আসন্ন বাজেটের কিছু আভাস, কিছু প্রশ্ন

বাংলাদেশের আসন্ন বাজেটের বিষয়বস্তু এবং তার আকার সম্পর্কে এর মধ্যে কিছু আভাস পাওয়া গেছে। বাজেটের সম্ভাব্য রূপরেখার কিছু কিছু চিত্রও অর্থমন্ত্রীর নানান বক্তব্য এবং সেই সঙ্গে বাজেট বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নানান নির্দেশনা থেকে বেরিয়ে এসেছে। সেসব চিত্র ও নির্দেশনা নানান মহলকে আশ্বস্ত করেছে সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই সঙ্গে আসন্ন বাজেটের বিভিন্ন বিষয়ে কিছু প্রশ্ন, কিছু অস্বচ্ছতা রয়ে গেছে। আগামী দিনগুলোতে এ বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট করে তুলতে হবে সরকারকে।

প্রথমেই যে কথাটা বলা দরকার, সেটা হচ্ছে নানান আলাপ-আলোচনা থেকে এটা পরিস্ফুট যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে একটি উন্নয়নদর্শন উপস্থাপন করা হয়েছে। উন্নয়নদর্শনটি হচ্ছে ‘মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন’।

এ বিষয় দুটি কারণে সাধুবাদ পেতে পারে। প্রথমত, যেকোনো বাজেটেরই একটা উন্নয়নদর্শন থাকা দরকার। একটি উন্নয়নদর্শন ছাড়া যেকোনো বাজেট আয়-ব্যয়ের একটি আঙ্কিক দলিল ভিন্ন অনেক কিছু নয়।  দ্বিতীয়ত, এটা অত্যন্ত সুখের কথা যে মানবকল্যাণ ও মানব উন্নয়নকে বাজেটের উন্নয়নদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু—মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্য উন্নয়নই উন্নয়নের শেষ কথা। বাংলাদেশের মতো দেশে এই সত্য আরও প্রাসঙ্গিক।

আরও পড়ুন

আসন্ন বাজেটটি প্রণীত হচ্ছে একটি সংকটময় সময়ে—সে সংকটের একটি মাত্রিকতা দেশজ এবং অন্যটি বৈশ্বিক। দুটি মিলে বাংলাদেশ নানান অর্থনৈতিক আঘাত-প্রতিঘাত সামাল দিতে একটি চাপের মুখে রয়েছে। সে অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই একটি কৃচ্ছ্রমুখী, সাশ্রয়ী বাজেটের কথা অবশ্যই উঠবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেশ যেমন একটি চাপের মুখে আছে, তেমনি দেশের মানুষও তার জীবনযাত্রার নানা সংকটের সামাল দিতে সদাব্যস্ত। অতএব মানুষের কল্যাণের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান বাজেটের রূপরেখায় এ দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে—মানুষের কল্যাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এটা একদিকে যেমন কাঙ্ক্ষিত, অন্যদিকে স্বস্তিকরও বটে। 

আসলে উপর্যুক্ত বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুঃসময়ে বাজেটকে সংকুচিত করতে গিয়ে মানুষের জীবনমানকে যেন ঝুঁকিতে ফেলা না হয়, সেটা নিশ্চিত করা দরকার। সে প্রসঙ্গে সম্ভাব্য বাজেট মিতব্যয়িতার সঙ্গে সঙ্গে কল্যাণমুখিতার কথাও উল্লেখ করেছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিক এই মুহূর্তে খাদ্যের ওপরে, জ্বালানির ওপরে কিংবা সারের ওপরের ভর্তুকি কমানো যাবে না, তা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল যা-ই বলুক না কেন। এ মুহূর্তে খাদ্য কিংবা জ্বালানির ওপরের ভর্তুকি তুলে নিলে জনজীবন পর্যুদস্ত হবে এবং সারের ওপরের ভর্তুকি তুলে নিলে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।

আগামী বাজেটে উচ্চাভিলাষের আভাস পাওয়া যাচ্ছে নানান আঙিনায়, কিন্তু সেখানে সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার বাস্তবতাও উপস্থিত। সংকটের মুখোমুখি সংস্কারের চালচিত্রকে পেছনে রেখে নানান অন্তরায়ের সামাল দেওয়াই হবে বাজেটের কঠিনতম পরীক্ষা।

তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরে ভর্তুকির ভার যে অনেক এবং এর সংস্কার যে দরকার, সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু ভর্তুকি সংস্কারের সময় এটা নয়।

মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মনিয়োজন ও কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিতকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানুষের কল্যাণের জন্য এর প্রতিটি পদক্ষেপই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে এসব ক্ষেত্রে যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো কি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত? যেমন আগামী অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৩ শতাংশের কিছু বেশি। সেখানে এই প্রত্যাশা কতখানি বাস্তবসম্মত যে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, শ্লথ বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক মন্দার কালে প্রবৃদ্ধির হার এক বছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে যাবে?

তেমনিভাবে এটাও যৌক্তিক বলে মনে হয় না যে এক অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশের বিনিয়োগ হার জাতীয় আয়ের ৩১ শতাংশে এবং রাজস্ব আয়ের হার জাতীয় আয়ের ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। এখানে উচ্চাভিলাষ যতখানি কাজ করেছে, বাস্তব চিন্তা ততখানি কাজ করছে বলে মনে হয় না।

আরও পড়ুন

সামাজিক সুরক্ষার ওপরে আগামী বাজেটে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হবে বলে প্রতীয়মান হয়। একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটা অত্যন্ত জরুরি। বাজেটে প্রস্তাবিত সামাজিক সুরক্ষাবলয়ের একটি অন্যতম মাত্রিকতা হচ্ছে জীবনচক্রব্যাপী একটি সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গঠন। দুস্থ, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রাথমিক পর্যায়ে এ সুরক্ষাবলয়ে অন্তর্ভুক্ত করে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে।

তবে এ কর্মসূচির সাফল্যের জন্য সুস্পষ্ট কৌশল, দৃশ্যমান সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং অর্থায়ন চাহিদার সুনির্দিষ্ট প্রাক্কলন প্রয়োজন হবে। জীবনচক্রব্যাপী সামাজিক সুরক্ষাকাঠামোর বাইরেও আসন্ন বাজেটে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুসারে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষাবলয়ের সম্প্রসারণ করা হবে। দেশের ৪৮ লাখ পরিবার এর সুবিধাপ্রাপ্ত হবে এবং এ কার্যক্রমের সরাসরি সুবিধাভোগীর সংখ্যা হবে ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। এর জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে লাগবে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা।

সেই সঙ্গে প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন মানুষের জন্য বিশেষ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে বাজেটের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের রূপরেখায়। ফলে প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবার ব্যাপারটি বাজেটের রূপরেখায় উঠে এসেছে। বর্তমানে আলোচিত হচ্ছে প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন মানুষের জন্য বিশেষায়িত স্কুলগুলোর কার্যক্রম, সব প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো-সুবিধার মতো বিষয়গুলো। এ জিনিসগুলো শুধু প্রতীকী বিষয় নয়, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে এগুলো অপরিহার্য উপাদান।

মানবকল্যাণ সামনে রেখেই বাজেটের রূপরেখা প্রণয়নে আলোচিত হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি। শিক্ষাকে আনন্দমুখর করার জন্য যে কথা উঠেছে, শিশু-কিশোরদের পূর্ণ মানসিক বিকাশের জন্য তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে শিশুদের তথ্যপ্রযুক্তিগত উপকরণে সুবিশাল সময় কাটানো এবং সেই সঙ্গে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টির মোকাবিলা করার জন্য নানান নীতিমালার প্রস্তাব বাজেটে থাকলে ভালো হয়। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এটা জরুরি।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসনসেবা প্রয়োজন। সবার জন্য নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করতে হবে। সে প্রসঙ্গে চিহ্নিত করতে হবে স্বাস্থ্য সুরক্ষার নানান কার্যক্রম। মানবনিরাপত্তার প্রশ্নে খাদ্যনিরাপত্তার বিশাল ভূমিকা আছে। তার জন্য প্রয়োজন বহুকালের অবহেলিত কৃষি খাতে সহায়তা প্রদান।

কিছুদিন আগে প্রবর্তিত কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে আগামী বাজেটের রূপরেখায়। এর জন্য বাজেটে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং এর সুবিধা পাবেন ২২ হাজারের বেশি কৃষক।

সেই সঙ্গে বাজেটে উত্থাপিত হবে পরিবেশ সুরক্ষা এবং তার আওতায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও। তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষার বিকাশ, প্রশিক্ষণ, বিদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকদের কর্মনিয়োজনের বিষয়াবলিতে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে উদ্যোক্তার উদ্ভব, দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উচ্চতর ধারায় নিয়ে যাওয়া মানুষের কুশলকে উন্নীত করবে।

নানান সূত্রে আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে এ বিষয়গুলোও আগামী বাজেটে গুরুত্ব পাবে। তবে যে বিষয়টি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট গুরুত্বের আভাস বাজেটে কিছুটা ধোঁয়াশা, তা হচ্ছে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। নারীর কর্মনিয়োজন সম্প্রসারণ এবং সে কর্মনিয়োজন নিশ্চিত করতে সেবামূলক সহায়তা প্রদান, নারী উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা, নারীদের ঋণ এবং অন্যান্য উপাদান-সুবিধা প্রদান, তাঁদের বহুমাত্রিক প্রশিক্ষণ সম্পর্কে চলমান বাজেট আলোচনা, নির্দেশ এবং প্রস্তাবনা যেন কতকটা নিশ্চুপ।

আগামী বাজেটে উচ্চাভিলাষের আভাস পাওয়া যাচ্ছে নানান আঙিনায়, কিন্তু সেখানে সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার বাস্তবতাও উপস্থিত। সংকটের মুখোমুখি সংস্কারের চালচিত্রকে পেছনে রেখে নানান অন্তরায়ের সামাল দেওয়াই হবে বাজেটের কঠিনতম পরীক্ষা।

  • ড. সেলিম জাহান জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের পরিচালক

    মতামত লেখকের নিজস্ব