পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ কেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে

আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তছবি: এএফপি

সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তাঁর দেশ আফগানিস্তানের সঙ্গে একটি প্রকাশ্য যুদ্ধের অবস্থায় রয়েছে। আফগান সীমান্তে ইসলামাবাদ বিমান হামলা চালানোর পরই এ বক্তব্য সামনে আসে।

দুই সাবেক মিত্রের মধ্যবর্তী এই সংঘাত ১৬ মার্চ রাতে চরম রূপ নেয়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আফগানিস্তানের নঙ্গরহার প্রদেশ ও কাবুলে শক্তিশালী হামলা চালায়। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে বোমার আঘাতে অন্তত ১০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনার পর চারদিক থেকে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে।

তালেবান সরকারের মুখপাত্ররা সাফ জানিয়েছেন, কূটনীতির সময় শেষ হয়ে গেছে এবং তাঁরা সাধারণ মানুষের প্রাণহানির বদলা নেবেন। বিপরীতে পাকিস্তানের মন্ত্রীরা জানিয়েছেন, তাঁরা কোনো হাসপাতালে হামলা করেননি। তাঁরা সামরিক অভিযান চলমান রাখবেন।

চলমান উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৩ ফেব্রুয়ারি। তখন পাকিস্তান বিমানবাহিনী আফগান সীমান্তের ভেতরে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির আস্তানা লক্ষ্য করে অভিযান চালায় বলে দাবি করে। তবে আফগান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মতে, সেই হামলায় অন্তত ১৮ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। এর প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয় আফগান তালেবান।

কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। ইসলামাবাদ মনে করে, টিটিপি বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান গোষ্ঠী আফগান মাটি ব্যবহার করে এসব হামলা চালাচ্ছে। অভিযোগ আছে, আফগান তালেবান টিটিপিকে পরোক্ষ মদদ দিচ্ছে। এ পটভূমিতেই পাকিস্তান মাঝেমধ্যে আফগান সীমান্তে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে।

কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। ইসলামাবাদ মনে করে, টিটিপি বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান গোষ্ঠী আফগান মাটি ব্যবহার করে এসব হামলা চালাচ্ছে।

২০২১ সালে যখন তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখল করে, তখন পাকিস্তানের হিসাব ছিল ভিন্ন। মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসলামাবাদ তালেবানকে সমর্থন দিয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানসহ অনেক নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন, কাবুলে একটি পাকিস্তান–ঘনিষ্ঠ সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে।

পাকিস্তানের প্রত্যাশা ছিল, তালেবান ক্ষমতায় থাকলে আফগান বাহিনী ভারতঘনিষ্ঠ হবে না। একই সঙ্গে ব্রিটিশদের নির্ধারিত বিতর্কিত ডুরান্ড লাইনকে তালেবান সরকারি সীমানা হিসেবে মেনে নেবে বলে তারা আশা করেছিল। কিন্তু ক্ষমতা দখলের কয়েক মাসের মধ্যেই সীমান্ত ইস্যু নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে সংঘাত বাড়ে। পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কার্যক্রম কমে যাওয়ার বদলে উল্টো ব্যাপক বৃদ্ধি পায়।

টিটিপি একসময় আফগান তালেবানের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। ফলে নিজেদের পুরোনো মিত্রদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযানে নামতে কাবুল অনেকটা দ্বিধাগ্রস্ত। তাদের আরেকটি ভয় হলো, টিটিপির ওপর চাপ প্রয়োগ করলে তারা আইএসের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে হাত মেলাতে পারে, যা সরাসরি আফগান তালেবানের শাসনের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।

তবে এর চেয়েও বড় কৌশলগত কারণ হলো টিটিপিকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দর–কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। আফগান সরকার মনে করে, টিটিপিকে সম্পূর্ণ দমন করলে সীমান্ত ও বাণিজ্যিক ইস্যুতে ইসলামাবাদ আরও কঠোর হয়ে উঠবে। তাই তারা বারবার পাকিস্তানকে টিটিপি নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার পরামর্শ দিচ্ছে।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ জারদারি সম্প্রতি কাবুলের শাসকগোষ্ঠীকে ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, গত কয়েক বছরে তালেবান প্রশাসন টিটিপিকে সীমান্ত পার হয়ে নাশকতার সুযোগ করে দিচ্ছে। বর্তমান পটভূমিতে টিটিপি তাদের কৌশল পরিবর্তন করে সাধারণ লক্ষ্যবস্তুর বদলে সরাসরি পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে।

নানগারহার প্রদেশে আফগানিস্তান–পাকিস্তান সীমান্তবর্তী তোরখাম সীমান্ত ক্রসিং এলাকায় তালেবান নিরাপত্তাকর্মীরা, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: এএফপি

২০২১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান টিটিপির জন্য ক্ষমা ও কারাবন্দী মুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এতে বিশেষ কাজ হয়নি। তাঁর বিদায়ের পর ইসলামাবাদে যখন শাহবাজ শরিফের সরকার ক্ষমতায় আসে তখন পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। ২০২২ সালের এপ্রিলে বিমান হামলা চালানোর পর আফগান তালেবান কড়া প্রতিবাদ জানায়, যা দুই দেশের বৈরী সম্পর্ককে আরও গভীর করে।

নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে পাক্তিকা প্রদেশে সামরিক অভিযান চালায় পাকিস্তান। এ অভিযানে প্রায় ৪৬ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন। এর বদলা নিতে ডিসেম্বরের শেষে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে হামলা চালায় তালেবান। পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হয় ২০২৫ সালের অক্টোবরে।

কাবুলে টিটিপি প্রধান নুর ওয়ালি মেহসুদকে টার্গেট করে হামলা চালানো হলে ভারত সফররত আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের এই কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন। তালেবান বর্তমানে ভারতের সঙ্গে উন্নয়নের নানা প্রকল্পে সম্পৃক্ত হতে চাচ্ছে, যা পাকিস্তানের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতও কাবুলে চালানো পাকিস্তানি বিমান হামলাকে বর্বর কাজ বলে অভিহিত করেছে।

আরও পড়ুন

উভয় দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে চলমান এই পাল্টাপাল্টি আঘাত ভবিষ্যতে বড় সংঘাতের রূপ নিতে পারে। পাকিস্তানে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে। শাহবাজ শরিফ ক্ষমতায় থাকলেও কারাবন্দী নেতা ইমরান খান জনগণের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের প্রাদেশিক সরকার এবং সাধারণ মানুষ ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করছে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার জনগণ নতুন করে আর কোনো সামরিক অপারেশন দেখতে চায় না। এই ত্রিমুখী চাপ সামলাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হয়তো বিদেশের মাটিতে শত্রুকে ঘায়েল করে নিজেদের সাফল্য প্রমাণের চেষ্টা করছে।

এই সমস্যা নিরসনে কেবল সামরিক আক্রমণই সমাধান নয়। ইসলামাবাদকে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং নিজেদের গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানোর দিকে মন দিতে হবে। জিরগা বা স্থানীয় নেতৃত্ব এবং ধর্মীয় আলেমদের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে সশস্ত্র চরমপন্থা থেকে দূরে রাখার সামাজিক কৌশলগুলো বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। চলমান উত্তেজনা নিরসন না হলে দুই দেশের জনগণের সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েই যাবে।

  • নাজির আহমেদ মীর গবেষক, হংকংয়ের রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ

  • মুনীব ইউসুফ সাউথ এশিয়া রিসার্চের উপসম্পাদক

    জ্যাকোবিন সাময়িকী থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত