ফার্মাসিউটিক্যাল-সংক্রান্ত প্রায় প্রতিটি সেমিনারেই একটি পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করা হয়; দেশে ওষুধের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। তবে যে বিষয়টি বলা হয় না, তা হলো জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, যক্ষ্মার ওষুধসহ আরও কিছু ওষুধ সরকার বিনা মূল্যে সরবরাহ করে, তা না হলে প্রকৃত অর্থে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয়ের হার আরও বেশি হতো।
খুচরা পর্যায়ে ওষুধের জন্য নিজস্ব পকেট থেকে ব্যয়ের হার সম্ভবত প্রায় ১০০ শতাংশ। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—ওষুধের পেছনে ব্যয় কি মানুষের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ তৈরি করছে?
প্রথম দেখায় চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। দেশের খুচরা ওষুধের বাজারের আকার বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা, যা প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। কিন্তু সামষ্টিক পরিসংখ্যান কেবল শিরোনাম তৈরি করে। প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে যেতে হবে আরও সূক্ষ্ম পর্যায়ে। মাথাপিছু হিসাবে দেশে একজন মানুষের বছরে ওষুধের পেছনে গড় ব্যয় ২ হাজার ৮১৭ টাকা। অর্থাৎ মাসে মাত্র ২৩৫ টাকা। যেখানে আমাদের মাসিক মাথাপিছু আয় প্রায় ৩১ হাজার টাকা, সেখানে ওষুধের পেছনে এই ব্যয়কে খুব একটা উদ্বেগজনক মনে না-ও হতে পারে।
কিন্তু গড় হিসাব অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি কিছু আড়াল করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ তরুণ এবং তাঁদের ওষুধের পেছনে ব্যয় প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে তাঁদের ব্যয়ও গড় হিসাবকে নিচে নামিয়ে দেয়। এর অর্থ হলো, যাঁদের নিয়মিত ওষুধ কিনতে হয়, তাঁদের প্রকৃত আর্থিক বোঝা গড় হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।
সম্পদের অভাবই যে মূল সমস্যা, তা বলা কঠিন। একটি সরকার যদি কয়েক ডজন অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কিনতে পারে, তাহলে একটি উড়োজাহাজের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, সেই অর্থ দিয়েই অনেক রোগের ওষুধ বিনা মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা সম্ভব
তবে ওষুধের পেছনে সব ধরনের ব্যয়ই কি বোঝা? কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ওষুধ ইসোমিপ্রাজল। এক মাসের জন্য এর দাম মাত্র ২১০ টাকা। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ লেভোথাইরক্সিনের মাসিক খরচও অবিশ্বাস্যভাবে কম, মাত্র ৬৬ টাকা। এমনকি ব্যয়বহুল অ্যান্টিবায়োটিক লাইনেজোলিডের চিকিৎসায় খরচ হয় ২ হাজার ৩৮০ টাকা, কিন্তু সেই ব্যয়টি হচ্ছে মাত্র একবার। সুতরাং সব ওষুধের খরচকে আর্থিক বোঝা বলা যায় না।
তবে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে এই বোঝা বাস্তব। যেমন একজন ডায়াবেটিস রোগীর উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের সমস্যাও থাকলে শুধু ওষুধের পেছনেই মাসে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। অর্থাৎ গড় আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ।
ক্যানসার শুধু মানুষের জীবনই কেড়ে নেয় না; অনেক সময় তাঁদের সঞ্চয় ও সম্পদও শেষ করে দেয়। ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওসিমার্টিনিবের বিদেশি ব্র্যান্ডের একটি ট্যাবলেটের দাম ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে স্থানীয় বিকল্পের দাম মাত্র ৫০০ টাকা। তারপরও গড় আয়ের একজন মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায় এসব ওষুধ।
তাই ওষুধের জন্য ৬০ শতাংশ নিজস্ব ব্যয়ের পরিসংখ্যানটি বারবার উচ্চারণ করা সমস্যাটিকে শুধু ধোঁয়াশাই করে না, বরং বাস্তবসম্মত সমাধানের দিক থেকেও আমাদের মনোযোগ সরিয়ে দেয়। কার্যকর উদ্যোগ নিতে হলে এমন রোগের শ্রেণিগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যেখানে ওষুধের খরচ মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিভিন্ন মডেল বাস্তবায়নে যে ধরনের জটিল প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন, বাংলাদেশে তা এখনো নেই। তবে আমাদের এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, এমন মানুষের কাছে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
সম্পদের অভাবই যে মূল সমস্যা, তা বলা কঠিন। একটি সরকার যদি কয়েক ডজন অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কিনতে পারে, তাহলে একটি উড়োজাহাজের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, সেই অর্থ দিয়েই অনেক রোগের ওষুধ বিনা মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্পূর্ণ সম্ভব, যেখানে শুধু অর্থের অভাবে কোনো মানুষ ক্যানসার, ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় মারা যাবেন না।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি অর্থের নয়। বিষয়টি সদিচ্ছার।
কায়সার কবির সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রেনাটা পিএলসি