রাজধানীর মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পাশে নিয়মিত টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়। মঙ্গলবার বেলা দেড়টায় টিসিবির পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলোর ওপর কলেজের একটি দেয়াল ধসে পড়ল। তিনজন মারা গেলেন।
এঁদের একজন নাসিমা বেগম (৪৪)। কর্মস্থলের খাবারের বিরতিতে বাসার জন্য পণ্য কিনতে টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। লাশ হয়ে ফিরলেন। অপমৃত্যুর অলিখিত তালিকায় যুক্ত হলেন আরও তিনজন। বেশ কিছু মানুষ আহত হলেন।
জার্মান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হান্না আরেন্ড তাঁর ‘ব্যানালিটি অব এভিল’ ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘মনে হচ্ছে, সবচেয়ে বড় অপকর্মটি বস্তুত কেউই করেনি।’
অর্থাৎ সবচেয়ে নির্মম, নিষ্ঠুর অপকর্ম ঘটে যাওয়ার পেছনে কোনো একক ব্যক্তিকে দায়ী করতে করতে আমরা শেষ পর্যন্ত গোটা একটা ব্যবস্থাকেই দায়ী করি। ব্যক্তি তখন মুখ্য নয়; বরং ব্যবস্থাই এমন যে, ওই প্রক্রিয়ায় জড়িত যে কেউ অপকর্মের সঙ্গে লিপ্ত হবে।
আলাদা করে ওই ব্যক্তির শয়তানির অভিজ্ঞতা বা মনমানসিকতা থাকার দরকার নেই। ঢাকার মিরপুরের মতো জায়গায়, দিনদুপুরে দেয়ালধসে তিনজন মারা গেলেন, এটাকে ব্যানালিটি অব ‘মার্ডার’ বলা যাবে কি?
তিনজনের মৃত্যুর জন্য কে দায়ী? কাকে ধরা হবে? কোন ব্যক্তিকে দোষ দেওয়া হবে? জানা নেই।
টিসিবিতে পণ্য কোন মানুষেরা কেনেন আমরা কমবেশি সবাই ধারণা রাখি। এসব মানুষের কোনো নিজস্ব পরিচয় নেই। তাঁদের সবার পরিচয় তাঁদের শ্রেণি-পেশা দিয়েই হয়। কারণ, তাঁরা সবাই–ই ‘প্রিকারিয়েত’।
প্রিকারিয়েত শব্দটি ইংরেজিতে প্রিকারিয়েস এবং প্রলেতারিয়েত শব্দের সংমিশ্রণে তৈরি। যার সহজ অর্থ, অনিশ্চিত শ্রমজীবী। যাঁর শ্রমের ঠিক নেই, নেই অর্থসংস্থানের নিশ্চয়তা।
প্রিকারিয়েতের কোনো পরিচয় হয় না। ঠিক এই কারণেই প্রিকারিয়েতের মৃত্যুতে কারোরই কিছুই যায়–আসে না।
ব্যানালিটি অব মার্ডারে এই প্রিকারিয়েত মানুষেরাই সবচেয়ে বেশি ভোগেন। এসব মানুষের জীবন যতটা দরিদ্র, ততটাই সংকীর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে নির্মম পরিণতিগুলো ভোগ করতে হয় তাঁদেরই।
তাঁদের জীবনটা যেমন অর্থহীন, মৃত্যুটাও তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থহীন। তাঁরা কেন প্রিকারিয়েত, এটা জানার সৌভাগ্যটুকু যেমন তাঁদের হয় না, তাঁরা কীভাবে মারা যান, সেটা জানা-বোঝার সুযোগটাও তাঁদের হয় না।
বাংলাদেশে টিসিবির পণ্য বিক্রয় নতুন নয়। অধিকাংশ প্রিকারিয়েত শ্রেণির মানুষ এই সেবা গ্রহণ করেন।
কিন্তু এ রকম একটি অনিশ্চিত জীবন যাপন করার মধ্যে দিয়ে টিসিবির সেবা নিতে গিয়ে যখন এ রকম অপমৃত্যুর শিকার হতে হয়, তখন আবার প্রমাণ হয় যে এই শহর আসলে শ্রমিক, দিনমজুরসহ কোনো প্রিকারিয়েতের জন্য নয়।
আবার যখন অপমৃত্যুর কথা আসে, সেটা থেকে কেবল এই শ্রেণির মানুষের নিস্তার নেই, এমন নয়; বরং শহরে সাধারণভাবে চলাচলকারী প্রত্যেক মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় এই অনিশ্চিত শ্রমজীবী মানুষেরই। কখনো আগুনে পুড়ে, কখনো দেয়ালধসে, কখনোবা মেট্রোরেলের বিয়ারিং মাথায় পড়ে।
সমাজবিজ্ঞানীরা এ ধরনের মৃত্যুকে সচরাচর স্ট্রাকচারাল মার্ডার বা কাঠামোগত হত্যা বলে অভিহিত করেন। কিন্তু এই কাঠামোগত হত্যা যখন শহরে খুব নিয়মিত ঘটে, তখন এটা ব্যানালিটি অব মার্ডারে পরিণত হয়।
ঢাকা শহরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে পরিমাণ অপমৃত্যু হয়েছে, তাতে এই শহরকে এখন জীবিতদের আবাসস্থল বলা মুশকিল।
জার্মান তাত্ত্বিক বিয়ুং-চুল হাংয়ের ভাষায় বলতে হয়, এটা একটা ‘আনডেড সিটি’, একটু ভিন্নভাবে বললে ‘অ-জীবিত শহর’।
আমার পরিচিত কয়জন ইংরেজি জম্বি শব্দটার জুতসই বাংলা করেছিলেন: ‘জিন্দা লাশ’। আমার কাছে এই ঢাকা শহর এখন একটা জিন্দা-লাশের শহর। জিন্দা এই অর্থে যে ‘এখন পর্যন্ত’ আপনি বেঁচে আছেন। আর বাকি অংশ হতে যেকোনো সময়ের ব্যাপার।
এত এত অপমৃত্যু দেখে একটা সময় মনে হতো, নগর বা শহরের বিষয়টাই হয়তো আমাদের জনপদের মানুষের জন্য নয়।
মানে, এই আরোপিত শহর-নগরের বিষয়টা আমাদের দ্বারা হয় না, হবেও না। কিন্তু যখন পৃথিবীর আধুনিক নগরের ইতিহাস দেখি, তখন দেখি যে আমাদের চেয়েও একসময়ে কয়েক গুণ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী আমাদের চেয়েও চমৎকারভাবে নগর গড়ে তুলেছে।
সেই সব নগরে খুন, ছিনতাই, চুরিসহ নানান অপরাধ হয়; কিন্তু খোদ নগরের নাগরিক কাঠামো প্রসূত যে অবকাঠামো, তার জন্য কত মানুষের জীবন যায়?
সমাজবিজ্ঞানী ও নগরবিজ্ঞানীদের কাছে বিগত পাঁচ বছরে ঢাকা শহরে নানান অবকাঠামোর কারণে সংঘটিত অপমৃত্যুর তালিকা আছে কি?
হয়তো যাঁরা এসব অপমৃত্যুর শিকার হয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই প্রিকারিয়েত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রিকারিয়েতের নাম হয় না। আর যার নাম হয় না, তার কোনো তালিকাও হয় না।
শহরের দালানকোঠা থেকে শুরু করে যত ধরনের অবকাঠামো রয়েছে, তা পরীক্ষা করলে হয়তো দেখা যাবে, কী পরিমাণ মৃত্যুর ফাঁদে আমাদের বসবাস।
অথচ এই অপমৃত্যু রোধে এখন পর্যন্ত কোনো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। হয়তো অধিকাংশ ভুক্তভোগীর শ্রেণিগত পরিচয়ের কারণেই তা হয়নি। যাঁর রুটিরুজি অনিশ্চিত, তাঁর মৃত্যুও দ্বিগুণ অনিশ্চিত।
প্রত্যেক মানুষের বেঁচে থাকা তাঁর মৌলিক অধিকার। প্রতিটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব তার নাগরিকদের বেঁচে থাকার অধিকারকে নিশ্চিত করা।
একটি বিরাট অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি যে শহরের চালিকা শক্তি, সেখানে নাগরিকের জানমাল রক্ষার প্রতি রাষ্ট্রকে বেশি মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
যেসব মানুষের জীবন অর্থনৈতিকভাবে ইতিমধ্যে বিপন্ন, তাঁদের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে; কিন্তু সেই দায়িত্ব কেবলই টিসিবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শহরকে বসবাস উপযোগী করে তোলা।
অবকাঠামোগত কারণে কোনো নাগরিকের যেন অপমৃত্যু না হয়, সেদিকে কঠোর নজর দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
মানুষের জীবনের মূল্য হতে হবে সরকারের মূল অগ্রাধিকার। অপমৃত্যু রোধ করা হতে হবে সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য। অপমৃত্যু রোধ না করে দরিদ্র মানুষদের জন্য যে সেবাই দেওয়া হোক না কেন, তাতে নিরাপদ জীবন নিশ্চিত হয় না।
অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং এই নিশ্চয়তা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং শহরের প্রতিটি অবকাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে তার প্রাতিষ্ঠানিক কাজ ঠিকঠাকভাবে করতে হবে।
আজকে টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে দুটো ডাল–ভাত খাওয়ার জন্য পণ্য কিনতে গিয়ে লাশ হয়েছে, কালকে কোথাও আগুনে পুড়ে মরবে, পরশু হয়তো কোনো কিছু ভেঙে মাথায় পড়ে মরবে।
অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং এই নিশ্চয়তা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং শহরের প্রতিটি অবকাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে তার প্রাতিষ্ঠানিক কাজ ঠিকঠাকভাবে করতে হবে।
মৃত্যু মানুষের হাতে নেই, কিন্তু কোনো মানুষই অপমৃত্যুর যোগ্য নয়।
মিনহাজুল ইসলাম লেখক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব