আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনায় সরকার কি ভুল পথে

ব্যাংকপ্রতীকী ছবি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত বহুল জনপ্রত্যাশার নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। আওয়ামী মাফিয়া যুগের অবিশ্বাস্য লুটপাটে বিধ্বস্ত ব্যাংকিং খাত এবং ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার যখন প্রশ্নাতীতভাবে নতুন সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার, তখন সরকার গঠনের মাত্র আট দিনের মাথায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদকে কেন্দ্র করে আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত দেখা গেল।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরই আওয়ামী লীগের নিয়োগ করা গভর্নরের পলায়নের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয় ড. আহসান হাবীব মনসুরকে। তাঁর ১৮ মাসের মেয়াদকালের নির্মোহ মূল্যায়নে ইতিবাচক-নেতিবাচক—দুই দিকই আসতে পারে। তবে তা কোনোভাবেই একটি নবনির্বাচিত সরকার কর্তৃক অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে তাঁর অপসারণের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে না।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৬ সালে রিজার্ভ হ্যাকিংয়ের পর তৎকালীন সরকারও গভর্নরকে সরিয়ে না দিয়ে পদত্যাগের সুযোগ দিয়েছিল।

২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পরও পলাতক গভর্নরকে পদত্যাগের মাধ্যমে সরে যাওয়ার রাস্তা রাখা হয়েছিল। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো গভর্নরকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বর্তমান সরকার, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট অভিযোগ না থাকার পরও। এ পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা না জানানোর কোনো উপায় নেই।

একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর শুধুই একটি পাবলিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ নয় যে সরকার নিজের খেয়ালখুশি অনুসারে কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ ব্যতীত এই পদে নিয়োগ বা অপসারণ করতে পারে। অত্যন্ত লজ্জাজনক হলেও রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছ থেকে এমন পদক্ষেপ দেশবাসীকে দেখতে হয়েছে। এ ঘটনা আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও একটি রাজনৈতিক অশনিসংকেত।

ফলে প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালনের গভীরতা ও ব্যাপ্তি এবং এর জন্য বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রতিকূলতা সম্পর্কে কি সরকার সচেতন?

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কাজ হিসেবে দেশের মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বর্তমান সময়টিই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং সময়। আওয়ামী আমলের লুটপাট, অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কারে অনীহা ও বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির ঘাত-প্রতিঘাত—এই তিনে মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন স্ট্যাগফ্ল্যাশনের দিকে ধাবিত হওয়ার পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো সঙিন। ফলে এমন অবস্থায় মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে প্রয়োজন ছিল সমসাময়িক দক্ষতম অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞকে। এ অনুধাবনই বর্তমান সরকারের আছে বলে একেবারেই মনে হয়নি। সরকার এটুকু বোঝার ব্যর্থতাতে আটকে থাকেননি; বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদের ধারাবাহিকতা রক্ষায় যে প্রজ্ঞা দেখানো দরকার ছিল, তারও প্রয়োজন মনে করেননি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির নজিরবিহীন ভয়ানক পরিস্থিতিতে গভর্নর নিয়োগে সরকারের প্রজ্ঞার অভাবের বর্তমান গভর্নর ‘হাত-পা-মুখ বেঁধে উত্তাল পদ্মায় সাঁতার কাটার মতো’ অবস্থায় পড়ে গেছেন। দুর্ভাগ্যবশত, এ অবস্থাতেই তাঁকে ক্রমে উত্তাল হতে থাকা নদী পার হতে হবে। এই যাত্রা বন্ধুর, তবে অসম্ভব নয়।

সরকার বুঝলই না, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের জন্য ‘ক্যাপ্টেনস লগ বুক হ্যান্ডওভার’ অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয়। এটা স্রেফ এটিএম বুথের গার্ডের ডিউটি পরিবর্তনের বিষয় নয়। শুধু তা-ই নয়, এমন অশোভনভাবে গভর্নর পরিবর্তনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার বিদায়ী ও নতুন গভর্নর—এই দুজন মানুষের সামাজিক সম্মানকে একই সঙ্গে আহত করেছে। এহেন ঘটনা দেশের সিভিল সোসাইটির সঙ্গে সরকার ও সরকারি দলের সামাজিক চুক্তির প্রতি এক চরম অবমাননা।

সরকারের এমন অবিমৃশ্যকারী পদক্ষেপের বিপরীতে যে মিডিয়া ট্রায়াল হয়েছে, তার পুরো ভিকটিম হয়েছেন সদ্য নিয়োগ পাওয়া গভর্নর, যিনি এই প্রক্রিয়ার কোনো সঞ্চালক নন। ফলে ভবিষ্যতে কোনো যোগ্য, পেশাগত দক্ষতার অধিকারী ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নাগরিক এমন সরকারের অধীনে যেকোনো দায়িত্ব নিতে দ্বিধা বোধ করবেন।

আরও পড়ুন

এ প্রতিষ্ঠান দেশের ব্যাংকিং খাত, ফাইন্যান্স কোম্পানি, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডার ও দেশের পুরো পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠান, মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠান, অথরাইজড গোল্ড ডিলার প্রতিষ্ঠান এবং দেশের মানি মার্কেট ও ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেটের রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ব্যবস্থাপনা ও সরকারের দায় ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের।

মুদ্রানীতি প্রণয়নের পাশাপাশি এক্সচেঞ্জ রেটের নীতিনির্ধারণী সংস্থা এ প্রতিষ্ঠান। আর্থিক খাতের সব রেগুলেটরি বডির আন্তসমন্বয় এবং রাজস্ব ও মুদ্রানীতি সমন্বয়ের মুখ্য ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে কে দায়িত্ব পালন করছেন, তা আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ফলে জাতীয় স্বার্থ ও জনকল্যাণ অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা করার জন্য গভর্নরকে প্রায়ই আপাত অজনপ্রিয় ও রাজনৈতিক সরকারের ইচ্ছার বিপরীতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

অনিবার্যভাবেই এমন এক আত্মবিধ্বংসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে সরকারকে সব মহল থেকেই ন্যায্য ও উপযুক্ত সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সব সচেতন মহল থেকে এমন পদক্ষেপকে নেতিবাচক ভঙ্গিতেই দেখা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এ ধরনের সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। দেশের আর্থিক খাতের শৃঙ্খলার জন্য অন্য রেগুলেটরি বডি এবং সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে।

এ ছাড়া এ সরকারের মেয়াদকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রেও পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রশ্নাতীত প্রক্রিয়া অনুসরণের আমরা সরকারের নিকট আহ্বান জানাই।

আর সরকার যে রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই নতুন গভর্নর নিয়োগ দিক, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পেশাদারি ও শৃঙ্খলা জোরদার করা আর ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত ও মুদ্রাবাজারকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সদ্য নিয়োগ করা গভর্নরকে সব ধরনের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মোহ ও পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে কাজ করার জোর আহ্বান জানাচ্ছি। তাঁর নিয়োগ ঘিরে যেসব প্রশ্ন ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে, সেগুলোকে থামিয়ে দিয়ে অর্থনীতিতে ও আর্থিক খাতে স্বস্তির সুবাতাস বইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব এখন তাঁরই।

এ বিষয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি এখন পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে সক্রিয় বিবেচনায় রেখে যেভাবে সতর্ক ভঙ্গিতে নীতি পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। দায়িত্বভার গ্রহণের পরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার কমানোর বিষয়ে তিনি ইঙ্গিত দিলেও এখন পর্যন্ত সেই পথে তিনি হাঁটেননি, যা বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশংসাযোগ্য। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হচ্ছে যে অন্তত ঈদুল ফিতরের আগে নীতি সুদহার কমানোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।

সামষ্টিক অর্থনীতির মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতার দিকে তাকালে নিঃসন্দেহে এটাই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া ৬ মার্চে তিনি মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ধাক্কা সামলাতে করণীয় বিষয়ে দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওই সভায় বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দেওয়া হয় একটি কমিটি গঠন করতে, যারা সময়ে সময়ে দেশের অর্থনীতি নিয়ে বিস্তারিত জানাবে। যোগ্য ও উপযুক্ত টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের সমন্বয়ে বাংলাদেশের বিদ্যমান মুদ্রানীতি কমিটিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই অর্থনীতিবিদদের এ পরামর্শকে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, যে কমিটি মাসিক ভিত্তিতে বসবেন এবং মুদ্রা ব্যবস্থাপনার হালনাগাদ নিয়মিত জনগণের কাছে প্রকাশ করবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির নজিরবিহীন ভয়ানক পরিস্থিতিতে গভর্নর নিয়োগে সরকারের প্রজ্ঞার অভাবের বর্তমান গভর্নর ‘হাত-পা-মুখ বেঁধে উত্তাল পদ্মায় সাঁতার কাটার মতো’ অবস্থায় পড়ে গেছেন। দুর্ভাগ্যবশত, এ অবস্থাতেই তাঁকে ক্রমে উত্তাল হতে থাকা নদী পার হতে হবে। এই যাত্রা বন্ধুর, তবে অসম্ভব নয়।

প্রজ্ঞা, অবিচলতা, নির্মোহতা ও পেশাদারি নিয়ে পরিশ্রম করে গেলে এই যাত্রায় তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব হবে না। দেশের সব সচেতন নাগরিক এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনের আন্তরিক সহযোগিতা তিনি পাবেন, সে বিষয়ে আমরা নিঃসংশয়ী। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে নিজের কমরেডদের মনে করিয়ে দিতে পারেন, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের পর তাঁদের পূর্বসূরিদের দায়িত্বশীলতার অসামান্য দৃষ্টান্তের কথা। আর তিনি যদি বিপথে যান, তাঁর পরিণতি নিজের পূর্বসূরির চেয়েও মর্মান্তিক হতেই পারে, যা আমাদের কারওরই কাম্য নয়।

  • জ্যোতি রাহমান ম্যাক্রোইকোনমিক বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক এবং

  • আসিফ খান আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক