ফ্রান্স কেন আন্দোলনকারীদের ওপর এত সহিংস হয়ে উঠছে

প্যারিসে বিক্ষোভের সময় একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। গত শনিবার তোলাছবি: রয়টার্স

১৯৯৪ সালে যখন আমি মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী ছিলাম, তখন একটি প্রস্তাবিত সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলাম, যার মাধ্যমে ফরাসি নিয়োগকর্তাদের তরুণ কর্মীদের ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম বেতন দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। আমাদের আন্দোলন সফল হয়েছিল; তবে সম্প্রতি ফ্রান্সে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের যে আতঙ্কময় তাণ্ডব চালানো হয়েছে, তখন যদি আমাদের তার মুখোমুখি হতে হতো, তবে আমি ঘরেই বসে থাকতাম।

ইডেন নামের ১৪ বছরের এক কিশোরের মুখে পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড এসে লাগলে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং একাধিক দাঁত উপড়ে পড়ে। ইভান নামের ১৫ বছরের এক কিশোরের হাত পুলিশের গ্রেনেডের বিস্ফোরণে উড়ে গেছে। আর ডানকার্কে পুলিশের একটি এসইউভি গাড়ি বারবার মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের একটি দলের ওপর উঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

মানবাধিকারের স্বঘোষিত রূপকার ফ্রান্স এখন আন্তর্জাতিক আইনি নজরদারির মুখোমুখি হচ্ছে, যা সাধারণত কোনো একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা উন্মাদ হয়ে উঠলে দেখা যায়।

জাতিসংঘের এক বিশেষ প্রতিবেদক ফরাসি কর্তৃপক্ষকে আন্দোলনকারীদের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে যে তারা ফ্রান্সে এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ‘উদ্বেগের সঙ্গে’ পর্যবেক্ষণ করছে। ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা করেছে। সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে চলতি সপ্তাহেই ফ্রান্সে এসেছেন।

প্রায়ই যুক্তি দেওয়া হয়, দেউলিয়া হওয়ার মুখে এবং ঋণের বোঝায় জর্জরিত ফ্রান্সে বর্তমানে পড়াশোনার মানোন্নয়নে ১০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের যে দাবি শিক্ষার্থীরা তুলেছে, তা একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়। তবে আমাদের এই কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও সরকারি অর্থ ব্যয় করাটা সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়: ঋণ কমাতে আপনি সরকারি খরচ ছাঁটাই করতে পারেন, অথবা রাজস্ব বাড়াতে পারেন।

অর্থনীতিবিদ এলিস হুইলেরি এবং রোমান প্যারিস শিক্ষাক্ষেত্রে বছরে অতিরিক্ত ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের একটি গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব সামনে এনেছেন। এই অর্থের সংস্থান হবে বড় অঙ্কের উত্তরাধিকার সম্পদের ওপর কর সংস্কারের মাধ্যমে, যা ২০২৬ সালেই ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব আদায় করবে এবং এর ফলে কেবল শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী উত্তরাধিকারীর ওপর করের পরিমাণ বাড়বে। এর ফলে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের সহায়তা, তাদের অনুদান ও আবাসন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংখ্যা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া সম্ভব হবে। তবে সরকারি ব্যয়ের এই বিতর্ক কিন্তু শিক্ষার্থীদের, শিক্ষকদের এবং অভিভাবকদের তোলা যৌক্তিক অভিযোগগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয় না। এমনকি এটি পুলিশের এই নির্মম পদক্ষেপকেও কোনোভাবে বৈধতা দেয় না।

সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত স্কুলগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কাজনকভাবে খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে। তিন বছর আগে এক লেখায় আমি বলেছিলাম, উন্নত বিশ্বের মধ্যে ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা অন্যতম বৈষম্যমূলক।

বিকল্প শিক্ষকের অভাবে ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে প্রচুর পাঠদানের সময় নষ্ট হচ্ছে, যা পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের স্কুলগুলোকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

মূল ভূখণ্ড ফ্রান্সের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলে ২০২৩ সালে স্কুল ডাক্তারের পদগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই খালি ছিল। ২০২৫ সালে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার কর্মীদের মধ্যে ৪৯টি আত্মহত্যার ঘটনা নিবন্ধিত হয়েছিল। যদিও এই মৃত্যুগুলোর সব কটি কাজের চাপের কারণে বলা যাবে না, তবে এই খাতজুড়ে কাজের পরিবেশের যে মারাত্মক অবনতি ঘটেছে, তা অস্বীকার করা কঠিন। এর পাশাপাশি রয়েছে অবকাঠামোগতভাবে ভেঙে পড়া স্কুলগুলো। সেখানে বিদ্যুৎ–বিভ্রাট রয়েছে, প্রয়োজনীয় আসবাবের অভাব রয়েছে। মায়োত্তে—যেখান থেকে এই বিক্ষোভের সূচনা—সেখানে ৯০০ শিক্ষার্থীর জন্য তৈরি একটি মাধ্যমিক স্কুলে এখন ২ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থীকে রাখা হচ্ছে। আন্দোলনটি পরবর্তী সময়ে ক্রেতেইলের একটি স্কুলের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ড ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ে।

শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কেন্দ্রে থাকা আরও একটি প্রধান বিষয় হলো ‘পারকোর্সাপ’। চরম বৈষম্যমূলক হিসেবে বিবেচিত এই ব্যবস্থার কারণে চলতি বছর ১ লাখ ২৬ হাজার আবেদনকারী, যাদের বড় একটি অংশই সুবিধাবঞ্চিত পটভূমি থেকে আসা, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো আসনই পায়নি। যৌক্তিক দাবির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই সামাজিক আন্দোলনকে একটি স্বাভাবিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করার বদলে সরকার স্কুলের শিক্ষার্থীদের এমন এক অভ্যন্তরীণ শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেছে, যাদের দ্রুত ‘নিষ্ক্রিয়’ করতে হবে। গঠনমূলক উপায়ে আলোচনা করে সংকট সমাধানের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।

৮ অক্টোবরের মধ্যে ৬ হাজার ৮৭৭ জন মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই শিশু! বলা হচ্ছে, কেবল ১ অক্টোবরেই পুলিশ ১ হাজার ৯৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যা ১৯৬১ সালের পর থেকে এক দিনে সর্বোচ্চ গ্রেপ্তারের রেকর্ড ভেঙেছে। পুলিশের এই অভিযানগুলোর মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল কেবল গ্রেপ্তার করা। এটা পরিস্থিতিকে সহিংস সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। এর ফলে অনেক সাধারণ মানুষও দাঙ্গার মধ্যে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে।

তরুণদের প্রতিবাদ জানানোর মতো সুস্থ ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর সরকারের এই ধরনের প্রতিক্রিয়া চরম লজ্জাজনক ও ঘৃণ্য। নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর এ ধরনের সহিংসতার স্থান কোনো স্বাধীন বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে হতে পারে না।

  • রখায়া দিয়ালো ফরাসি সাংবাদিক

  • দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত