এবং তখনো দেখা গেল ঢাকায় নির্বাচনী জনসভা করার জন্য বিএনপি অনুমতি পেল না, কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বড় সমাবেশ করার সুযোগ পেল। এসব ঘটনার উল্লেখ করার কারণ এটি বলা নয় যে ইসলামী আন্দোলন সরকারের আশীর্বাদ পেয়েছিল, বরং বিএনপির প্রতি যে বৈষম্য করা হয়েছিল, সেটা মনে করিয়ে দেওয়া।

বিএনপির প্রতি বৈষম্য করে এবং বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ক্ষমতাসীন দল বা সরকার কতটা লাভবান হচ্ছে বা আদৌ হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর তারাই ভালো দিতে পারবে। তবে বিএনপির সমাবেশে নানা ধরনের বাধা ও প্রতিকূলতা সৃষ্টি করায় ঝিমিয়ে পড়া দলটি যে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে, তা মোটামুটি স্পষ্ট। এ জন্য বিএনপি আওয়ামী লীগকে বরং আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে পারে। মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ফারাক্কা লংমার্চের পর আর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দলের কর্মী-সমর্থকেরা চিড়া-মুড়ি-গুড় নিয়ে আগের দিনই সমাবেশস্থলে পৌঁছেছেন, মাটিতে শুয়ে রাত কাটিয়েছেন, এমন দৃশ্য বিরল। এসব ছবি সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছে। মোটরযান বন্ধ রাখায় তাঁরা নৌকা কিংবা ট্রলারে, ট্রেন ও ভ্যানে চেপে সমাবেশে যোগ দিয়েছেন।

দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং নানা ধরনের মামলা-হামলার পরও বিএনপি দলটি যে নিঃশেষ হয়ে যায়নি, তা বেশ ভালোভাবেই তারা বুঝিয়ে দিয়েছে। সমাবেশের আকার বা পরিধি নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু তারাই যে এখনো সরকারের প্রতিপক্ষ, সেটা অস্বীকারের উপায় নেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বরং কিছুটা বিস্মিত যে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও দলটির সমর্থকেরা এসব সমাবেশে হাজির হচ্ছেন। খালেদা জিয়া যখন বাড়িতে বিভিন্ন শর্তের জালে বন্দী এবং দলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান যখন কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে নির্বাসনে, তখন নেতৃত্বশূন্যতার কারণে যে ধারণাটি চালু ছিল, তা হলো দলটি ক্রমেই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হবে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য বাধাবিঘ্ন সৃষ্টির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সেই অক্ষমতার জন্য করুণা করা যায়। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীকে হেনস্তা করতে গিয়ে জনভোগান্তি তৈরি নিন্দনীয়। সেই পরিস্থিতিতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ক্ষমতাসীন দল থেকেও বারবার প্রশ্ন করা হয়েছে, কে দেবে দলটির নেতৃত্ব? এসব জনসমাবেশ থেকে সম্ভবত এ প্রশ্নের উত্তর কী হতে পারে, তার আভাস মেলে। উপমহাদেশের অনেক পুরোনো ও বড় দলে এর নজির রয়েছে। ভারতে কংগ্রেসে মল্লিকার্জুন খাড়গে দলের সভাপতি নির্বাচিত হলেও সুতার নাটাই যে গান্ধী পরিবারের হাতেই থাকছে, তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সরকার এবং মুসলিম লীগের নেতা হলেও নেপথ্যের ক্ষমতা যে তাঁর বড় ভাই নওয়াজ শরিফের কাছে, তা সবার কাছেই স্পষ্ট।

বিএনপির অবশ্য আরও একটি লাভ হয়েছে। গত এক দশকে, বিশেষ করে খালেদা জিয়াকে দণ্ড দিয়ে জেলে পাঠানোর পর বিএনপি সংবাদমাধ্যমে ক্রমেই গৌণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। সংবাদপত্রের পেছনের পাতা কিংবা ভেতরের পাতায় এক কলামে কয়েক ইঞ্চি বরাদ্দই যেন তাদের নিয়তি হয়ে উঠেছিল। টিভি পর্দায়ও তারা ছিল সংবাদক্রমের তলানিতে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সমাবেশগুলো তাদের প্রথম পাতায় ও টিভির মূল শিরোনামে উঠিয়ে এনেছে। রাজনীতিতে ঠ্যাংগাড়ে ভাষায় ‘খেলা হবে’ হুংকার যখন থেকে শুরু হয়েছে এবং মারধর করা ও নানাভাবে সভা–সমাবেশে বাধা তৈরি বেড়েছে, তখন থেকেই সংবাদমাধ্যমে বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে গেছে। সরকার-সমর্থক বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষেও এসব খবর উপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ নিবন্ধের আলোচ্য অবশ্য বিএনপির লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ নয়, বরং বিএনপিকে চাপে (শায়েস্তাও পড়তে পারেন) রাখতে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগের মুখে ঠেলে দেওয়া কেন, সেই প্রসঙ্গ। বাস-ট্রাক ধর্মঘট সরকার ডাকেনি ঠিকই, কিন্তু সরকারের কোনো দায় নেই, এমন দাবি দুর্ভোগের শিকার কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে কি উপহাস নয়? বাস-ট্রাকমালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনগুলোয় ক্ষমতাসীন দলের প্রাধান্য ও নিয়ন্ত্রণের কথা সবারই জানা। যখন যে দল সরকারে থাকে, এসব সমিতিতে তখন সেই দলেরই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পায়। সুতরাং ক্ষমতাসীন দলের যে এসব ধর্মঘটে ভূমিকা রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে কোনো সংশয় নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, গণপরিবহন ধর্মঘটকে রাজনৈতিক হাতিয়ারে রূপান্তরের পরিণতি কী?

চট্টগ্রাম ও খুলনার ধর্মঘটগুলোর সময় সরকারের মন্ত্রীরা বললেন যে এসব আঞ্চলিক ধর্মঘটের বিষয়ে সরকারের কিছু করার নেই। পরে সমালোচনার মুখে তাঁরা এখন বলা শুরু করেছেন যে বাস-ট্রাকে আগুন লাগানো হতে পারে, এমন আশঙ্কায় মালিক-শ্রমিকেরা পরিবহন বন্ধ রেখেছেন। তাঁরা এ জন্য ২০১৩-১৪ সালের কথিত আগুন–সন্ত্রাসের ইতিহাস তুলে ধরে ওই আশঙ্কার যৌক্তিকতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের এ দুটি যুক্তিতেই সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, ধর্মঘটকারীরা ধর্মঘটের যে কারণগুলো বলেছেন, তা কিছু আঞ্চলিক দাবি এবং তাতে ‘আগুন-সন্ত্রাসের’ আশঙ্কার কথা নেই। আর সরকার যদি ‘আগুন–সন্ত্রাসের’ আশঙ্কা করে থাকে, তাহলে তাদের শঙ্কামুক্ত করার মতো উপযুক্ত নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কার? সরকার যদি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে না পারে, তাহলে তারা কীভাবে শাসনকাজ পরিচালনা করবে?

দ্বিতীয়ত, পরিবহন ধর্মঘট আঞ্চলিক হোক কিংবা জাতীয় পরিসরে হোক, তা নিরসনের দায়িত্ব কার? বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাজ কী? সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের একচ্ছত্র ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। রুট পারমিট যে উদ্দেশ্যে ও শর্তে দেওয়া হয়েছে তা ভঙ্গ হলে সরকারের সেই পারমিট বাতিল করার ক্ষমতাও রয়েছে।

হঠাৎ যারা ধর্মঘট শুরু করে, তারা যে স্পষ্টভাবে পারমিটের শর্ত লঙ্ঘন করছে, তা নিয়ে কি সন্দেহের কোনো অবকাশ আছে? আইন অনুযায়ী সরকার পরিবহন সমন্বয় কমিটির (ট্রান্সপোর্ট কো–অর্ডিনেশন কমিটি) সভা করে অথবা অন্য কোনোভাবে ধর্মঘট নিরসনের ব্যবস্থা নেবে, সেটাই তো প্রত্যাশিত। অথচ সে রকম কিছু না করে সরকার নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে বলেই মনে হয়েছে। বিএনপির জনসমাবেশ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধর্মঘটও শেষ হয়েছে। কোনো দাবি পূরণ হয়েছে অথবা সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে—এমন কিছু শোনা যায়নি। এগুলো সরকারের পরোক্ষ উৎসাহ বা পৃষ্ঠপোষকতা বলে যদি কেউ দাবি করে, তাহলে তা কি নাকচ করা সম্ভব?

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জন্য বাধাবিঘ্ন সৃষ্টির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সেই অক্ষমতার জন্য করুণা করা যায়। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীকে হেনস্তা করতে গিয়ে জনভোগান্তি তৈরি নিন্দনীয়। সেই পরিস্থিতিতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

  • কামাল আহমেদ সাংবাদিক