বৃদ্ধ বক্সারের শেষ বাজি: ভেনেজুয়েলায় মার্কিন শক্তির আড়ালে অন্য কারা?

মাদুরো নিকোলা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল ছবি

কারাকাসের রাজপথ থেকে ভেসে আসা সাম্প্রতিক দৃশ্যগুলো অস্বস্তিকরভাবে পরিচিত। নিকোলা মাদুরোর আটক, দেলসি রদ্রিগেজের আকস্মিক ক্ষমতা গ্রহণ এবং মার্কিন ‘উপদেষ্টাদের’ দ্রুত তৎপরতা—সব মিলিয়ে যেন পুরোনো এক নাটকের নতুন মঞ্চায়ন।

ওয়াশিংটনের থিঙ্কট্যাংকগুলো একে দেখছে ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ হিসেবে, আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধীদের চোখে এটি সিআইএ-সমর্থিত আরেকটি ‘তেল দখলের অভ্যুত্থান’।

কিন্তু এই দ্বৈত ব্যাখ্যার বাইরে ভিন্ন এক পাঠ সামনে আনছেন ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহিদ বোলসেন। তাঁর ভিডিও বিশ্লেষণ—‘ভেনেজুয়েলা: রিডিং দ্য ফাইন প্রিন্ট অব পাওয়ার’ দেখে বেশ চমকিত হলাম।

বলে নেওয়া ভালো, আইরিশ-জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন অ্যাকটিভিস্ট, লেখক ও জনপরিচিত ব্যক্তিত্ব শাহিদ কিং বোলসেন একজন বিতর্কিত মানুষ। তা সত্ত্বেও বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অন্যতম অনন্য ও প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তাঁর বক্তব্য অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলেও বিশ্বব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে এ ধরনের ভিন্ন ভাবনাগুলোকেও আমলে নিতে হচ্ছে শুধু এটি বোঝার জন্য যে আমরা আসলে বিশ শতকের চশমা দিয়ে একবিংশ শতকের করপোরেট পুনর্গঠন বোঝার ক্ষেত্রে কোনো ভুল করছি কি না।

আরও পড়ুন

বোলসেনের মতে, ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে, তা কোনো আদর্শিক লড়াই বা দুই রাষ্ট্রের সংঘাত নয়; এটি একধরনের বৈশ্বিক ‘রিসিভারশিপ’।

বড় কোনো কোম্পানি দেউলিয়া হলে যেমন আদালত রিসিভার নিয়োগ করে সম্পদ বিক্রি ও পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে দেনা মেটায়, ভেনেজুয়েলাও তেমন এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এখানে কেবল একটি সরকারের পতন নয়, বরং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সার্বভৌমত্বের ধারণাকেই ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ করে দেওয়া হচ্ছে।

এই পরিবর্তন বুঝতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থানও বুঝতে হয়। বোলসেন যুক্তরাষ্ট্রকে তুলনা করেছেন একসময়কার অপরাজেয় তবে এখন বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়া হেভিওয়েট বক্সারের সঙ্গে, যার জয়ের শক্তি ফুরিয়েছে; তার টিকে থাকার ভরসা কেবল কৃত্রিম শক্তিবর্ধক আর মিডিয়ায় তৈরি পুরোনো ভাবমূর্তি।

বোলসেনের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র আর নিজস্ব জাতীয় স্বার্থে পরিচালিত এক সার্বভৌম সাম্রাজ্য নয়; বরং একটি অবরুদ্ধ রাষ্ট্র, যার সামরিক ও আর্থিক যন্ত্রণা কার্যত ভাড়া দেওয়া হয়েছে অ-জাতীয় আর্থিক কনসোর্টিয়ামের কাছে।

কারাকাসে মার্কিন উপস্থিতি তাই করদাতাদের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে বৈশ্বিক পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকেই বেশি মনোযোগী।

অপহৃত প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর সমর্থনে কারাকাসে আয়োজিত সমাবেশে মাদুরো সমর্থক বিক্ষোভকারীরা।
ছবি: এএফপি
ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্র পুনরুজ্জীবিত করতে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা তারা করতে পারবে না। এই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাতে আছে তথাকথিত ‘ধৈর্যশীল পুঁজি’, যারা ত্রৈমাসিক লাভের বদলে কয়েক দশকের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ চায়।

ভেনেজুয়েলায় এই হস্তক্ষেপের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমা বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের যুগে প্রবেশ করছে। এর ফলে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কেবল এআই ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহার জার্মানি ও ফ্রান্সের সম্মিলিত ব্যবহারের চেয়েও বেশি হবে। এই নতুন অর্থনীতিকে টেকসই রাখতে জ্বালানির দাম কম রাখা অপরিহার্য।

তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের নিচে না নামলে বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে। এই বাস্তবতায় বিশ্বের বৃহত্তম তেলভান্ডার ভেনেজুয়েলা হয়ে উঠেছে কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু। বোলসেনের ভাষায়, মাদুরো কোনো রাজনৈতিক সমস্যা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সরবরাহশৃঙ্খলের একটি বাধা।

বোলসেনের বিশ্লেষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুনর্গঠনের অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্রের বড় তেল কোম্পানিগুলো স্বল্পমেয়াদি লভ্যাংশের চাপে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে অনাগ্রহী।

ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্র পুনরুজ্জীবিত করতে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা তারা করতে পারবে না। এই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাতে আছে তথাকথিত ‘ধৈর্যশীল পুঁজি’, যারা ত্রৈমাসিক লাভের বদলে কয়েক দশকের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ চায়।

আরও পড়ুন

পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার ভারী তেল পরিশোধনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও মূলত তাদেরই রয়েছে।

বোলসেনের অভিমত, এই নতুন ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সীমিত থাকবে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত ঠিকাদার হিসেবে। মালিকানা ও অর্থায়নের ভার যাবে উপসাগরীয় পুঁজির হাতে। ফলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানের বদলে দেখা যাচ্ছে মার্কিন শক্তির সাব-কন্ট্রাক্টিং।

বোলসেনের দাবি, মাদুরোর বিদায় কোনো একক শক্তির চাপ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশ, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে নীরব সমঝোতার ফল। রাশিয়া ও চীন তাদের পাওনা সুরক্ষিত হওয়ার নিশ্চয়তা পেতেই অবস্থান বদলেছে।

অন্যদিকে ডলারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তেলের দামে নিয়ন্ত্রণ চায় যুক্তরাষ্ট্র। এই সমন্বিত ব্যবস্থাকেই বোলসেন বলেছেন ‘নতুন পরিকল্পনা’। তিনি মনে করেন এর লক্ষ্য বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে ধীরে ধীরে এক নতুন বৈশ্বিক কাঠামোয় পৌঁছানো।

আরও পড়ুন

ভেনেজুয়েলা তাই নতুন বিশ্ব শাসনের এক পরীক্ষাগার। এখানে জাতীয় সীমানা প্রশাসনিক রেখায় সীমিত, আর রাজনৈতিক আদর্শ পুঁজির স্বার্থে ব্যবহৃত এক আবরণ। প্রশ্নটা আর কে জিতল বা হারল, তা নয়।

বাস্তবতা হলো—এক বৈশ্বিক রিসিভারশিপের দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব, যেখানে সার্বভৌমত্ব সাধারণ মানুষের সামনে রাখা এক আইনি কল্পনা মাত্র।

এই ব্যবস্থায় ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ বা আমেরিকার করদাতা কেউই মূল বিজয়ী নন; পর্দার আড়ালে থাকা বৈশ্বিক কনসোর্টিয়ামই শেষ পর্যন্ত লাভবান হচ্ছে, এবং হবে।

  • রিজু আলম সাবেক সাংবাদিক এবং লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রাক্তন ছাত্র-সদস্য।