধীদের ঐক্য গড়ে তোলায় ব্যর্থতা

এ সময়েই জাতীয় রাজনীতিতে আরেকটি প্রশ্ন গুরুতর হয়ে ওঠে। হাসিনা যদি ফ্যাসিবাদী হয়ে থাকেনসেই ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা বা চেহারা যা-ই হোক না কেন—গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সফল ঐক্য ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়া সম্ভব কি না। হাসিনার শাসন বিষয়ে আর যতই ভিন্নমত থাকুক, এটা খুবই পরিষ্কার ছিল যে একাধারে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক সংগঠন—সব ক্ষেত্রেই তীব্র্র দমন ও পীড়নের মধ্য দিয়ে গেছে দেশ; পুলিশ-র‍্যাব শুধু নয়, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও নির্বিচার খুন, গুম ও নিপীড়নে ব্যবহার করা হয়েছে। নির্বাচন বলে দেশে কোনো কিছু ছিল না। গোটা রাষ্ট্র কতটা পুলিশি যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, তার তুলনা তেমন মিলবে না।

কিন্তু হাসিনার সর্বাত্মক নিপীড়ক শক্তির বিরুদ্ধে এই সর্বাত্মক ঐক্যের বিরোধিতা কিংবা তাতে বাধা দেওয়ার কিংবা হতে না দেওয়ার নানান পর্ব আমরা প্রগতিশীল রাজনীতিতে দেখেছি। ২০১৮ সালের পরপর যখন এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে নির্বাচনের মাধ্যমে হাসিনার পতন ঘটানো যাবে না, সুন্দরবন রক্ষাসহ কোনো বিষয়েই কোনো আন্দোলন সফল হতে পারবে না, আসলে একটা সর্বাত্মক হতাশাই প্রগতিশীল রাজনীতিতে এসেছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনেই তরুণদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার যে নৌকা, তত দিনে মাঝনদীতে এগিয়ে গেছে, তাতে চড়ার একমাত্র উপায় ছিল জাতীয় স্তরে ঐক্যের দ্রুতগামী তরি। কিন্তু এর বদলে প্রগতিশীলদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি আপদ-বিপদের তত্ত্ব। পেয়েছি আওয়ামী লীগ-বিএনপি সবাইকে বাদ দিয়ে শুধু ‘বাম-বিকল্প’ গড়ে তোলার আহ্বান।

সব প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের দিক থেকেই এমন একটা পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ছিল একটা সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক ঐক্যের ক্ষেত্র তৈরি করা। বিরোধীদের মধ্যে যুদ্ধাপরাধী বা উগ্র মৌলবাদীদের বাদ দিয়ে বাকি সবাইকে যথাসম্ভব ঘনিষ্ঠ করা, অন্তত একসঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করা। এটা সব অর্থেই জনগণের মধ্যে দিশা তৈরি করত, আশাবাদ তৈরি করত। হাসিনা ভাগ করে শাসন করতে চেয়েছিলেন, প্রগতিশীলদের কর্তব্য ছিল ঐক্য গড়ে তুলে প্রতিরোধ করা।

কোটা সংস্কার আন্দোলনেই তরুণদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার যে নৌকা, তত দিনে মাঝনদীতে এগিয়ে গেছে, তাতে চড়ার একমাত্র উপায় ছিল জাতীয় স্তরে ঐক্যের দ্রুতগামী তরি। কিন্তু এর বদলে প্রগতিশীলদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি আপদ-বিপদের তত্ত্ব। পেয়েছি আওয়ামী লীগ-বিএনপি সবাইকে বাদ দিয়ে শুধু ‘বাম-বিকল্প’ গড়ে তোলার আহ্বান। এর ফলে জাতীয় স্তরেও সচেতন ব্যক্তিমাত্রই একটা সংশয়ের মধ্যে পড়েন: প্রগতিশীলেরা কি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে আগ্রহী নন? প্রগতিশীলেরা কি হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে চান? 

এভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলনে তরুণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যে বিচ্ছিন্নতার সূচনা হয়েছিল, সেটাই গভীরতর হয় ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য গড়ায় ব্যর্থতার ফলে। হাসিনার লুণ্ঠন, দুর্নীতি ও নির্বাচনে জালিয়াতির বিরোধিতা করেও প্রগতিশীলদের রাজনৈতিক কর্মসূচি এভাবে দেশকে ভাগ করার কাজেই পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে, ঐক্যের প্রশ্নটাকে বাধাগ্রস্ত কিংবা বিলম্বিত করেছে।

অথচ ফ্যাসিবাদের মতো গুরুতর বিপদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময়ে মাও সে–তুং কিংবা জোসেফ স্তালিনের কমিউনিস্ট তাত্ত্বিকেরাও শ্রেণিসংগ্রামের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামকে। কারণ, ফ্যাসিবাদের সময়ে আর সবকিছুর মতো, এমনকি শ্রেণিসংগ্রামও অসম্ভব হয়ে যায়।

প্রগতিশীলদের ভূমিকা কি নেতৃত্বব্যঞ্জক

প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাদের বড় অংশ এবং সংগঠকদেরও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এই আন্দোলনের আদর্শিক অবস্থান সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন, অন্যদিকে মাঠের কর্মীদের বড় একটা অংশ এই বিষয়ে বারবার জনগণের প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছিলেন। ২০১৮ সালের তুলনায় তাই তুলনামূলক দ্রুতগতিতে তারা আন্দোলনে ভূমিকা রাখলেও আন্দোলনটা গড়ার সূত্রপাত, আন্দোলনের মতাদর্শ নির্মাণ ও কর্মসূচি নির্ধারণে সংগঠনগুলো পিছিয়ে পড়ে।

সর্বশেষ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সূচনা জুন মাসেই ঘটলেও এবং সেখানেও একটিমাত্র প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন শুরু থেকেই ভূমিকা রাখলেও, যত দূর জানি, এই ধারার প্রধান জোট গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য সংবাদ সম্মেলন করে এই আন্দোলনে আনুষ্ঠানিক সমর্থন প্রদান করে ৭ জুলাই।

প্রগতিশীলদের এই বিলম্বও আমাদের একটা বিষয় বুঝিয়ে দেয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলায় প্রগতিশীল ধারার ছাত্রনেতৃত্বের ভূমিকাটি নির্ধারক কিংবা দিকনির্দেশনামূলক ছিল না। ২০১৮ সালের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কারণে এবার তাঁরা আন্দোলন থেকে হাত গুটিয়ে না রাখলেও আন্দোলনটি গড়ে তোলার উদ্যোগও তাঁরা নেননি। জাতীয় স্তরে ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দিশা তৈরি করতে ব্যর্থ প্রগতিশীলেরা আন্দোলনকে কাঠামো দিতে পারেননি, বরং অচিরেই স্বতঃস্ফূর্ততা এই আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে যায়। অজস্র শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর শুধু চাকরিপ্রার্থীরা নন, গোটা দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসাশিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, মধ্যবিত্ত—সবার আন্দোলনে পরিণত হয়।

প্রগতিশীলেরা এই পর্বে বরং আশাতীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষক নেটওয়ার্ক তো বহু আগে থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলন ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল, গণ-অভ্যুত্থানে তাঁরা আন্দোলনের ধাত্রীর ভূমিকাতেই ছিলেন। চব্বিশের অভ্যুত্থানে আরও অনেকগুলো সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষার্থীদের সংগঠন এবং ব্যক্তি আকারে বহু মানুষের ভূমিকা ছিল বীরত্বব্যঞ্জক।

মাঠের সংগ্রামের প্রশ্নেই ভেঙে যাওয়া কিছু সংগঠনের একাংশ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যদিও আরেকাংশ আন্দোলনের সক্রিয় বিরোধিতা করে কিংবা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নেয়। জুলাইয়ের শেষ পর্বে আন্দোলনের প্রধান নেতারা আর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে না পারলেও দেশের একেক স্থানে তা একেক রকমের স্থানীয় নেতৃত্বের সংগ্রামে পরিণত হয়।

আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে, হাসিনার পতন যখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে এবং হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশ কীভাবে চলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তখন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দ্রোহযাত্রাকে তাঁদের নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও চিহ্নিত করেন। বলা যায়, তাঁরা একপ্রকার হুঁশিয়ারিও দেন। কার্যত, এটিই ছিল দ্রোহযাত্রার ভূমিকার একধরনের স্বীকৃতি। দ্রোহযাত্রায় গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি ঢাকার মধ্যবিত্ত, প্রগতিশীল ও উদার জনগোষ্ঠীর সমর্থন ও হাসিনার প্রতি সমর্থনহীনতার একটা সুস্পষ্ট বার্তা ছিল, শ্রমজীবীদের উদ্দীপনাও ছিল দেখার মতো।

কিন্তু তত দিনে দেশের জনগণের একটা বড় অংশের হৃদয়ে নেতৃত্বের স্থানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারাই ঠাঁই করে নিয়েছেন। তাঁদের পরবর্তীকালের ভূমিকা ও সাফল্য-ব্যর্থতা একদমই ভিন্ন আলাপের প্রসঙ্গ। ইতিহাসের এ রকম সন্ধিক্ষণগুলোতেই জাতীয় নেতৃত্ব হিসেবে নতুন ব্যক্তিরা আবির্ভূত হন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের দেশব্যাপী কোনো সংগঠিত নেতৃত্ব ছিল না। কিন্তু তাঁরা আন্দোলনের সূচনাটি ঘটিয়ে একটা বড় সময়ে এর হাল ধরে ছিলেন—মানুষও তাদের দেশজুড়ে একটা নেতৃত্বের স্থানেও বসিয়েছে। অন্যদিকে পুরোটা সময়েই প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের দেখা যাবে আন্দোলনকারীদের সমর্থনে ও রক্ষায় নানান কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকায়। 

প্রগতিশীলদের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির সংকট

অভ্যুত্থানের সাফল্যের পর দেখা গেল, রাষ্ট্রের গুরুতর সংস্কারের প্রশ্নগুলোয় প্রগতিশীলদের কোনো ধারাবাহিক আন্দোলন, কর্মসূচি, প্রস্তাব কিছুই ছিল না। ফলে ছিল না বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতিও। ১৫ বছর ধরেই বাংলাদেশে সংবিধান সংস্কারের দাবিটা জোরদার হচ্ছিল। বিশেষত দুজন রাজনৈতিক নেতা এই বিষয়ে আলোচনার জন্য আলোচিত হয়েছেনজোনায়েদ সাকি ও হাসনাত কাইয়ূম। রাষ্ট্রের সংবিধানসহ কিছু মৌলিক প্রশ্নে সংস্কার নিয়ে দশকের বেশি ধরে প্রচার করার করার কারণে তাঁরা দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। 

রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের—আইন-বিচার-নির্বাহী বিভাগ—মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য আনাটা যে বাংলাদেশে ন্যূনতম গণতান্ত্রিক কর্মসূচি এবং তার ভিত্তিতে যৌথ সংগ্রাম গড়ে তোলাটা যে কর্তব্য, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁরা ধীরে ধীরে মূর্ত করতে বেশ খানিকটা সক্ষম হন। অভ্যুত্থানের পরও আমরা যেটা দেখব, হাসিনা-পরবর্তী রাষ্ট্রটাকে নিয়ে কী করা হবে, তা নিয়ে অধিকাংশ প্রগতিশীল ব্যক্তির যেকোনো প্রস্তুতি, দাবিদাওয়া ও কর্মসূচি ছিল না, এমনকি বোঝাপড়ায়ও ঘাটতি ছিল। সংবিধানের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে তাঁদের বড় অংশ যথাসম্ভব প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীল ভূমিকা পালন করেছেন। কেউ কেউ সামলে উঠে উপস্থিতমতো কিছু প্রস্তাব হাজির করলেও কারোরই এই বিষয়ে ধারাবাহিক কোনো প্রচারণা ছিল না। 

এ ছাড়া আমলাতন্ত্রের সংস্কার, পুলিশ সংস্কার, অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলোয় অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের সামনে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য কর্মসূচি হাজির করতেও তাঁরা মর্মান্তিক ব্যর্থতার পরিচয় দেন। এগুলোও পূর্বপ্রস্তুতির অভাব ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটতির কারণেই সম্ভব হয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের পুরো প্রগতিশীল বলয়েরই সংকট এটা। আমি মনে করি, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে এই তিন প্রসঙ্গইকোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ না নেওয়া, ফ্যাসিবাদবিরোধী বৃহত্তর গণতান্ত্রিক জোট গড়ে না তোলা এবং সংস্কারের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি না থাকা—আদতে পরস্পরের সঙ্গে একসূত্রে বাঁধা।

ফিরোজ আহমেদ লেখক ও রাজনৈতিক সংগঠক

*মতামত লেখকের নিজস্ব