নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। প্রচার এখন তুঙ্গে। এবারও নির্বাচনকালে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সামনে অনেক নীতিগত প্রতিশ্রুতি হাজির করেছে।
কোনো কোনো দল ইতিমধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। কেউ কেউ ঘোষণার প্রক্রিয়ায় আছে। তবে প্রচারযুদ্ধ ইশতেহারের কাঠামোতে আটকে নেই। বরং নানা ধরনের ব্যক্তি-আক্রমণ ও সাংস্কৃতিক বিতর্কে সমাজকে মশগুল করে রেখেছে প্রধান দু-তিনটি নির্বাচনী শক্তি। তারপরও নীতিগত প্রতিশ্রুতি থেকে রাজনৈতিক দল ও ধারাগুলোর দেশভাবনার অনেক হদিস মিলছে। শনাক্ত করা যাচ্ছে তাদের মিল-অমিলের জায়গাও।
বিএনপি অনেক আগে দেশবাসীকে ‘৩১ দফা’ সংস্কার প্রস্তাবের কথা জানিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও কিছুদিন আগে ৩১ দফা ‘পলিসি’ ঘোষণা করেছে। ৪ ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার দিয়েছে দলটি। তাদের সহযোগী এনসিপির ইশতেহারে রয়েছে ‘৩৬ দফা’ লক্ষ্য। বামপন্থী দাবিদারেরাও নীতিগত অবস্থান জানাচ্ছে পুস্তিকা ও লিফলেটের মাধ্যমে। প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, সব দল তাদের নীতিমালায় অর্থনৈতিক বিষয় প্রাধান্য দিয়েছে।
জামায়াত জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি চায়
অর্থনীতি বিষয়ে বিএনপি বলেছে, সম্পদ ও সুযোগের সুষম বণ্টনের চেষ্টা করবে তারা। দুর্নীতি প্রশ্নে আপস করবে না। মূল্যস্ফীতির আলোকে ন্যায্য মজুরি দেওয়ার নীতির কথাও বলেছে তারা। কৃষি বিষয়ে দলটি পর্যায়ক্রমে সব ইউনিয়নে কৃষিপণ্যের সরকারি ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করার কথা বলেছে।
অন্যদিকে কিছুদিন আগে নিজেদের ‘পলিসি সামিটে’ শ্রমনির্ভর অর্থনীতিকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের কথা বলেছে জামায়াত। তারা দেশের কর ও মূসকের বর্তমান হার যথাক্রমে ১৯ শতাংশ ও ১০ শতাংশে কমিয়ে আনার কথা বলেছে। কর ও মূসক কমালে রাষ্ট্রীয় আয় কমবে, কিন্তু তারপরও তারা বলেছে, আগামী তিন বছর সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বাড়াবে না তারা। দলটি শিল্পকারখানায় ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
এনসিপি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা দেশীয় বীজ গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিতরণ সক্ষমতা বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেছে। এনসিপি এ-ও বলেছে, তারা দেশের শিল্পকারখানা পরিবেশবান্ধব করতে ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করবে। কর-জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশে উন্নীত করে বাড়তি অর্থ শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করা এবং ‘ক্যাশলেস অর্থনীতি’ গড়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।
বামপন্থী সিপিবি জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণকে প্রাথমিক অগ্রাধিকার দেবে বলে জানিয়েছে। এ ছাড়া ভোগ্যপণ্যের সংকট তৈরিকে তারা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নেবে। ইসলামী আন্দোলন হতদরিদ্র মানুষদের প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ বিএনপির
এবারের নির্বাচনে অনেক দলের নীতিগত প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষা ও তরুণদের বিষয় বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। বড় দলগুলোর মধ্যে শিক্ষা বিষয়ে বিএনপির চেয়ে জামায়াতের প্রতিশ্রুতি বেশি। বিএনপি বলেছে, শিক্ষায় তারা জাতীয় বাজেটে জিডিপির ৫ শতাংশ খরচ করবে। আর জামায়াত বলেছে, মেধা ও প্রয়োজনের আলোকে তারা ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেবে।
নারীশিক্ষায় গতি বাড়াতে ঢাকার ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনমিকস কলেজকে একত্র করে একটা নারী বিশ্ববিদ্যালয় বানানোর কথাও উল্লেখ করেছে জামায়াত। এ ছাড়া পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলেছে। তাদের আরেকটা প্রতিশ্রুতি হলো প্রতিটি জেলায় ‘জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠন।
এনসিপি শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে বিদ্যমান সব ধরনের শিক্ষার মাধ্যম ও পদ্ধতিগুলোর যৌক্তিক সমন্বয়ের কথা বলেছে। তারা শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন ও পাঁচ বছরে ৭৫ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের কথা বলেছে। ইসলামী আন্দোলন বলেছে, সুযোগ পেলে তারা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করবে।
প্রতিটি দলের প্রতিশ্রুতিতে বিভিন্ন খাতে অনেক রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কথা থাকলেও রাজস্ব আয় বাড়ানো তথা করব্যবস্থা সংস্কার ও বাড়তি দেশজ সম্পদ আহরণের বিষয় তেমন গুরুত্ব পায়নি। তবে ইতিমধ্যে ঘোষিত এসব নীতি-প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নির্বাচনী রাজনীতি নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের জনসমাজে একধরনের গুণগত অগ্রগতি ঘটাচ্ছে। যদিও সেই অগ্রগতি ভন্ডুল হয়ে যাবে, যদি সহিংসতামুক্ত নির্বাচনী পরিবেশ বজায় না থাকে।
সিপিবি বলেছে, তারা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ কমাবে এবং একে বিজ্ঞানভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দেবে। তারা সুযোগ পেলে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করারও অঙ্গীকার করছে।
প্রায় সব দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারে স্বাস্থ্যও একটা গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে এসেছে। বিএনপির ৩১ দফায় সবার জন্য স্বাস্থ্য কার্ড চালুর কথা বলা হয়েছে। তারা জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করার কথা বলেছে। জামায়াত ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল করার কথা বলেছে। এনসিপি
সব নাগরিকের জন্য ডিজিটাল হেলথ কার্ড ও স্বাস্থ্যবিমা–ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে। সিপিবির স্বাস্থ্যনীতিতে শুরুতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার ওপর। এ ছাড়া তারা ওষুধের দাম কমানোর ওপর জোর দিয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন শরিয়াহকে প্রাধান্য দেবে
বিএনপি ক্ষমতা পেলে রাষ্ট্র সংস্কারের অনেকগুলো প্রস্তাব দিয়েছে। তার মধ্যে আছে নির্বাচনকালে দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক সমাজ গঠন। সংসদে উচ্চকক্ষও চায় তারা। জাতীয় সংসদে মনোনয়নের ক্ষেত্রে নীতিগতভাবে নারীদের প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছে বিএনপি। স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে উদ্যোগ নেবে বলেও জানিয়েছে তারা। এবারের নির্বাচনে তারা ১০ জন নারীকে প্রার্থী করেছে, যদিও সেটা তাদের মোট প্রার্থীর ৫ শতাংশের কম।
জামায়াতের নারী প্রার্থীহীনতা নিয়ে জাতীয়ভাবে ব্যাপক বিতর্ক হলেও কিছুদিন আগের ‘পলিসি সামিটে’ তারা নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে কোনো ধরনের বৈষম্য বরদাশত করবে না বলে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে জামায়াত জোটের অংশীদার এনসিপি সুযোগ পেলে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে বলে জানিয়েছে।
সিপিবি বলছে, নির্বাচিত হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তারা বিদ্যমান পারিবারিক আইন ও উত্তরাধিকার আইনের সংস্কার করে নারীর প্রতি আইনগত বৈষম্য কমাবে। জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন এক-তৃতীয়াংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে তারা। ইসলামী আন্দোলন নারীদের ‘শুধু সম–অধিকার নয়, অগ্রাধিকার’ দেবে বলেছে। তবে পাশাপাশি স্পষ্ট বলেছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বত্র শরিয়াহর প্রাধান্য দেবে তারা।
প্রতিরক্ষায় অনেক প্রতিশ্রুতি এনসিপি ও সিপিবির
অনেক দলের নীতিগত বক্তব্যে প্রতিরক্ষা প্রসঙ্গ এসেছে। বিএনপির ৩১ দফায় বলা হয়েছে, তারা প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সুসংগঠিত, যুগোপযোগী করবে। এ ক্ষেত্রে এনসিপি সশস্ত্র বাহিনীর জন্য রেগুলার ফোর্সের দ্বিগুণ আকারে রিজার্ভ ফোর্স তৈরির কথা তুলেছে। পরিবেশ বিষয়েও এনসিপি অনেকগুলো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে আছে দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, পরিচ্ছন্ন যানবাহন ও সবুজ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা। পাঁচ বছরে বিদ্যুতের অন্তত ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন ও সরকারি ক্রয়ে ৪০ শতাংশ ইলেকট্রিক ভেহিকল চালু করা।
সিপিবি বলেছে, তারা সুযোগ পেলে পানি, মাটি ও বায়ুদূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারকে অগ্রাধিকার প্রদানের কথা বলেছে।
পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে এনসিপি ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা এবং শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতে যাবে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি বৈদেশিক সম্পর্কের সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেবে বলে জানিয়েছে।
প্রতিটি দলের প্রতিশ্রুতিতে বিভিন্ন খাতে অনেক রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কথা থাকলেও রাজস্ব আয় বাড়ানো তথা করব্যবস্থা সংস্কার ও বাড়তি দেশজ সম্পদ আহরণের বিষয় তেমন গুরুত্ব পায়নি। তবে ইতিমধ্যে ঘোষিত এসব নীতি-প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নির্বাচনী রাজনীতি নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের জনসমাজে একধরনের গুণগত অগ্রগতি ঘটাচ্ছে। যদিও সেই অগ্রগতি ভন্ডুল হয়ে যাবে, যদি সহিংসতামুক্ত নির্বাচনী পরিবেশ বজায় না থাকে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশের জন্য ভোটাররা তাকিয়ে আছেন সরকার ও ইসির দিকে।
● আলতাফ পারভেজ গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব
[৫ জানুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা নীতিগত প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর বিস্তর প্রতিশ্রুতি—শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]
