কয়েক মাস আগে ফেসবুকে একটি পডকাস্ট সামনে এল, যেখানে আমন্ত্রিত একজন আলোচককে বলতে শুনলাম, ‘এ দেশের মানুষ পরিবর্তন চায় না, সবাই সমানভাবে দুর্নীতি করার সুযোগ চায়।’ শুনে একটু থমকে গেলাম। মনে হলো কথাটা অস্বস্তিকর শোনালেও সত্য। তবে এটা ‘সত্য’ ততক্ষণই, যতক্ষণ তা দুর্নীতির প্রচলিত সংজ্ঞার আলোকে বিবেচিত হবে। কারণ, সবার দুর্নীতির উদ্দেশ্য এবং চিত্র একরকম নয়। সরকারি নিয়োগ–বাণিজ্য, ভূমি দখল, ব্যাংক খাত দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম।
কিন্তু এই মন্তব্য আমলা কিংবা রাজনৈতিক হর্তাকর্তাদের নিয়ে করা হয়নি, তিনি মন্তব্যটি করেছিলেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষদের নিয়ে। খেটে খাওয়া মানুষ কি স্বেচ্ছায় দুর্নীতির পথ বেছে নেয় নাকি রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা তাদের বাধ্য করে, সেটিই এই লেখার মূল বিষয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২২–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের অর্থনীতির প্রায় ৮৫ শতাংশই ধূসর, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় informal economy এবং মোট জিডিপির প্রায় ৪৩ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। অর্থাৎ এ দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে যে খাতের ওপর, সেই খাত রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি, করব্যবস্থা কিংবা কোনো রকম নজরদারির আওতাভুক্ত নয়। রাস্তার হকার, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র দোকানদার, গৃহকর্মী, কুটির শিল্পে নিয়োজিত ব্যক্তি, শ্রমিক, বা দিনমজুররা এই খাতের অন্তর্ভুক্ত।
এসব পেশার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কিংবা দাপ্তরিক নথিপত্র নেই। ফলে এসব পেশায় জড়িত ব্যক্তিদের নেই কোনো পেশাগত নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা। ফলে এসব অধিকার ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও জবাবদিহি করার সুযোগ নেই তাঁদের।
এসব পেশায় নানা রকম জটিলতাও আছে। এর সঙ্গে যুক্ত আছে রাজনৈতিক অর্থনীতি, ক্ষমতাকাঠামো, পেশিশক্তি, স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা ইত্যাদি। অগত্যা এই সব পূর্বশর্ত মেনে নিয়েই নানান কায়দায় জীবিকা নির্বাহ করতে হয় নিম্ন আয়ের মানুষদের। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ও সহজ পন্থা হচ্ছে চাঁদা বা জামানত দেওয়া। এই চাঁদা লেনদেনের অনানুষ্ঠানিক কাগজপত্র থাকলেও এগুলো কখনো সরকারিভাবে নথিভুক্ত হয় না।
এই বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক লেনদেনের কোনো প্রমাণ রাষ্ট্রের কাছে থাকে না। যেহেতু রাষ্ট্র এই ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট নয়, এর সুবিধাভোগীদের জন্য এই লাভজনক খাতকে টিকিয়ে রাখা অনেকটাই সহজ এবং ঝুঁকিমুক্ত। এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গভীর থেকে আরও গভীরে পৌঁছে যায় এই বিষবৃক্ষের শিকড়।
রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনাকে পুঁজি করেই যখন জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, তখন চাইলেও জবাবদিহি করার কোনো উপায় থাকে না। অনিয়মটাই নিয়ম হয়ে ওঠে, কারণ এর ব্যত্যয় ঘটলে ওলট-পালট হয়ে যাবে বিপুলসংখ্যক জনগণের জীবন। তাই চাইলেও পরিবর্তন দাবি করার সুযোগ নেই এ দেশের মানুষের।
তবে শুধু যে রাজনৈতিক অর্থনীতির দৌরাত্ম্যেই এই অব্যবস্থাপিত ব্যবস্থা টিকে আছে, তা নয়। পারস্পরিক নির্ভরতাও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একজন হকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনছেন একজন রিকশাচালক, আবার একজন হকার পান করছেন রাস্তায় কিংবা টং–দোকানে বিক্রি হওয়া চা। এই নির্ভরতার ব্যাপ্তি ছাপিয়ে গেছে শ্রেণিবৈষম্যকেও।
অফিসের সামনে থেকেই সিগারেট কিনছেন করপোরেট পেশাজীবীরা কিংবা পাড়ার ভ্যান থেকেই সবজি কিনে নিচ্ছেন অট্টালিকায় বসবাসকারী গৃহিণী। এই পারস্পরিক নির্ভরতা ধূসর অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী এবং স্বনির্ভর চক্রে পরিণত করেছে, যাকে ভাঙা দুষ্কর বটে।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়। যারা এই চক্রের ভুক্তভোগী, এই সব পেশায় নিয়োজিত জনগণ, তারাও তো কখনো রাষ্ট্রের কাছে এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ কিংবা দাবিদাওয়া তুলে ধরে না। তাহলে কি তারাও এই শোষণমূলক ব্যবস্থায় শোষিত হতে চায়?
বিষয়টা যদি তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তাহলে বোঝা যায় যে তারা চাইলেও এই বলয় ভেঙে বেরোতে পারে না। কারণ, তাদের কাছে জীবিকা নির্বাহের আর কোনো সহজলভ্য বিকল্প আপাতত নেই। তাই এসব ফাঁকফোকরকে আশ্রয় করেই টিকে থাকতে হয় তাদের। রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনাকে পুঁজি করেই যখন জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, তখন চাইলেও জবাবদিহি করার কোনো উপায় থাকে না। অনিয়মটাই নিয়ম হয়ে ওঠে, কারণ এর ব্যত্যয় ঘটলে ওলট-পালট হয়ে যাবে বিপুলসংখ্যক জনগণের জীবন। তাই চাইলেও পরিবর্তন দাবি করার সুযোগ নেই এ দেশের মানুষের।
তারই প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা শহরের হকার উচ্ছেদ অভিযানেও। উচ্ছেদের কয়েক দিনের মধ্যেই আবারও রাস্তাজুড়ে বসেছে সারি সারি দোকান এবং চলছে বেচাবিক্রি।
বর্তমান সরকার যদিও তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সমাধান হিসেবে হকারদের ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু একে পুনর্বাসনের নামে ফুটপাত এবং রাস্তা দখলের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা প্রদান করা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের এই উদ্বেগ যুক্তিযুক্ত। কিন্তু হকারদের এই প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের কিছু সুফলও আছে। এই উদ্যোগ যদি সফল হয় তাহলে এই বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের একটি তথ্যভান্ডার তৈরি হবে এবং সরকার সেখানে নজরদারি করতে পারবে।
পাশাপাশি এই ক্ষেত্র সিন্ডিকেটের কালো থাবা থেকে মুক্ত হয়ে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পথ সুগম করবে, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার লাঘব করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে এবং সরকারি কোষাগারের আয়ের ক্ষেত্র তৈরি করবে। কিন্তু এই সমাধান স্বল্প মেয়াদে কার্যকর হলেও দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের ব্যয় বৃদ্ধি করবে এবং সম্পদ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ, এটি একটি সীমাহীন প্রক্রিয়া, একে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডি কিংবা সময়ের আওতায় আনা সম্ভব নয়। যত দিন পর্যন্ত রাষ্ট্র কোনো নিরাপদ এবং সুনিয়ন্ত্রিত বিকল্প তৈরি করবে না, জীবিকার তাগিদে মানুষ দখলদার, চাঁদাবাজদের শরণাপন্ন হবে।
এই বহুমাত্রিক সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান করতে হলে আগে জানতে হবে কেন এই কাঠামোবিহীন, অনিরাপদ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র বছরের পর বছর ধরে টিকে আছে। এর পেছনে অন্যতম একটি কারণ হলো কর্মসংস্থানের অভাব।
বিআইজিডি পরিচালিত দুর্দিনের ডায়েরি এবং ডেটা অ্যান্ড এভিডেন্স টু অ্যান্ড এক্সট্রিম পভার্টি নামক গবেষণায় উঠে এসেছে, গ্রামের ক্ষুদ্র চাষি, যাঁর নিজের আবাদি জমি নেই কিংবা নদীর ভাঙনে সব তলিয়ে গেছে অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাড়িঘর হারিয়েছেন, এই সব জনগোষ্ঠী শহরমুখী হন কাজের সন্ধানে। অনেকেই আক্ষেপের স্বরে বলেছেন, তাঁরা ফিরে যেতে চান নিজের গ্রামে কিন্তু কাজের সুযোগ নেই বলে ফিরতে পারছেন না।
এখান থেকে ধারণা পাওয়া যায়, মানুষ স্বেচ্ছায় এই নিরাপত্তাহীন জীবন বেছে নেন না। স্থানীয় পর্যায়ে কাজের সুযোগ পেলে মানুষ এই জামানত আর চাঁদার চক্রে নিজেদের যুক্ত করবেন না। তাই পুনর্বাসনের উদ্যোগ শুরু করতে হবে একদম গোড়া থেকে। একেবারে নিয়ন্ত্রণহীন থাকার চেয়ে সরকার বর্তমানে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের পাশাপাশি কাজ চালিয়ে যেতে হবে স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল করার।
স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে, কারিগরি শিক্ষা জোরদার করা এবং তা প্রয়োগ করার ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকরভাবে সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে গবেষণালব্ধ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। তা না হলে লাখ লাখ কর্মক্ষম জনগণ যখন জীবিকা নির্বাহের পথ খুঁজে পাবে না, তখন তাঁরা নিকটতম বিকল্প হিসেবে এই ধূসর অর্থনীতিতেই যুক্ত হবেন। এবং রাষ্ট্রও বঞ্চিত হবে জনসম্পদের সুফল ভোগ করা থেকে।
রাবিনা সুলতানা রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট (গবেষণা সহযোগী) হিসেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে (বিআইজিডি) কর্মরত। ই–মেইল: [email protected]