মহানবী (সা.)-এর শুভাগমন ও ওফাত
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির পূর্ণতার পরম উৎকর্ষসাধনের জন্য সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে পাঠান পবিত্র ১২ রবিউল আউয়ালের প্রভাতলগ্নে। তাঁর আগমনে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ পড়ে দরুদ—‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের প্রায় সাত মাস আগে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। জন্মের পর তিনি কয়েক দিন মাতৃদুগ্ধ পান করেন। পরে তৎকালীন আরবের প্রথা অনুযায়ী দুধমা হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর দুগ্ধ পান করেন। প্রথমে তিনি দাদা আবদুল মুত্তালিবের তত্ত্বাবধানে লালিত হন। তাঁর আট বছর বয়সে পিতামহ আবদুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করেন। তখন তিনি চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হন। ১২ বছর বয়সে তিনি আবু তালিবের সঙ্গে ব্যবসায়িক কাফেলায় সিরিয়ায় গমন করেন।
কিশোর ও তরুণ বয়সে তিনি মানবসেবা ও জনকল্যাণে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠায় অংশ নেন। ২৩ বছর বয়সে তিনি হজরত খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। খাদিজা (রা.)-এর আগ্রহে এবং অভিভাবক আবু তালিবের নির্দেশে ২৫ বছর বয়সে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে হজরত খাদিজা (রা.)-এর শুভবিবাহ হয়।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির পূর্ণতার পরম উৎকর্ষসাধনের জন্য সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে পাঠান পবিত্র ১২ রবিউল আউয়ালের প্রভাতলগ্নে। তাঁর আগমনে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ পড়ে দরুদ—‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’।
৩৫ বছর বয়সে মহানবী (সা.) কাবা শরিফ সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের সময় হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসন করেন এবং তা স্বহস্তে প্রতিস্থাপন করেন।
৩৭ বছর বয়স থেকে তিনি হেরা গুহায় অবস্থান করে ধ্যানমগ্ন হতে শুরু করেন। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে মহানবী (সা.)-এর ওপর নবুয়ত প্রকাশিত হয়। প্রথম তিন বছর তিনি ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্তজনদের কাছে ইসলাম প্রচার করেন। একপর্যায়ে চাচা হজরত হামজা (রা.) ও হজরত উমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সাহাবির সংখ্যা ৪০ জনে পূর্ণ হয়। ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে, নবুয়তের চতুর্থ বছরে, তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন।
৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রিয় নবীজি (সা.)-এর সহধর্মিণী হজরত খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। এ বছরটিকে ‘আমুল হুজন’ বা দুঃখের বছর বলা হয়। ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফ গমন করেন। ৬২১ খ্রিষ্টাব্দে মিরাজ বা ঊর্ধ্বগমনের ঘটনা সংঘটিত হয়। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মক্কা থেকে মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেন।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনা মুনাওয়ারায় গিয়ে একটি আদর্শ সমাজ ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। সব ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রনির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্য নিশ্চিত করে তিনি একটি সনদ প্রণয়ন করেন, যা ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত। একে বিশ্বের প্রাচীনতম লিখিত রাজনৈতিক ও সামাজিক সনদগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হিজরতের এক বছরের মাথায় মদিনা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পরের বছর সংঘটিত হয় ওহুদ যুদ্ধ। ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে নবীজি (সা.) প্রায় দেড় হাজার সাহাবিকে নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেন। মক্কার কুরাইশদের বাধার মুখে তাঁদের সঙ্গে ১০ বছরের জন্য একটি শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন, যা বিখ্যাত ‘হোদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত।
বছর না গড়াতেই কুরাইশরা বারবার চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে। ফলে দুই বছর পর, ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে (৮ হিজরি), মহানবী (সা.) ১০ হাজার সাহাবি নিয়ে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন। তিনি কোনো প্রতিশোধ না নিয়ে সবাইকে ক্ষমা করে দেন। এ বছর তিনি ওমরাহ পালন করে মদিনায় ফিরে যান।
৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে, ১০ হিজরিতে, মহানবী (সা.) হজ পালন করেন, যা বিদায় হজ নামে পরিচিত। এ হজে সোয়া লাখ সাহাবির উপস্থিতিতে তিনি যে ভাষণ দেন, তা ‘বিদায় হজের ভাষণ’ হিসেবে বিখ্যাত। এর প্রায় ৯০ দিন পর, ৬৩ বছর বয়সে, তিনি মদিনায় মসজিদে নববি-সংলগ্ন পূর্ব পাশে হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় ওফাত লাভ করেন। সেখানেই তাঁর রওজা মোবারক অবস্থিত।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম