২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘দিনবদলের সনদ’ শিরোনামের একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। দলটি ভোটারদের এই বলে আশ্বস্ত করেছিল যে ‘আমরা ২০২০-২১ সাল নাগাদ এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, যেখানে সম্ভাব্য উচ্চতম প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম একটি দ্রুত বিকাশশীল অর্থনীতি দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করবে। একটি প্রকৃত অংশীদারিমূলক সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে নিশ্চিত হবে সামাজিক ন্যায়বিচার, নারীর অধিকার ও সুযোগের সমতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার, সুশাসন ও দূষণমুক্ত পরিবেশ। গড়ে উঠবে এক অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র।’ নিয়তির পরিহাস যে বাংলাদেশে পরপর দুটি ব্যর্থ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে। পরিণতিতে বিশ্বের অনেক থিঙ্কট্যাংক বাংলাদেশকে এখন ‘কর্তৃত্ববাদী’ রাষ্ট্র বলে আখ্যায়িত করছে।

বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দিনবদলের সনদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত সার্বিক জ্বালানি নীতিমালা গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। পাশাপাশি তেল, গ্যাস, কয়লা, জলবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস, জৈবশক্তি, বায়ুশক্তি, সৌরশক্তিসহ জ্বালানির প্রতিটি উৎসের অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণেও জোর দেওয়া হয়েছিল। অঙ্গীকার করা হয়েছিল আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার।

কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখেছি, ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি খাতকে দল ও স্বজনতোষণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে, যার ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েও এই খাতের টেকসই উন্নয়ন হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গোষ্ঠীতন্ত্র, দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনার কারণে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ না হলেও জ্বালানি খাতে বর্তমান সংকট একপ্রকারের অনিবার্যই ছিল।

২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। দলটি বলেছিল, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদের বিবরণ দিতে হবে।

রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালোটাকা ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতিটি দপ্তরে গণ–অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক সনদ উপস্থাপন করা হবে।’ পরবর্তী বছরগুলোতে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহিষ্ণুতার ঘোষণা দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুর্নীতি এখন সর্বব্যাপী এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

দিনবদলের সনদে সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল আওয়ামী লীগ। বলেছিল, ‘বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের রায় কার্যকর ও জেলখানায় চার নেতার হত্যাকাণ্ডের পুনর্বিচার সম্পন্ন করা হবে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করা হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠন ও ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘন কঠোরভাবে বন্ধ করা হবে।’ এ ক্ষেত্রেও সরকার ইতিহাসের জঘন্যতম বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় বাস্তবায়ন এবং ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার পুনর্বিচার ছাড়া প্রায় সব প্রতিশ্রুতিই ভঙ্গ করেছে।

আওয়ামী লীগের দিনবদলের সনদে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অঙ্গীকার করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো, ‘নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনপদ্ধতির চলমান সংস্কার অব্যাহত থাকবে। জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তাসংক্রান্ত কতিপয় সুনির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া সংসদ সদস্যদের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার দেওয়া হবে। রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিষিদ্ধ করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা হবে এবং সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিষিদ্ধ হবে।

একটি সর্বসম্মত আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’ এসব প্রতিশ্রুতিও পূরণ করেনি ক্ষমতাসীন দলটি। বরং বাংলাদেশে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এখন স্মরণকালের সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাশাপাশি পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসের গুরুতর অভিযোগও আছে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে।

প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল দিনবদলের সনদে। বলা হয়েছিল, ‘দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে। প্রশাসনিক সংস্কার, তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ই-গভর্ন্যান্স চালু করা হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন করা হবে।

জনজীবনে নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে।’ দুর্ভাগ্যবশত, আমলাতন্ত্র এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভয়াবহ দলীয়করণ এখন আমাদের গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার আইএমএফসহ অন্য দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে। দাতাদের সঙ্গে এ নিয়ে দর–কষাকষিও করছে। এটা নিশ্চিত যে আমাদের সরকার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার করতে সম্মত হবে। কিন্তু আমাদের আশঙ্কা যে বিরাজমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ ফুটো কলসিতে পানি ঢালার সমতুল্যই হবে।

  • ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)