গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় মানুষের তুমুল সাড়া

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সকাল থেকে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নারীদের পাশাপাশি পুরুষ ভোটার কম ছিল না। গতকাল খুলনার পশ্চিম শিরোমনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে।ছবি: সাদ্দাম হোসেন

বহুপ্রতীক্ষার ১৩তম জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হলো। স্বাধীনতার আগে এ অঞ্চলে পাঁচটি বড় নির্বাচন হয়। স্বাধীনতার পর হলো ১৩টি। এই ১৮টি নির্বাচনের মধ্যে সেরা ও কম বিতর্কিত ছিল ১৯৭০-এর নির্বাচন। সেটি ছিল নতুন সংবিধান প্রণয়নের নির্বাচন। এবারের নির্বাচনের শেষে যে সংসদ গঠিত হবে, তারও আরেক নাম সংবিধান সংস্কার পরিষদ। এই দুই নির্বাচনের মিলের দিক এটি। অন্য একটি মিলের দিক—উভয় নির্বাচনে ভোট গ্রহণ পর্যন্ত রক্তাক্ত সহিংসতা বেশ কম। ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক অনিয়মের কোনো উপস্থিতি ছিল বলে দেখা যায়নি।

স্বাধীনতার পর থেকে তুলনামূলকভাবে সুন্দর নির্বাচন হয়েছে ১৯৯১ সালে। সেবার নির্বাচনী সহিংসতায় ৪০-এর বেশি মানুষ মারা যান। এবার সেই তুলনায় রক্তাক্ত সহিংসতা ঘটেনি বললেই চলে। আওয়ামী লীগসহ অনেকগুলো দল ভোটে না থাকার পরও মফস্‌সল এলাকায় ও গ্রামের মানুষ সকাল থেকে উৎসাহের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে উৎসাহের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন। শহরের তুলনায় গ্রামে সকাল থেকে ভিড় অনেক বেশি ছিল।

এবারের ভোট অচিন্তনীয় রকমের প্রতিনিধিত্বপূর্ণ ছিল। অতীতের চতুর্থ অবস্থান থেকে নিজেকে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় সংগঠিত করে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির মতো বড় দলের যোগ্য শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল। এবারের ভোটে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা–কর্মীরা সহিংসতায় কম লিপ্ত হলেও টাকার বিনিময়ে ভোট প্রক্রিয়াকে কলুষিত করতে চেষ্টা করেছেন অনেক জায়গায়। এসব নজির দেখে মনে হয়েছে, এবার নির্বাচনে অর্থের ব্যবহার নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধিতে আটকে ছিল না।

দেশের প্রায় অর্ধেক ভোটার নারী হলেও দিনের শুরুতে শহরের ভোটকেন্দ্রগুলোতে নারীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। তবে টিভি চ্যানেলে দেখেছি, গ্রামের ভোটকেন্দ্রগুলোতে নারীদের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। তবে গ্রাম-শহরে নারীদের মধ্যে আরও বাড়তি উচ্ছ্বাস আমরা আশা করেছিলাম। সেটি ঘটেনি প্রার্থী তালিকা নিয়ে তাঁদের হতাশা ও গত ১৭ মাসের ভীতিকর সামাজিক পরিস্থিতির কারণে।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের একটা মিলের দিক ছিল দুই ক্ষেত্রেই নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তের বড় আয়তনে অংশগ্রহণ। তাদের এই অংশগ্রহণের মূল বার্তা হলো পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। ১৮ মাস আগে রক্ত দিয়ে পরিবর্তন চেয়েছিল তারা। এবার ভোটের মাধ্যমে একই চাওয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটাল তারা।

তবে নির্বাচনের সারা দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বেশ সক্রিয় ছিল। সশস্ত্র বাহিনী এদিন বড় ভরসা হিসেবে ছিল। ভোটকেন্দ্রগুলোতে আসা-যাওয়ার পথে মানুষের সঙ্গে কথা বলে যেটা বোঝা গেছে, রাজনীতিবিদদের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা অনেক। তবে ভোটাররা আত্মবিশ্বাসী নন। বিএনপি বা জামায়াত দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মানুষ মনে জোর পাচ্ছে না। কিন্তু নির্বাচন হয়ে যাওয়াকে সবাই এক জাতীয় সফলতা হিসেবে দেখছে। এখন তারা দেখতে চায় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সবাই ফল মেনে নেবে।

