এআই নিয়ে অতি ভয় ও অতি প্রত্যাশা কেন অমূলক

কেন ফিশার

বিশ্বজুড়ে এআই ডেটা সেন্টার হঠাৎ দ্রুত বাড়ছে। অনেক বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলে কর্মী ছাঁটাই করছে। অনেক বাজার বিশ্লেষকের দাবি, ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব সত্ত্বেও বিশ্ব শেয়ারবাজার যে ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে, তার একমাত্র কারণ এআই। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে মুনাফা দ্রুত বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি দূর হবে। একই সঙ্গে এআই লাখ লাখ মানুষকে কর্মহীন করবে এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ গ্রাস করবে।

এসবই অতিরঞ্জিত আতঙ্ককে আরও উসকে দিচ্ছে। কিন্তু এআই অর্থনীতি, বিভিন্ন শিল্প খাত ও বিশ্বকে ঠিক কীভাবে প্রভাবিত করবে? সত্য আর কল্পনার (অথবা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির) মধ্যে পার্থক্য আপনি কীভাবে বুঝবেন?

আরও পড়ুন

প্রথমেই অতিরঞ্জিত মাতামাতি থামাতে হবে, তা যতই আশাব্যঞ্জক বা ভীতিকর হোক না কেন। তথাকথিত ‘বিশেষজ্ঞদের’ কাছেও এআইয়ের ভবিষ্যৎ এখনো অনেকটাই অজানা। এআই নিয়ে জল্পনার ভিত্তিতে বিভিন্ন অর্থনীতি কিংবা গোটা শিল্প খাতের ভবিষ্যৎ অনুমান করার চেষ্টা করা নিছক বোকামি।

তবু অনেকে সেই চেষ্টা করেন। অসংখ্য পূর্বাভাসে দ্রুত ও ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, যা সাধারণত নেতিবাচক। সাম্প্রতিক কর্মী ছাঁটাইয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এআইয়ের কথা উল্লেখ করছে। কেউ কেউ বলছেন, এআই ব্যবহার করে কার্যক্রম আরও দক্ষ করতে মার্কিন ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ব্লক এ বছর নিজেদের অর্ধেক কর্মী ছাঁটাই করেছে, মেটাসহ বিশ্বজুড়ে আরও অসংখ্য প্রতিষ্ঠানও একই পথে হেঁটেছে।

দক্ষতা বাড়ানো ভালো বিষয়। কিন্তু শুধু কম কর্মী দিয়ে একই কাজ আরও বেশি করে কোনো যুগান্তকারী কোম্পানি বিশ্বকে বদলে দেয়নি। উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যার এমন নতুন সমাধান খুঁজে বের করে, যা আগে কেউ ভাবেনি। এআইয়ের শক্তি কর্মীসংখ্যা কমানোর মধ্যে নয়, বরং কর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে। কারখানা, কল সেন্টারসহ আরও নানা ক্ষেত্রে এটি ইতিমধ্যে মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে। এআই শিগগিরই মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে প্রতিস্থাপন করবে না।

একটু থামুন। নৈরাশ্যবাদীদের বড় ভুলটা কী? উদ্ভাবন ধ্বংস করে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন কিছু সৃষ্টি করে না, এমনটা ভাবা। এমন চিন্তাধারা ইতিহাসজুড়ে বারবার দেখা গেছে। ১৯৮১ সালে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছিলেন যে কম্পিউটার ও রোবট বিপুলসংখ্যক শ্রমিককে কর্মহীন করে দেবে। না! কাজের ধরন বদলেছে, শ্রমিকেরা নতুন দক্ষতা শিখেছেন। জীবনমান আরও ভালো হয়েছে।

কর্মী ছাঁটাইয়ে এআইয়ের প্রকৃত ভূমিকা খুবই সামান্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্লকের শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে কমেছে। মহামারির পর ব্লক, মেটা এবং আরও অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কর্মী নিয়োগ করেছিল। এআই এখানে বলির পাঁঠা। আশাবাদীরা বড় পরিবর্তনের গতি অতিরঞ্জিত করে দেখেন। ইন্টারনেট বিশাল পরিবর্তন এনেছিল, তবে ধীরে ধীরে। শুরুতে এল ঝামেলাপূর্ণ ও ধীরগতির ডেস্কটপ ডায়াল-আপ সংযোগ। এরপর এল ব্রডব্যান্ড, ওয়্যারলেস সংযোগ ও সাশ্রয়ী মূল্যের ল্যাপটপ। তারপর এল স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কনফারেন্সিং, মোবাইল পেমেন্টসহ আরও অনেক কিছু—তিন দশকের বেশি সময় ধরে।

আরও পড়ুন

বিশ্বের বহু অঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনা এবং ভূমি অধিগ্রহণজনিত স্থানচ্যুতির আশঙ্কার মতো সম্পদ-সংক্রান্ত নানা উদ্বেগ ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক বিরোধিতা বাড়ছে, আর এসবের সঙ্গে চিপের ঘাটতি যোগ হওয়ায় ডেটা সেন্টার স্থাপনের গতি যতটা আশা বা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক ধীর হয়ে পড়ছে।

এআই কিছু শিল্প খাতকে ব্যাপকভাবে বদলে দেবে। আবার কিছু শিল্পে এর প্রভাব হবে সামান্য। এটি কি মিষ্টান্নের মান বাড়াতে পারবে? অথবা ডাক্ট টেপের? কিংবা একটি বাড়ির কাঠামো দাঁড় করাতে পারবে? হয়তো এটি খাদ্য ও টেপ পরিবহন ও সংরক্ষণের লজিস্টিকস আরও সহজ ও কার্যকর করতে সহায়তা করবে। কিন্তু এর বাইরে?

জ্ঞানভিত্তিক সেবার ক্ষেত্রে গ্রাহকেরা শুধু দক্ষতাই চান না। তাঁরা জবাবদিহিও চান। কোনো এআই অ্যাপ আপনার করের হিসাব গুলিয়ে ফেললে সেটিকে দায়ী করার চেষ্টা করে দেখুন। তথ্যের গোপনীয়তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে সাধারণত একটিকে রেখে অন্যটিকে বাদ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় না। স্মার্টফোনভিত্তিক খাবার সরবরাহের অ্যাপ বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তবু মুদিদোকান ও রেস্তোরাঁর বিক্রি বাড়ছেই। বৃহৎ খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রগুলো খুচরা ব্যবসার ধরন বদলে দিয়েছিল। এরপর অনলাইন খুচরা ব্যবসাও তা বদলে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও জমজমাট শপিং সেন্টারের পাশাপাশি অনেক ছোট দোকানও রমরমাভাবে চলছে।

এআই সম্ভবত অনেক কিছু বদলে দেবে! তবে সময় লাগবে। সময়ের সঙ্গে এটি তরুণ আইনজীবীদের গতানুগতিক কাজ ছেড়ে আরও উৎপাদনশীল কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দেবে। ভবিষ্যতে চালকবিহীন ট্রাক বিশ্বজুড়ে চালকের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করবে। আর একদিন স্বচালিত গাড়ি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও অন্যান্য প্রতিবন্ধী মানুষকে এমন স্বাধীনতা দেবে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না।

এআই আর্থিক সেবা পাওয়া সহজ করবে এবং আরও বেশি মানুষের কাছে এসব সেবা পৌঁছে দেবে। কিন্তু সবাইকে প্রতিস্থাপন করবে? যে বটকে কোনো ভুলের জন্য দায়ী করা যায় না, তার হাতে সারা জীবনের সঞ্চয় তুলে দিতে কতজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ রাজি হবেন?

বয়স্ক জনসংখ্যার জন্য স্বাস্থ্যসেবায় এআই ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। অ্যাপগুলো কারও পড়ে যাওয়া বা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচকে পরিবর্তন ঘটা শনাক্ত করে কাজ ও বয়স্ক স্বজনের পরিচর্যা সামলাতে হিমশিম খাওয়া পরিবারগুলোকে সহায়তা করে।

দক্ষতা বাড়ানো ভালো বিষয়। কিন্তু শুধু কম কর্মী দিয়ে একই কাজ আরও বেশি করে কোনো যুগান্তকারী কোম্পানি বিশ্বকে বদলে দেয়নি। উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যার এমন নতুন সমাধান খুঁজে বের করে, যা আগে কেউ ভাবেনি। এআইয়ের শক্তি কর্মীসংখ্যা কমানোর মধ্যে নয়, বরং কর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর মধ্যে। কারখানা, কল সেন্টারসহ আরও নানা ক্ষেত্রে এটি ইতিমধ্যে মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে। এআই শিগগিরই মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে প্রতিস্থাপন করবে না।

বর্তমান ভয় ও আশা দুটোই মাত্রাতিরিক্ত। বড় পরিবর্তন আসবে, তবে এত দ্রুত নয়। মাথা ঠান্ডা রাখুন।

  • কেন ফিশার ফিশার ইনভেস্টমেন্টসের প্রতিষ্ঠাতা, নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সহপ্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা