গণমাধ্যমে প্রকাশিত বেশির ভাগ লেখা বা প্রতিবেদন থেকে মনে হতে পারে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং অন্যান্য আদালতে অসদাচরণের যে ঘটনা ঘটেছে, তার জন্য ‘এককভাবে’ আইনজীবীরা দায়ী। আইনজীবীর সংখ্যা বেড়ে গেছে, তাঁদের লেখাপড়ার মান পড়ে গেছে, প্রশিক্ষণে ঘাটতি দেখা দিয়েছে—অনেকে এ রকম কথা বলেছেন। তাঁদের এসব অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আইনজীবীরা আদালতের এজলাসে গিয়ে বিচারককে গালিগালাজ বা অশালীন আচরণ করলে সেই দায় তাঁদের নিতেই হবে। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে কি অন্য কোনো কিছুর ভূমিকা নেই?

যেসব আইনজীবী আদালতের এজলাসে অশালীন আচরণের করেন, তাঁরা আসলে কারা? একটু খোঁজখবর নিয়ে দেখলেই জানা যায়, যাঁরা অশালীন আচরণের সঙ্গে জড়িত, তাঁরা বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা কেউ কেউ আইনজীবী সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বা অন্য কোনো পদাধিকারী, কেউ আবার সরাসরি দলেরই নেতা। ক্ষমতাসীন দলের বাইরে এবং ‘সাধারণ’ কোনো আইনজীবী সাধারণত বিচারকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করার সাহস পান না। স্পষ্টতই আদালতে অশালীন আচরণের সঙ্গে ক্ষমতার প্রশ্নটি সরাসরি জড়িত।

ক্ষমতার বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝা যায় তখন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নটি যখন সামনে আসে। বছর তিনেক আগের একটি ঘটনা স্মরণ করা যাক। ২০২০ সালের ৩ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় পিরোজপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়াল ও তাঁর স্ত্রী জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী লায়লা পারভীন। শুনানি শেষে বিচারক মো. আবদুল মান্নান জামিন নামঞ্জুর কারে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

ওই দিন বেলা সাড়ে তিনটায় জেলা ও দায়রা জজ মো. আবদুল মান্নানকে বদলির চিঠি পাঠানো হয়। এরপর তিনি যুগ্ম ও জেলা জজ নাহিদ নাসরিনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। বিকেল পৌনে চারটার দিকে আউয়াল ও লায়লা পারভীনের আইনজীবীরা ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ নাহিদ নাসরিনের কাছে পুনরায় জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিকেল চারটার দিকে বিচারক আসামিদের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেন।

এ ঘটনায় সারা দেশের বিচারকেরা কী বার্তা পেলেন? বিচারকেরা বুঝতে পারলেন, আদালতের সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীনদের পক্ষে না গেলে তাঁরা যেকোনো সময় বদলি হয়ে যেতে পারেন বা শাস্তির মুখে পড়তে পারেন। এ ঘটনায় এটাও প্রতীয়মান হলো, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে নিম্ন আদালতের বিচারকরদের বদলির নিয়ম থাকলেও আইন মন্ত্রণালয়, অর্থাৎ সরকারই আসল ‘হর্তাকর্তা’। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা নিয়ে এত তোলপাড় হওয়ার পর গত সপ্তাহে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি তানভীর ভূঁইঞার বক্তব্যেও এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে সমিতির নেতাদের বৈঠক হয়েছে। তাঁরা বলেছেন, দুই বিচারককে বদলি করা হবে। তাঁদের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে দুই বিচারকের আদালত ছাড়া অন্য সব আদালত বর্জন কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন আর সমস্যা হবে না। (সমকাল, ১৫ জানুয়ারি ২০২৩)

কাগজে-কলমে, বক্তৃতা-বিবৃতিতে বিচার বিভাগ পৃথক বলা হলেও বেশ কয়েক বছর ধরেই বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের কর্তৃত্ব আরোপের চেষ্টা প্রবলভাবে দৃশ্যমান। উচ্চ আদালতের বিষয়ে কিছু ‘রাখঢাক’ থাকলেও নিম্ন আদালতে এটা বেশ ‘খোলামেলা’। নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের কর্তৃত্ব আরোপের চেষ্টার বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো ‘ভিন্নমত’ নেই বললেই চলে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব মেনে চলছে এবং আদালতগুলোর ভূমিকায় প্রায়ই যার প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে। এ রকম অবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের আইনজীবীরা আদালতে বিচারকদের সঙ্গে ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করবেন—এটাই স্বাভাবিক।

বিচার বিভাগের ওপর সরকারের কর্তৃত্ব আরোপের চেষ্টা, রাজনীতিকীকরণ এবং বিচারকসহ আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কথিত দুর্নীতির সুরাহা না হওয়ায় বিচারকদের প্রতি আইনজীবীদের সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ এখন আর আগের মতো নেই।

আইনজীবীরা মাঝেমধ্যে বিচারক এবং আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করে থাকেন। তাঁদের এই অভিযোগ হয়তো পুরোপুরি মিথ্যা নয়। কোনো আদালতের বিচারক বা কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকলে সেখানকার আইনজীবীদের কাছে সেটা অজানা থাকে না। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দুর্নীতির বিষয়গুলো খুব একটা আলোচিত হয় না। এগুলো সাধারণত তখনই সামনে আসে, যখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার মতো বিচারকের সঙ্গে আইনজীবীদের কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ হয়। এসব দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ খুব বেশি ওয়াকিবহাল—এমনটা প্রতীয়মান হয় না। এর ফলে অভিযোগগুলো একরকম ধামাচাপা পড়েই থাকে।

বিচার বিভাগের ওপর সরকারের কর্তৃত্ব আরোপের চেষ্টা, রাজনীতিকীকরণ এবং বিচারকসহ আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কথিত দুর্নীতির সুরাহা না হওয়ায় বিচারকদের প্রতি আইনজীবীদের সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ এখন আর আগের মতো নেই। আদালতে বিচারকের সঙ্গে আইনজীবীদের অসদাচরণের অন্যতম প্রধান কারণও এগুলো। কিন্তু এসব কারণ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার কোনো উদ্যোগ বা তাড়না কোনো পক্ষেরই নেই। এর ফলে নানামুখী তৎপরতায় পরিস্থিতি হয়তো সাময়িকভাবে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘শান্ত’ হবে, আদালতে আইনজীবীদের অসদাচরণের কারণগুলো ধামাচাপা পড়েই থাকবে।

  • মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক