ইরানে ট্রাম্পের হামলা চীনের জন্য অনেক সুযোগ খুলে দিয়েছে

আনুষ্ঠানিকভাবে চীন ইরানে হামলার নিন্দা করে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতার নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে, তার কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে চীন। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা যদি আরেকটি বিস্তৃত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তবে এশিয়ায় মনোযোগ দেওয়ার সক্ষমতা তাঁদের কমে আসবে। সেটিই বেইজিংয়ের জন্য বড় সুযোগ।

আনুষ্ঠানিকভাবে চীন ইরানে হামলার নিন্দা করে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পরও চীন একই ধরনের অবস্থান নিয়েছিল। চীন প্রায়ই নিজেকে আন্তর্জাতিক আইন ও স্থিতিশীলতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে থাকা দেশগুলোকে বাস্তবে খুব বেশি সহায়তা দেয় না।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক অভিযানে চীনের জন্য আরও বড় কৌশলগত ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সংঘাতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে, তবে তাইওয়ান প্রশ্নসহ এশিয়ার ইস্যুগুলো স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকারের তালিকায় নিচে নেমে যাবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষাশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহে নিজেদের প্রভাবও চীন নতুন করে কাজে লাগাতে পারবে।

তবে এ সংঘাত চীনের জন্য ঝুঁকিহীন নয়। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। ধারণা করা হয়, ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই চীন কিনে থাকে। এটি চীনের সমুদ্রপথে আমদানি করা মোট তেলের প্রায় ১৩ শতাংশ। তবে প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ কঠিন। কারণ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে অনেক সময় ইরানি তেল ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার নামে বাজারজাত করা হয়।

আরও পড়ুন

ইরান থেকে সস্তা তেল হারানো চীনের জন্য বড় ধাক্কা হবে, যদিও তা সামাল দেওয়ার মতো। কিন্তু এর আগেই যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ভেনেজুয়েলার তেল খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা চীনের আরেকটি সস্তা জ্বালানি উৎস ছিল।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক এরিকা ডাউন্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের মোট তেল আমদানির এক–পঞ্চমাংশের বেশি এসেছে ভেনেজুয়েলা, ইরান ও রাশিয়ার মতো নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলো থেকে। এখন এ সরবরাহব্যবস্থার অন্তত দুটি উৎস অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

রাশিয়ার সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের প্রধান কিরিল দিমিত্রিয়েভ সতর্ক করেছেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে যেতে পারে। ইতিমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮২ ডলারে পৌঁছেছে, যা ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ন্যাটিক্সিস বিনিয়োগ ব্যাংকের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ আলিসিয়া গার্সিয়া হেরেরো মনে করেন, বর্তমান সময়টা চীনের জন্য অনুকূল নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণের জন্য দ্রুতগতিতে ডেটা সেন্টার গড়ে তোলায় দেশটির জ্বালানি চাহিদা বেড়েছে। আগামী পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ফলে বাজারদরের নিচে তেল পাওয়ার সুযোগ ক্রমেই কমছে।

সাংহাইভিত্তিক হুয়ালু আমেরিকান স্টাডিজ সেন্টার জানিয়েছে, ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চীন-ইরান কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যদি তেহরানে পশ্চিমাপন্থী নেতৃত্ব আসে। তবে বাস্তবে ওই প্রতিশ্রুত অর্থের খুব সামান্য অংশই এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে। সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক ধাক্কার কথা মাথায় রেখে চীন গত বছর তেলের মজুত বাড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকসে যোগ দিয়েছে। চীনই ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সমঝোতা করিয়েছিল। এখন সৌদি আরবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রিস্টাড এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে এবং এর ৮০ শতাংশের বেশি মজুত হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে ইরানি তেল হারানো বা হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটলেও অন্তত কয়েক মাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, তেলের দামের ধাক্কা ট্রাম্পের জন্যই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি চাপের মুখে রয়েছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক অভিযান চীনের জন্য আরেকটি কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে। ইরানে নতুন করে আক্রমণ চালাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—উভয়ের অস্ত্রভান্ডার দ্রুত ফুরাবে। গত বছর পেন্টাগন অস্ত্রের ঘাটতির আশঙ্কায় ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানো সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা পূরণে প্রয়োজনীয় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার মাত্র ২৫ শতাংশ এখন হাতে রয়েছে।

এরপরও মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালিত অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, এফ ৩৫ যুদ্ধবিমানসহ আধুনিক অস্ত্র মোতায়েন করেছে। এসব অস্ত্র ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সেন্সর ও রাডারপ্রযুক্তিতে গ্যালিয়াম নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ব্যবহৃত হয়, যার সরবরাহ চেইনে চীনের আধিপত্য রয়েছে। গত বছরের বাণিজ্যযুদ্ধে বেইজিং গ্যালিয়ামসহ কিছু বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করে বৈশ্বিক শিল্প সরবরাহব্যবস্থায় বড় চাপ সৃষ্টি করেছিল।

আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো জোসেফ ওয়েবস্টারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যখন তাইওয়ান ঘিরে সম্ভাব্য সংকটের মুখে, তখন অন্য একটি অঞ্চলে সীমিত মজুতের অস্ত্র ব্যয় করতে দেখলে বেইজিং খুশিই হবে। এতে তাইওয়ান পরিস্থিতির জন্য উপলব্ধ সম্পদ কমে যাবে। একই সঙ্গে নতুন অস্ত্র উৎপাদনেও চীনের খনিজ নিয়ন্ত্রণ চাপ হিসেবে কাজ করতে পারে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি হাতে বাগদাদে সুরক্ষিত গ্রিন জোন এলাকার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। ওই এলাকায় মার্কিন দূতাবাস অবস্থিত। বাগদাদ, ইরান, ১ মার্চ ২০২৬
ছবি: এএফপি

স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ ফেলো ম্যাথিউ পি ফুনাইওলে মনে করেন, গ্যালিয়াম মূলত সেন্সর প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কেবল অস্ত্র নিক্ষেপে নয়; বরং নতুন অস্ত্র তৈরি, উন্নয়ন ও মেরামতের সক্ষমতায়। যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, তবে তা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।

তবু ঝুঁকি একেবারে নেই, তা নয়। টানা দুই মাসে চীনের দুই কৌশলগত অংশীদার দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব অপসারণের ঘটনা তৃতীয় বিশ্বের কাছে চীনের আকর্ষণ কমাতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও ব্রিকসে যোগ দিয়েছে। চীনই ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সমঝোতা করিয়েছিল। এখন সৌদি আরবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি যদি আরেকটি অপ্রত্যাশিত ও বিস্তৃত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেই সংঘাতে মনোযোগ আটকে থাকে, তবে চীনের জন্য লাভের সম্ভাবনাই আপাতত বেশি। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে এটি কৌশলগত অবকাশ, যার সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চাইবে না।

  • এমি হকিন্স চীনে দ্য গার্ডিয়ানের জ্যেষ্ঠ সংবাদদাতা

    দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত