একসময় বিদেশে চাকরির জন্য দালালকে খুঁজতে হতো গ্রামের বাজারে, চায়ের দোকানে, বাজারের মোড়ে কিংবা পরিচিত কারও উঠানে। এখন তাকে খুঁজতে হয় না, সে নিজেই এসে হাজির হয় স্মার্টফোনের পর্দায়। তার অফিসের সাইনবোর্ড নেই, ট্রেড লাইসেন্স দেখা যায় না, কখনো হয়তো নিজের আসল নামটিও জানা যায় না। আছে একটি ফেসবুক পেজ, কয়েকটি চকচকে ছবি, বিদেশি পতাকা, ‘ফ্রি ভিসা’, ‘নিশ্চিত চাকরি’, ‘মাসে এক লাখ টাকা বেতন’—আর আছে একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের পুরোনো দালালি তাই বিলীন হয়নি, বরং প্রযুক্তির সঙ্গে তার নতুন রূপ হয়েছে।
এই পরিবর্তনকে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার একটি গভীর দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। রাষ্ট্র এখনো অভিবাসনকে নিয়ন্ত্রণ করে মূলত কাগজপত্র, লাইসেন্স ও ভিসার মাধ্যমে, অথচ শ্রমিকের যাত্রা শুরু হচ্ছে এমন এক ডিজিটাল পরিসরে, যেখানে সেই নিয়ন্ত্রণের বড় অংশই অনুপস্থিত। ফলে দালাল ডিজিটাল হয়েছে, কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা সেই গতিতে বদলায়নি।
দালালের ফাঁদে বিদেশের স্বপ্ন
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ বিদেশে কাজের আশায় দেশ ছাড়েন। সরকারি হিসাবে প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ তরুণের মধ্যে ৮ থেকে ৯ লাখ তরুণকে বিদেশে কর্মসংস্থানের পথ খুঁজতে হয়। তাঁদের অনেকের বিদেশযাত্রার অর্থ আসে জমি বিক্রি, গয়না বন্ধক বা উচ্চ সুদের ঋণ থেকে। বিদেশে যাওয়ার খরচ এত বেশি যে অনেক শ্রমিককে সঞ্চয় শেষ করতে বা বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হয়। এই একটি তথ্যই ডিজিটাল দালালির গুরুত্ব বোঝার জন্য যথেষ্ট। একজন মানুষের ফেসবুকের পর্দায় দেখা একটি ‘চাকরির বিজ্ঞাপন’ আসলে একটি পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, সম্পদ ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিগত পাঁচ বছরে মালয়েশিয়ায় চাকরির নামে হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। তাঁদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছিল বিদেশে কারখানায় চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে। পত্রপত্রিকার সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লার কয়েক শ অভিবাসনপ্রত্যাশীর কথা উঠে এসেছে, যাঁরা ফেসবুকের মাধ্যমে সৌদি আরবে ‘ফ্রি ভিসা’র চাকরির প্রলোভনে পড়ে জনপ্রতি প্রায় চার থেকে ছয় লাখ টাকা দিয়েছেন। বিজ্ঞাপনে ছিল নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের লোগো, নকল স্বাক্ষর এবং বিশ্বাসযোগ্য দেখানোর মতো নানা উপাদান। পরে অনেকেই জানতে পারেন, তাঁদের ভিসা আসলে কাজের অনুমতিই নয়।
ইউটিউবের চমকপ্রদ ভিডিও দেখিয়ে সহজে ইউরোপে যাওয়ার পথ বুঝিয়ে ইউরোপে যাওয়ার জন্য দালালদের নেটওয়ার্কে ফেসবুক, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের গ্রুপ ব্যবহার করে ইউরোপে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব, যোগাযোগ ও যাত্রার তথ্য দেওয়া হয়। মানব পাচারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়; বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে পাঠানোর ক্ষেত্রেও ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ব্যবহারের কথা উঠে এসেছে বছর চারেক আগে প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
কয়েক সপ্তাহ আগে প্রথম আলোর আরেকটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ায় যাওয়ার পর এক দালালের প্রতারণার শিকার হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার যুবক কামরুল হাসান। পরে আরেক দালাল তাঁকে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা নেন। শেষ পর্যন্ত প্রতারণার মাধ্যমে তাঁকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয় বলে তাঁর পরিবারের অভিযোগ।
ডিজিটাল দালালও এখন ব্র্যান্ড
প্রযুক্তি প্রতারণাকে শুধু দ্রুত করেনি, তার পরিসর বদলে দিয়েছে। অতীতে গ্রামের দালালের ক্ষমতা ছিল সীমিত, সীমাবদ্ধতা ছিল তাঁর ভৌগোলিক পরিসর। তাঁকে চেনা যেত, তাঁর বাড়ি কোথায়, তা জানা যেত, তাঁর সঙ্গে কারা ওঠাবসা করেন, তা বোঝা যেত, তাঁর সামাজিক পরিচয় ছিল। ডিজিটাল দালালের কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই।
একটি ফেসবুক পোস্ট কয়েক ঘণ্টায় হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শত শত চাকরিপ্রার্থী ঢুকতে পারেন। একই ভুয়া নিয়োগপত্র, একই বিদেশি কোম্পানির লোগো, একই ‘সফল প্রবাসী’র ছবি অসংখ্য মানুষের কাছে পাঠানো যায়। অর্থাৎ প্রতারণা এখন আর ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা এখন বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার মতো একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ায় একটি ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হয়েছে।
আরও বিপজ্জনক বিষয় হলো ডিজিটাল দালাল নিজেকে দালাল বলে পরিচয় দেয় না। সে ‘রিক্রুটমেন্ট কনসালট্যান্ট’, ‘ভিসা প্রসেসিং এক্সপার্ট’, ‘ওভারসিজ জব সলিউশন’ কিংবা কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ‘অফিশিয়াল প্রতিনিধি’ হতে পারের। তার ফেসবুক পেজে হাজার হাজার অনুসারী থাকতে পারে, ইউটিউবে ভিডিও থাকতে পারে। থাকতে পারে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের ছবি, ভিডিও, প্রশংসাপত্র এবং কৃত্রিম সাফল্যের গল্প। ফলে প্রতারণা ও বৈধ নিয়োগের পার্থক্যটি প্রযুক্তিগত নয়, জ্ঞানগত।
দালাল স্মার্ট হয়েছে, রাষ্ট্রকেও স্মার্ট হতে হবে। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন যেন ফেসবুকের একটি পোস্টে শুরু হয়ে অকাল মৃত্যুতে কিংবা পরিবারের ঋণে শেষ না হয়—এটি শুধু শ্রমিকের সতর্কতার দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহির পরীক্ষা।
একজন অভিবাসনপ্রত্যাশী শ্রমিকের কাছে পার্থক্যটি ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যায়। এখানে আমরা একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে যাই—একজন বিদেশগামী শ্রমিকের কাছ থেকে কি সত্যিই আশা করা যায় যে তিনি নিজেই বুঝবেন কোন নিয়োগকর্তা বৈধ, কোন ভিসা আসল, কোন ওয়েবসাইট সত্যি এবং কোন নিয়োগপত্র ভুয়া?
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশযাত্রার অপেক্ষায় থাকা মানুষের বড় অংশের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি এবং তাঁদের অধিকাংশই আনুষ্ঠানিকভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির বদলে আত্মীয়, স্থানীয় দালাল, সাব-এজেন্ট ও অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করেন। এগুলোকে নিখুঁত জাতীয় পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি বড় প্রবণতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়, যেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পুরোনো দালালি নেটওয়ার্কের সঙ্গে মিশে প্রতারণার নতুন নতুন রূপ ও ব্র্যান্ড তৈরি করছে।
তথ্যের ফাঁকে দালালের ক্ষমতা
বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের একটি মৌলিক দুর্বলতা হলো তথ্যের অসমতা। কয়েক বছর আগের এক গবেষণায় বাংলাদেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ‘তথ্যের অসমতা’, বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক নিয়োগ খাতের ক্ষমতার আধিপত্য এবং ন্যায়বিচারে সীমিত প্রবেশাধিকারকে পরস্পর-সম্পর্কিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (তথ্যসূত্র: আইওএম, ২০২২)। ডিজিটাল দালাল এই তথ্যের অসমতাকেই পুঁজি করে।
অভিবাসনপ্রত্যাশী শ্রমিকের কাছে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন থাকলেও চাকরি, নিয়োগদাতা, বেতন, কাজের শর্ত বা ভিসার বৈধতা যাচাইয়ের তথ্য ও অভিজ্ঞতা তাঁর সীমিত, বিপরীতে দালাল জানে কোন তথ্য, ভিডিও বা নথি দেখালে বিশ্বাস তৈরি হবে এবং কত টাকার প্রলোভনে শ্রমিক রাজি হতে পারেন। এই তথ্যের অসমতাই ডিজিটাল দালালের বড় শক্তি—প্রযুক্তি তথ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়ালেও তথ্যের নিয়ন্ত্রণ একপক্ষের হাতে থাকলে তা নিরাপত্তার বদলে প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
তাই সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তির নয়, ক্ষমতারও। আগে দালালকে একে একে শ্রমিকের কাছে যেতে হতো, এখন একটি ভুয়া বিজ্ঞাপন, সাজানো ভিডিও বা নকল নথি মুহূর্তে শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। প্রযুক্তি নতুন করে প্রতারণার ক্ষমতা তৈরি করেনি, বরং পুরোনো ক্ষমতার বৈষম্যকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। শ্রমিককে নিরাপদ রাখতে তাই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও তাঁর হাতে দিতে হবে।
আইন বদলেছে, ফাঁদও বদলেছে
ফেসবুকে যোগাযোগ, হোয়াটসঅ্যাপে দর-কষাকষি, মোবাইল আর্থিক সেবায় টাকা পাঠানো—বিদেশযাত্রার দালালি এখন অনেকটাই ডিজিটাল। কিন্তু প্রতারিত হলে দায় কার? চাকরির ফেসবুক পেজ বন্ধ হয়ে গেলে, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর বদলে গেলে কিংবা টাকা নেওয়ার পর মধ্যস্থতাকারী উধাও হলে প্রতারিত শ্রমিক যাবেন কোথায়? ‘অভিযোগ করুন’ গোছের দায়সারা কথা বলা সহজ, কিন্তু প্রমাণ রাখা কঠিন। কথোপকথন মুছে গেলে, টাকা পাঠানো নম্বর বন্ধ হয়ে গেলে বা পেজটি রাতারাতি উধাও হলে দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা কঠিন। রাষ্ট্র অবশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা জোরদারের চেষ্টা করছে।
২০২৪ সালের সংশোধনের মাধ্যমে ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড মাইগ্র্যান্টস অ্যাক্ট-এ নিয়োগের সাব-এজেন্ট ও মধ্যস্থতাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের আচরণবিধিতেও সাব-এজেন্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রিক্রুটমেন্ট এজেন্টস ইনফরমেশন সিস্টেম (রেইমস)-এ দুই হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ নিয়োগব্যবস্থাকে নিয়ম ও নিবন্ধনের আওতায় আনার চেষ্টা রয়েছে।
কিন্তু আইন যতটা এগিয়েছে, ডিজিটাল বাস্তবতা তার চেয়ে দ্রুত বদলেছে। লাইসেন্স থাকা আর ডিজিটালভাবে জবাবদিহিমূলক হওয়া এক নয়। তাই এজেন্সি থেকে সাব-এজেন্ট, ফেসবুক পেজ থেকে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং বিজ্ঞাপন থেকে টাকা লেনদেন—পুরো চেইনকেই নজরদারিতে আনতে হবে।
বাংলাদেশের অভিবাসনব্যবস্থায় অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয় পুরোনো সংকট হলেও ডিজিটাল দালালি তা কমানোর বদলে ‘রেজিস্ট্রেশন’, ‘ভিসা প্রসেসিং’ বা ‘ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন’-এর মতো নানা নামে টাকা নেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি করছে। ২০২৫ সালের এডিবিআই, ওইসিডি ও আইএলওর যৌথ বিশ্লেষণেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের তুলনামূলক বেশি নিয়োগ ব্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে।
আইওএমের সাম্প্রতিক সতর্কতা ও তথ্য বলছে, অনলাইনের ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন শুধু অর্থ আত্মসাতের ফাঁদ নয়, কখনো তা মানুষকে পাচার ও জোরপূর্বক অপরাধে ব্যবহারের প্রথম দরজা হয়ে উঠছে।
তাহলে সমাধান কী
বিদেশযাত্রায় অনলাইন প্রতারণা তথা ডিজিটাল দালালের ফাঁদ ঠেকাতে কয়েকটি পদক্ষেপ অতি জরুরি। প্রথমত, সরকারকে ‘লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সি’ থেকে ‘যাচাইযোগ্য ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থা’র দিকে যেতে হবে। প্রতিটি বিদেশি চাকরির বিজ্ঞাপনের জন্য একটি ইউনিক সরকারি আইডি থাকা উচিত। সেই আইডি ছাড়া কোনো বিজ্ঞাপন বৈধ নয়। শ্রমিক ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে বিজ্ঞাপন দেখলে সরকারি একটি প্ল্যাটফর্মে গিয়ে কয়েক সেকেন্ডে জানতে পারবেন চাকরিটি সত্যি কি না, নিয়োগকর্তা কে, বেতন কত, ভিসার ধরন কী, মোট খরচ কত এবং কোন এজেন্সি দায়ী।
দ্বিতীয়ত, শুধু শ্রমিককে ‘সচেতন’ করার পুরোনো পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। যে রাষ্ট্র শ্রমিকের কাছ থেকে পাসপোর্ট, মেডিক্যাল, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও ভিসার কাগজ চায়, সেই রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব শ্রমিককে প্রতারণামুক্ত তথ্য দেওয়া। সব দায় শ্রমিকের ডিজিটাল সাক্ষরতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া আসলে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতাকে আড়াল করা।
তৃতীয়ত, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ বড় প্ল্যাটফর্মগুলোরও দায় আছে।
বাংলাদেশে বিদেশি চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা সংগ্রহকারী অ্যাকাউন্ট বা পেজ শনাক্ত ও রিপোর্ট করার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের কার্যকর সমন্বয় দরকার। শুধু প্রতারণার শিকার হওয়ার পর অভিযোগ গ্রহণ করলে হবে না, প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন ছড়ানোর আগেই তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা দরকার।
আমাদের ভাষাটাও বদলাতে হবে। আমরা প্রায়ই বলি, ‘দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।’ এই ভাষা সাবধানে ব্যবহার করা দরকার। কারণ, একজন শ্রমিক প্রতারণা খুঁজতে বিদেশে যেতে চান না। তিনি একটি চাকরি খুঁজতে চান। দালাল তাই শুধু একজন ব্যক্তি নয়, দালাল একটি ব্যবস্থার ফাঁক। আগে সেই ফাঁক ছিল গ্রামের বাজারে। এখন সেটি ফেসবুকের নিউজফিডে। আগে দালালের হাতে ছিল একটি মুঠোফোন, এখন তার হাতে আছে অ্যালগরিদম, হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষমতা এবং কয়েক মিনিটে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সুবিধা।
সবশেষে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ডিজিটালভাবে অভিবাসনব্যবস্থা আধুনিক করার পথে এগিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি যদি শুধু দালালের নাগাল বাড়ায়, আর শ্রমিকের নিরাপত্তা না বাড়ায়, তবে সেটি আধুনিকায়ন নয়, পুরোনো শোষণের নতুন অবকাঠামো। ফেসবুকে একটি চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে একজন তরুণ যখন বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর হাতে থাকে একটি স্মার্টফোন। কিন্তু তাঁর পেছনে থাকে একটি পরিবার, একটি ঋণ এবং একটি ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্ব শুধু তাঁর একার নয়।
দালাল স্মার্ট হয়েছে, রাষ্ট্রকেও স্মার্ট হতে হবে। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন যেন ফেসবুকের একটি পোস্টে শুরু হয়ে অকাল মৃত্যুতে কিংবা পরিবারের ঋণে শেষ না হয়—এটি শুধু শ্রমিকের সতর্কতার দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহির পরীক্ষা।
ড. সেলিম রেজা সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
* মতামত লেখকের নিজস্ব
