মেয়ের কথামতো এনে দিতে শুরু করলাম কিশোর আলো, ও পড়তে থাকল। কৌতূহলী হয়ে আমিও পড়ে দেখলাম কয়েকটা সংখ্যা। এই পরিণত বয়সেও মুগ্ধ হলাম। পত্রিকার অঙ্গসজ্জা, মানসম্মত সব লেখা, সেগুলোর বিষয়বস্তু, উপস্থাপনা—সবই একেবারে প্রথম শ্রেণির।

আমাদের দেশে ছোটদের জন্য যে এত চমৎকার কোনো পত্রিকা হতে পারে, তা ভাবাই যায় না। মেয়ের মতো আমিও ভক্ত হয়ে গেলাম কিআর। অদৃশ্য এক বন্ধনে আটকা পড়ে গেলাম পত্রিকাটির সঙ্গে।

বন্ধনটা আরও দৃঢ় হলো বছর দুয়েক পর, কিআ থেকে যখন লেখা চাওয়া হলো আমার কাছে। আমার লেখকজীবনের শুরুও ছিল কিশোর উপযোগী লেখা দিয়েই, অয়ন-জিমি নামে দুটো চরিত্র নিয়ে গল্প ও উপন্যাস লিখে। তবে সে পাট অনেক আগেই চুকিয়ে ফেলেছিলাম, ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম অনুবাদসহ বড়দের বিভিন্ন লেখায়।

বই পড়াকে উৎসাহিত করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠেছে কিশোর আলো বুক ক্লাব। ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি ক্লাবের মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা শিখছে স্থিরচিত্র ও চলচ্চিত্রের কাজ। এসবের ইতিবাচক ফলাফলের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। এ দেশে তো বটেই, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশেও এত বড় পরিসরে ছোটদের কোনো পত্রিকা কাজ করে কি না, আমার জানা নেই। আমার পৃথিবী অনেক বড়—কিআর এ স্লোগান তাই একেবারে মানানসই।

কিআর প্রস্তাবে একটু দ্বিধায় ছিলাম, এত দিন পর আবারও ছোটদের লেখা লিখতে পারব কি না; কিন্তু আমার মেয়ে মহা উত্তেজিত, প্রিয় পত্রিকায় তার বাবার লেখা ছাপা হবে, এ তো অবিশ্বাস্য। বলতে গেলে ওর উৎসাহেই আবার কলম তুলে নিলাম, বহু বছর পর আবার লিখতে শুরু করলাম অয়ন-জিমিকে নিয়ে।

সেই যে শুরু করলাম, আজও থামতে পারিনি। কিআর অগণিত পাঠকের ভালোবাসা ও অনুরাগে নবজন্ম হলো অয়ন-জিমির। পত্রিকার পাতায় তো বটেই, বই আকারেও সিরিজটির নতুন নতুন গল্প-উপন্যাস নিয়মিত বেরোচ্ছে এখন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কেবলই কিআর।

তবে পত্রিকাটির কৃতিত্বের কথা যদি বলতেই হয়, তা হলে অয়ন-জিমির নবজন্ম বড় নগণ্য একটি ব্যাপার। কিআর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক কিশোর-কিশোরীর মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলায়; তাদের মনন গঠনে, তাদের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা জাগিয়ে তোলায়, তাদের মনের দিগন্ত প্রসারিত করায়। পত্রিকাটির পাতায় ছাপা হচ্ছে নানা স্বাদের গল্প-উপন্যাস, ছড়া-কবিতা, কার্টুন-কমিকস আর প্রবন্ধ-নিবন্ধ। এতে যেমন শিল্প-সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত হচ্ছে ছেলেমেয়েরা, সেই সঙ্গে তাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ছে।

একই সঙ্গে পাঠকের লেখা ছাপার মাধ্যমে উৎসাহিত করা হচ্ছে সৃজনশীলতাকে। কিআর কর্মকাল এখানেই থেমে থাকছে না, ছড়িয়ে পড়ছে ছাপা অক্ষরের বাইরের দুনিয়াতেও। নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে কিআড্ডা, যেখানে পাঠক সরাসরি মতবিনিময় করতে পারছে পত্রিকার মানুষের সঙ্গে, নিজেদের মধ্যে। পিকনিক বা ‘কিআনন্দ’র মতো অনুষ্ঠান করা হচ্ছে, রয়েছে নানা ধরনের কর্মশালা, প্রতিযোগিতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড।

বই পড়াকে উৎসাহিত করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠেছে কিশোর আলো বুক ক্লাব। ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি ক্লাবের মাধ্যমে ছেলেমেয়েরা শিখছে স্থিরচিত্র ও চলচ্চিত্রের কাজ। এসবের ইতিবাচক ফলাফলের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। এ দেশে তো বটেই, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশেও এত বড় পরিসরে ছোটদের কোনো পত্রিকা কাজ করে কি না, আমার জানা নেই। আমার পৃথিবী অনেক বড়—কিআর এ স্লোগান তাই একেবারে মানানসই।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের দেশে শিশু-কিশোরেরা চিরকালই অবহেলিত। রয়েছে তাদের জন্য সাহিত্যের অভাব, পত্রিকার অভাব, তাদের সুন্দরভাবে বড় করে তোলার প্রয়োজনীয় উপকরণ বা উদ্যোগের অভাব। এর মধ্যে আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হওয়ার কারণে কিশোর আলো অবশ্যই বিশেষভাবে ধন্যবাদ পাবে।

এর আগেও ছোটদের পত্রিকা বের হয়েছে এ দেশে। টাপুরটুপুর, কচি ও কাঁচা, নবান্ন, সবুজ পাতা, কিশোর পত্রিকা, কিশোর তারকালোক-এর মতো চমৎকার সব পত্রিকা একসময় বের হতো নিয়মিত। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি। কিশোর আলো যে এমন প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে ৯ বছর পূর্ণ করল, এটি অবশ্যই অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার।

কামনা করি, কিআর যাত্রা যেন আরও দীর্ঘায়িত হয়, যেন কোনো দিনও থেমে না যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যেন যোগ দিতে পারে কিআর জগতে, যেন বড় হতে পারে বিশাল মনের মানুষ হয়ে। কিআর স্লোগানের সঙ্গে মিল রেখে তাদের পৃথিবীটাও যেন হয়ে ওঠে অনেক...অনেক বড়।

কিশোর আলোর নবম জন্মবার্ষিকীতে রইল একরাশ শুভকামনা। শুভ জন্মদিন, কিআ!

  • ইসমাইল আরমান লেখক ও অনুবাদক