এবারের নির্বাচনে অনেক বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক এসেছেন। তাঁরা দেখেছেন, স্বতঃস্ফূর্ত ভোট হচ্ছে। এটা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদার একটা উলম্ফন ঘটাবে। মুহূর্তটি গৌরবের এবং প্রয়োজনীয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন গণতন্ত্রে উত্তরণের দ্বিতীয় পর্ব হাজির হয়েছে। এই পর্বে সরকার গঠনকারী দল ও বিরোধী দলকে যৌথভাবে সংবিধান সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এটা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলেও করতে হবে, ‘না’ জিতলেও করতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশাগুলো গণভোটের ফলাফলের চেয়ে কম গুরুত্ববহ নয়। ৮০০ থেকে এক হাজার শহীদের রক্তের বিনিময়ে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের মননে গভীরভাবে জাগরূক থাকবে। সুতরাং গণভোটের ফলাফলের বাইরেও ভবিষ্যতের সংসদকে গণ–অভ্যুত্থানের চাওয়াকে কাজে অনুবাদ করতেই হবে।

আরও পড়ুন

এবারের নির্বাচন সরাসরি গণ–অভ্যুত্থানের ফল। সুতরাং নতুন সংসদকে অবশ্যই শহীদের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সেই ঋণ পরিশোধের প্রধান শর্ত হলো রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে হাত দেওয়া। রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে পুলিশ সংস্কার থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সংস্কার পর্যন্ত অনেক কিছু। জনপ্রশাসন সংস্কারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব সংস্কার না করে রাষ্ট্র পুনর্গঠন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। চব্বিশের আকাঙ্ক্ষাটি অনেক বড়। জনতা নির্বাচন সম্পন্ন করে জানিয়ে দিয়েছে তারা সংস্কারের কাজে সরকারের মনোযোগ চায়।

বাংলাদেশের চলতি নির্বাচনের দিকে বিশ্বের অনেকের গভীর মনোযোগ রয়েছে। এই মনোযোগ নির্বাচনের পরও বহাল থাকবে। ২০২২ থেকে ২০২৫–এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশেই জেন–জি গণ–অভ্যুত্থান ঘটেছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে নির্বাচন হয়ে গেল। আগামী কিছুদিনের মধ্যে নেপালে নির্বাচন হবে। এই তিন দেশে গণ–অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সরকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার কীভাবে সম্পন্ন করে, সেটা দেখতে এখন অপেক্ষা করছে বিশ্ব। এর মাঝে নতুন সরকারের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ বিশ্বসমাজের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও ভারসাম্য আনা।

আরও পড়ুন

বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে বৈদেশিক সম্পর্কের বাংলাদেশ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষ একটা দেশের স্বার্থের কাছে হেলে পড়েছিল। আবার গত ১৮ মাসে আমরা অতীত থেকে শিক্ষা না নিয়ে আবারও আরেকটা দেশের কাছে, স্বার্থের কাছে নতজানু হয়ে পড়লাম। নতুন সংসদ ও নতুন সরকারকে পররাষ্ট্রনীতির এই বিকৃত দশা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ায় নামতে হবে সরকারকে।

একই সঙ্গে দেশের ভেতরে মব সংস্কৃতির লাগাম টেনে ধরতে হবে। এর জন্য পুলিশ বাহিনীর মনোবল জোরদার এবং এর ওপর দলীয় প্রভাব কমাতেই হবে। নতুন সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনেই পুলিশসহ বেসামরিক প্রশাসনকে নৈতিক ও কাঠামোগতভাবে সব ধরনের মব ও নৈরাজ্য মোকাবিলার স্তরে নিতে হবে। নির্বাচনের দিন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে এটাই জনতার প্রধান আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখা গেছে। এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন না হলে নির্বাচন–পরবর্তী কোনো সরকারই টেকসই হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো উচ্ছ্বাসই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের একটা মিলের দিক ছিল দুই ক্ষেত্রেই নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তের বড় আয়তনে অংশগ্রহণ। তাদের এই অংশগ্রহণের মূল বার্তা হলো পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। ১৮ মাস আগে রক্ত দিয়ে পরিবর্তন চেয়েছিল তারা। এবার ভোটের মাধ্যমে একই চাওয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটাল তারা।

  • আলতাফ পারভেজ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক

*মতামত লেখকের নিজস্ব