পাকিস্তান ও তালেবানের যুদ্ধে কে জিতবে

আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশে বিমানবিধ্বংসী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানের জঙ্গি বিমান খুঁজছেন দুই তালেবান সদস্য।ছবি: রয়টার্স

আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ‘সরাসরি যুদ্ধের’ ঘোষণা নাটকীয় ও বিপজ্জনক শোনাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই ‘রেটরিক’ (বক্তব্য) সামরিক বাস্তবতাকে অনেকটাই ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাঁদের মতে, এই যুদ্ধে কোনো পক্ষেরই জয়ের সক্ষমতা নেই।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা এম আসিফ স্থানীয় সময় শুক্রবার আফগানিস্তানজুড়ে একাধিক হামলার পর এক্সে (সাবেক টুইটার) অস্বাভাবিকভাবে কঠোর ও ক্ষুব্ধ ভাষা ব্যবহার করেন।

তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তান সরাসরি এবং বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। পূর্ণমাত্রায় কূটনীতি চালিয়েছে। আমাদের ধৈর্যের পেয়ালা উপচে পড়েছে। এখন আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে খোলা যুদ্ধ।’

আফগানিস্তানে ইসলামাবাদের বোমা হামলা ছিল ব্যাপক। এর মধ্যে বিমান হামলা ও গোলন্দাজ হামলা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই হামলাগুলো কাবুল, পাকতিকা, কান্দাহারসহ প্রধান শহরগুলো লক্ষ্য করে চালানো হয়; কান্দাহারেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা বসবাস করেন।

তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ অবশ্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি হালকা করে দেখিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘কাপুরুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ার কিছু স্থানে বোমাবর্ষণ করেছে। আল্লাহর রহমতে কেউ হতাহত হয়নি।’

পাকিস্তানের হামলার জবাবে তালেবান কিছু ‘অসাধারণ’ দাবি করে—তারা ইসলামাবাদের ফয়জাবাদের কাছে একটি সামরিক শিবির, নওশেরার একটি সেনা ক্যান্টনমেন্ট এবং অ্যাবোটাবাদে বিমান হামলা সমন্বয় করেছে—যা পাকিস্তানের ভেতরে তালেবানের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ‘গভীর’ হামলা।

আফগান তালেবান বাহিনী পাকিস্তানের সীমান্তচৌকিতে হামলা চালিয়ে ২০ জন পুলিশ সদস্য ও বেসামরিক নাগরিককে হত্যার কয়েক দিন পর পাকিস্তানের এই সর্বশেষ অভিযান শুরু হয়।

গত সপ্তাহের শেষ দিকে পূর্ব আফগানিস্তানে সন্দেহভাজন জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাকিস্তানের বিমান হামলার পরই এসব সংঘর্ষ ঘটে। তালেবান জানায়, ওই হামলায় নারী, শিশুসহ ১৮ জন নিহত হয়েছে।

সম্পর্ক তলানিতে

বহু বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে সম্পর্কের অবনতির পর দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে।

২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনকে পাকিস্তান শুরুতে স্বাগত জানায়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, আফগানরা দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলেছে।

কিন্তু সেই ‘মধুচন্দ্রিমা’ ছিল স্বল্পস্থায়ী। দুই দেশের বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) আশ্রয় দিচ্ছে আফগান তালেবান। এই গোষ্ঠীটি (টিটিপি) পাকিস্তানের ভেতরে ক্রমবর্ধমান প্রাণঘাতী হামলার নেপথ্যে কাজ করছে।

কাবুল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তালেবান কর্তৃপক্ষ পাল্টা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট যোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তোলে—যা ইসলামাবাদ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

সর্বশেষ বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হয় ২০২৫ সালের অক্টোবরে। তুরস্ক ও কাতার মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিল; তবে সে প্রক্রিয়ায় হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।

শুক্রবারের হামলায় পাকিস্তান জানায়, তাদের বাহিনী ২৭০ জনের বেশি আফগান তালেবান যোদ্ধাকে হত্যা করেছে, ১৮টি সামরিক অবস্থান দখল করেছে এবং ডজনখানেক ঘাঁটি ও গোলাবারুদের গুদাম ধ্বংস করেছে।

তালেবানের দাবি, তারা ৫৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে হত্যা করেছে এবং একাধিক সীমান্তচৌকি দখল করেছে।

উভয় সরকারই একে অপরের দাবি বা বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করছে। উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।

পাকিস্তান–আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী চামান সীমান্ত চৌকিতে অস্ত্র হাতে সতর্ক প্রহরায় এক পাকিস্তানি সেনা
ছবি: রয়টার্স

একটি বিপজ্জনক মোড়

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের এই দফার লড়াইকে আলাদা করে যে বিষয়টি, তা হলো এর গভীরতা। ২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর সাম্প্রতিক হামলাটি কাবুলে আঘাত হানার মাত্র দ্বিতীয় ঘটনা।

বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, লক্ষ্যবস্তুর ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে।

শুধু সন্দেহভাজন জঙ্গিশিবিরে হামলা সীমাবদ্ধ না রেখে, পাকিস্তান সরাসরি তালেবান কর্তৃপক্ষ-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আঘাত হেনেছে; এটা কার্যত শাসনব্যবস্থাকেই লক্ষ্যবস্তু করা এবং টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে কাবুলের ওপর চাপ বাড়ানো। এর পাশাপাশি ইসলামাবাদের ভাষাও কঠোর হয়েছে।

এক ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের সামরিক প্রচারমাধ্যম শাখা কঠোর সতর্কবার্তা দেয়, যা তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের হুমকির সরাসরি জবাব বলে মনে হয়েছে; তিনি (জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ) বলেছিলেন, পাকিস্তান বিমান হামলা চালিয়ে গেলে ইসলামাবাদ বা অন্যান্য শহর লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের সামরিক প্রচারমাধ্যম শাখা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, ‘এটা পরিষ্কার করে দিতে হবে—পাকিস্তানের যেকোনো স্থানে, যেকোনো শহরে যদি সন্ত্রাসবাদী বা আত্মঘাতী হামলা হয়—যেমনটি তারা করবে বলে দাবি করছে… তাহলে শুধু সন্ত্রাসী নয়, তাদের অভিভাবক ও রক্ষাকর্তারাও যেখানে রয়েছে, তাদের কোনো স্থানই নিরাপদ থাকবে না। তখন আমাদেরও সমান অধিকার থাকবে।’

এই শব্দচয়ন তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু ‘সন্ত্রাসী’ নয়, তাদের ‘অভিভাবক’ ও  ‘রক্ষাকর্তাদের’ কথা উল্লেখ করে পাকিস্তান ইঙ্গিত দিচ্ছে—আফগান মাটি থেকে পরিচালিত জঙ্গিগোষ্ঠী এবং তালেবান কর্তৃপক্ষের মধ্যে তারা আর পার্থক্য নাও করতে পারে।

এই সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যাওয়া একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা নির্দেশ করে, যা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সীমা ছাড়িয়ে দুই শাসনকারী শক্তির সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

আফগানিস্তান এখনো অর্থনৈতিক ধস ও মানবিক সংকটে নিমজ্জিত।
সংঘাত বিস্তৃত হলে নিষেধাজ্ঞা, সহায়তা হ্রাস ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে লড়াই করা দেশটিতে বেসামরিক নাগরিকদের দুর্ভোগ আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

জয় ছাড়া উত্তেজনা বৃদ্ধি

রেটরিক (বক্তব্য) যতই তীব্র হোক, ইউরেশিয়া গ্রুপের দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক প্রমিত পাল চৌধুরী এবিসিকে বলেন, পাকিস্তান–আফগানিস্তান যুদ্ধে কোনো পক্ষেরই ‘জয়ের সক্ষমতা’ নেই।

পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত সামরিক বাহিনী বিশ্বের শক্তিশালীদের মধ্যে অন্যতম। তবে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধে চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে না… তাদের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে।’

এদিকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ফেলে যাওয়া অস্ত্রের কারণে আফগান তালেবান এখনো ব্যাপকভাবে সশস্ত্র। তবে প্রমিত পাল চৌধুরী তালেবানকে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় সামরিক বাহিনী হিসেবে নয়, ‘মূলত মিলিশিয়াদের একটি জোট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যে বাহিনী কান্দাহার, হেরাত ও কাবুলের আঞ্চলিক শক্তিকেন্দ্রগুলোর এক জটিল সমাহার।

এসব বাহিনী নিজেদের এলাকা রক্ষা করতে পারে, তবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রচলিত যুদ্ধ শুরু বা দীর্ঘস্থায়ীভাবে চালিয়ে যেতে পারে না। তার মূল্যায়নে, কোনো পক্ষই অপর পক্ষকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে সক্ষম অবস্থানে নেই।

ভুক্তভোগী বেসামরিক নাগরিকেরা

তালেবানের প্রধান মুখপাত্র বলেছেন, তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে চায়। কিন্তু এখানে একটি গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। আমরা আগেও এই চক্র দেখেছি—পাকিস্তানের ভেতরে জঙ্গি হামলা, এরপর আফগানিস্তানে পাকিস্তানের পাল্টা হামলা, তারপর প্রতিশোধ। যদি কেউ জিততে না পারে, তবে উত্তেজনা বৃদ্ধির মূল্য অন্যভাবে দিতে হয়।

আফগানিস্তান এখনো অর্থনৈতিক ধস ও মানবিক সংকটে নিমজ্জিত।
সংঘাত বিস্তৃত হলে নিষেধাজ্ঞা, সহায়তা হ্রাস ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে লড়াই করা দেশটিতে বেসামরিক নাগরিকদের দুর্ভোগ আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। চীন বলেছে, তারা ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’; দেশটি সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে; পাশাপাশি গঠনমূলক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখতে আগ্রহী বলেও জানিয়েছে।

জাতিসংঘ তাৎক্ষণিক উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে; বিশেষ দূত রিচার্ড বেনেট ও মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।

মস্কো আফগানিস্তান ও পাকিস্তান—উভয়কেই সীমান্তপারের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করে সংলাপে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়াই একমাত্র দেশ, যা আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, এবং তারা উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক দূত জালমে খলিলজাদ সতর্ক করেছেন, বর্তমান গতিপথ আরও বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাঁর মতে, উভয় পক্ষের ভূখণ্ড সীমান্তপারের হামলায় ব্যবহার রোধে নজরদারিসহ একটি কূটনৈতিক চুক্তিই কেবল এই চক্র ভাঙতে পারে।

এ মুহূর্তে ভাষা আরও কঠোর হচ্ছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য বা অর্থনৈতিক সহনশীলতা না থাকায়, শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষই আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হতে পারে।

ঝুঁকি হলো, তারা সেখানে পৌঁছানোর আগেই কতটা ক্ষতি হয়ে যায়।

এবিসি অনলাইন থেকে নেওয়া

  • মেঘনা বালি এবিসির দক্ষিণ এশিয়ার ব্যুরো চিফ
    কারিশমা ভিয়াস এবিসির এশিয়া সম্পাদক

    ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

    *মতামত লেখকদের নিজস্ব