কুড়িগ্রামের চিলমারীর এনায়েত সরকারের গ্রাম। ২৬ এপ্রিল সারা দিনে–রাতে ঘণ্টাখানেকের জন্য বিদ্যুৎ এসেছিল। তাই রমনা স্টেশন থেকে মোমবাতি কিনে আনলাম। এক ডজন মোমবাতির দাম ৬০ টাকা। মোমবাতির সাইজ আগে যেগুলোর দাম ছিল ২ টাকা, সেগুলোই এখন ৫ টাকা। এটাই সর্বোচ্চ সাইজ।
চিলমারীর অনেক বাড়ির মতো আমাদের বাড়িতেও সোলার সিস্টেম আছে। কিন্তু ব্যাটারি কাজ করে না।
২০১৮ সালে ৫০ হাজার টাকা খরচ করে ৭টা বাতি ও তিনটা ফ্যান চালানোর মতো সক্ষম সোলার প্যানেল লাগানো হয়েছিল। সঙ্গে আছে অন্যান্য খরচ ১৫ হাজার টাকা। ২০২২ সালেই অকেজো হয়ে যায়। তিন বছরেই শেষ। আমাদের বিদ্যুৎ বিল আসে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। সেখানে সোলারে খরচ গেল মাসে গড়ে ২ হাজার টাকা। অর্থাৎ দ্বিগুণ খরচের সোলার লাভজনক হওয়ার আগেই অকেজো হয়ে গেল।
তারপর চিলমারী থানা সদরে খোঁজ নিলাম। যারা সোলার লাগিয়েছিল, তারা অফিস গুটিয়ে নিয়ে গেছে বছর তিনেক হয়। আর ছোটবেলায় টেলিভিশন চালানোর ব্যাটারি বানানো হতো যে দোকানগুলোয়, যেগুলোয় ব্যাটারি চার্জ দিতাম, সেগুলো এখন নেই। ব্যাটারি ঠিক করার ব্যবস্থাও নেই। মানে ব্যাটারি আর স্থানীয়ভাবে তৈরি হয় না।
জাতীয় সংসদে এমপিরা নিজেদের জন্য অফিস ও গাড়ির আবদার করেন। কিন্তু তাঁদের বক্তৃতায় কৃষক থাকে না। তাঁদের মন হাওর আর ব্রহ্মপুত্রের চরের জন্য কতটা কাঁদে?
২৬ এপ্রিল চিলমারী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের পাঁচটি রানীগঞ্জ, রমনা, অষ্টমীরচর, চিলমারী ও নয়ারহাট ইউনিয়নে সারা দিন টানা বিদ্যুৎ ছিল না। অথচ একই দিনে কুড়িগ্রাম শহরে একমুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ যায়নি। ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ ক্লাবে ঢুকে পড়েছে। তাতে গ্রামের লাভ কী?
ছেলেমেয়েরা সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য অনেকে শহরে চলে গেছে। গ্রামগুলো এখন বয়স্কদের বাস। আর যারা উপায়হীন, তাদের।
দুই.
চিলমারীর নয়ারহাট ইউনিয়নের একজন কৃষক মুহিত (৩০)। বৃষ্টিতে ভিজে তিনি দেখা করতে এসেছেন। তিনি ৫০ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন সেদিন। রংপুর সরকারি কলেজ থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন। কয়েক বছর চাকরি করে চরে ফিরেছেন। পরিচয় হয়েছিল কৃষক মহাসমাবেশের সময়। একটি ভিডিওতে দেখালেন, মাত্র ৩৩ শতক জমিতে তিনি ৮৭ মণ পেঁয়াজ পেয়েছেন। সব মিলিয়ে এ বছর তিনি পেয়েছেন ১ হাজার মণ পেঁয়াজ। একই দিনে জোড়গাছ হাটে জোড়া পেঁয়াজ ২৫০ টাকায় আর গোটা পেঁয়াজ ৮০০ টাকায় বিক্রি করলেন।
‘এদিকে আলুর কেজি কৃষক পর্যায়ে কাল আমার বাবা বিক্রি করছে ৭ টাকা। মানে ২৮০ টাকা মণ। কুড়িগ্রামের রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গার কথা বলছি।’—ফেসবুকে একই দিনে এই মেসেজ পাঠিয়েছেন নাহিদ খান নামের একজন তরুণ।
নাহিদ খান জানান, ৬৫ শতাংশ জমিতে আলু পেয়েছেন ১৯০ মণ। ইতিমধ্যে বিক্রি করা হয়েছে ১৮০ মণ আর পোকায় কাটা, দাউদ ধরা আরও ১০ মণ বাড়িতে রাখা আছে।
ধানের দামও ৮০০ টাকা মণ। অথচ হাওরে দিনমজুরি ৯০০ টাকা। অথচ এক কেজি ভালো মানের পেঁপের বীজের দাম ১২ লাখ টাকা, ১০ গ্রাম কপির বীজের দাম ১ হাজার ২০০ টাকা। কৃষক কোম্পানির নির্ধারিত দামে কিনবে আর বেচবে অনির্ধারিত দামে। নিধুয়া পাথারে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বাড়ছে, আরেক দিকে ফসলের দামে বজ্রাঘাত।
তিন.
৩৩ শতকের বিঘা জমিতে ধানের আবাদে বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রম, সেচ বাবদ স্বাভাবিক খরচ প্রায় ১৭ হাজার টাকা। স্বাভাবিক ধানের ফলন হলে বিঘাপ্রতি ২০ মণ হয়। মণপ্রতি খরচ ৮৫০ টাকা। ধান ঘরে তুলতে সময় লাগে চার মাস। জমির ভাড়ার বা লিজের হিসাব বাদ। সরকার ধানের দাম ধরেছে ৮০০ টাকা। এখন হিসাব করুন কৃষকের লাভ কত হলো? এরপর খরা ও বন্যায় ধান নষ্ট হলো। কৃষকের তাহলে অবশেষ আর কতটুকু থাকে।
জাতীয় সংসদে এমপিরা নিজেদের জন্য অফিস ও গাড়ির আবদার করেন। কিন্তু তাঁদের বক্তৃতায় কৃষক থাকে না। তাঁদের মন হাওর আর ব্রহ্মপুত্রের চরের জন্য কতটা কাঁদে?
নাহিদ হাসান লেখক ও সংগঠক
