জার্মানিতে সম্প্রতি তিনটি আঞ্চলিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি রাজ্যের ফলাফল ভিন্ন হলেও বেশির ভাগ গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে এককথায় উপস্থাপন করা হয়েছে: ‘চরম ডানপন্থীদের কাছে হেরে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে জার্মানির চ্যান্সেলর’।
২০১৬ সালে ব্রেক্সিট ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই ইউরোপের রাজনীতি নিয়ে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি হয়ে গেছে, ‘উত্থানমুখী চরম ডানপন্থীদের চাপে কোণঠাসা মূলধারার দলগুলো।’ তবে এই নির্বাচনগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ইউরোপের রাজনীতিকে এভাবে সরলীকরণ করা কেবল জটিল বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং ‘গণতন্ত্রের অন্তিমকাল’–সংক্রান্ত একধরনের হতাশাবাদী সুর উসকে দেয়।
গত ৬ সেপ্টেম্বর স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচন আন্তর্জাতিক সংবাদের শিরোনাম হয়েছিল—জার্মানির ইতিহাস, অর্থনীতি ও ইউরোপে তার অবস্থান বিবেচনা করলে যা খুবই স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো মাসজুড়ে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল যে উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) হয়তো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে। দলটি রেকর্ড ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে কাছাকাছি পৌঁছে গেলেও শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করতে পারেনি, যদিও বাম রক্ষণশীল দল জাহরা ওয়াগেনকনেখট অ্যালিয়েন্সের অবস্থান তাদের অনুকূলেই ছিল।
এর দুই সপ্তাহ পর, মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন রাজ্যের নির্বাচনে এএফডি আবারও ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে। তবে এবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আগ্রহ কিছুটা কম ছিল। হয়তো এটি পরপর হওয়া তিনটি ভোটের দ্বিতীয়টি বলে, অথবা দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি না পৌঁছানোর কারণে। তা ছাড়া উগ্র ডানপন্থীদের এই সাফল্য ঢাকা পড়ে গিয়েছিল চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) শোচনীয় পরাজয়ের আড়ালে।
জার্মানির ফেডারেল প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে এই প্রথম দলটি কোনো রাজ্য সংসদে প্রবেশ করতেই ব্যর্থ হলো। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসপিডি) তুলনামূলক কম ক্ষতি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাই হয়নি।
সর্বশেষ, একই দিনে বার্লিন রাজ্য নির্বাচনে চমকপ্রদ জয় পায় বামপন্থী দল ডি লিংক (দ্য লেফট)। তারা এএফডির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ নতুন ভোট অর্জন করে, যেখানে এএফডি তৃতীয় স্থানে নেমে যায়। বার্লিন এখন তুর্কি রাজনৈতিক শরণার্থীদের কন্যা এলিফ এরাল্পের নেতৃত্বে একটি বাম-গ্রিনস-এসপিডি জোটের মাধ্যমে শাসিত হওয়ার পথে।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তরুণীদের এক বিশাল অংশ (৫৪ শতাংশ) এই ‘উগ্র বাম’ দলকে ভোট দিয়েছে। তরুণীদের মধ্যে বাম রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার এই ঝোঁক বেশির ভাগ গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা টানা এড়িয়ে যাচ্ছেন।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনকে যেভাবে পুরো জার্মানি, তথা ইউরোপের চিত্র হিসেবে সাধারণীকরণ করা হয়েছিল, বার্লিনের নির্বাচনকে সেভাবে দেখা হয়নি। এটিকে কেবল একটি রাজধানী বা কসমোপলিটান শহরের গল্প বানিয়ে খাটো করা হয়েছে—যেন এটি কেবল উচ্চশিক্ষিত প্রগতিশীল ও অভিবাসীদের শহর। অথচ স্যাক্সনি-আনহাল্টের জনসংখ্যা ২১ লাখ, যা বার্লিনের প্রায় অর্ধেক এবং সেখানকার বাসিন্দারা বয়স্ক ও শ্বেতাঙ্গপ্রধান।
তা ছাড়া মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন—যা বার্লিনের চেয়ে স্যাক্সনি-আনহাল্টের সঙ্গেই বেশি মেলে—সেখানেও কিন্তু একটি বাম-গ্রিন জোট সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে, যা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাই নেই।
এর মানে এই নয় যে জার্মানির উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান বা মূলধারার দলগুলোর পরাজয় উদ্বেগজনক নয়; কিন্তু সেটাই এই নির্বাচনের একমাত্র চিত্র নয়। প্রকৃতপক্ষে, তিনটি রাজ্যের দুটিতে বামপন্থী সরকার গঠিত হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। কারণ, বর্তমান ইউরোপে স্রেফ বামপন্থী সরকার গঠিত হওয়া খুবই বিরল। সুইডেনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা দেখা গেছে—যখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাম জোট সরকার গঠন করতে যাচ্ছে এবং উগ্র ডানপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটস সরকারে আসছে না, তখনই বৈশ্বিক গণমাধ্যমের আগ্রহ উবে যায়।
রাজনীতির জটিলতাকে কেবল ‘চাপের মুখে থাকা মূলধারা বনাম আত্মবিশ্বাসী উগ্র ডানপন্থী’র লড়াই হিসেবে দেখা ঝুঁকিপূর্ণ। এটি বড় বড় শহরের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক রূপান্তরকে উপেক্ষা করে—যেখানে বহুসংস্কৃতির ভোটাররা ডানপন্থার বদলে বামপন্থার দিকে ঝুঁকেছেন (যেমনটি সম্প্রতি কোপেনহেগেন কিংবা নিউইয়র্কেও দেখা গেছে)।
আরও বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই বয়ান চরম ডানপন্থীদের পপুলিস্ট এজেন্ডাকেই সাহায্য করে—যা রাজনীতিকে কেবল ‘অভিজাত শ্রেণি’ (সব মূলধারার দল) বনাম ‘জনসাধারণ’–এর (যাদের প্রতিনিধি দাবি করে উগ্র ডানপন্থীরা) দ্বন্দ্ব হিসেবে তুলে ধরে।
একইভাবে, অনেক গণমাধ্যম সিডিইউ নেতা মার্জের ব্যবহৃত ‘হর্সশু থিওরি’ সানন্দে গ্রহণ করেছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, লিবারেল-ডেমোক্রেটিক মূলধারা মূলত দুই পাশ; অর্থাৎ উগ্র ডান ও উগ্র বাম থেকে একযোগে চাপে পড়েছে। তবে এটি দুটি ভিন্নমাত্রার সংকটকে এক করে ফেলে। এটা সত্য যে ঐতিহ্যবাহী দলগুলো নতুন দলগুলোর কাছে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা প্রথাগত ডান বা বাম দলকে এড়িয়ে চলছেন। তবে এই ধারায় গ্রিনসের মতো লিবারেল ডেমোক্রেটিক দলগুলোও রয়েছে।
উগ্র ডান এবং তথাকথিত উগ্র বাম—উভয়েই মূলধারার দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলেও, কেবল উগ্র ডানপন্থীরাই উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
তা ছাড়া উগ্র ডানপন্থীরা যেখানে লিবারেল গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি এবং এএফডি সরাসরি গণতন্ত্রের জন্যই হুমকি, সেখানে তথাকথিত উগ্র বাম দলগুলো সেভাবে হুমকি নয়। ডি লিংকের মতো দলগুলো সাবেক কমিউনিস্ট পার্টি হলেও সময়ের সঙ্গে অনেক বেশি সহনশীল হয়েছে। তাদের আদর্শিক অবস্থান বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রের চেয়ে ১৯৭০-এর দশকের সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সঙ্গেই বেশি মেলে।
সুতরাং উগ্র ডান এবং তথাকথিত উগ্র বাম—উভয়েই মূলধারার দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলেও, কেবল উগ্র ডানপন্থীরাই উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল অস্তিত্বের জন্য হুমকি। মার্জের মতো প্রথাগত রাজনীতিবিদদের জন্য লিবারেল গণতন্ত্র ও নিজেদের প্রথাগত দলকে এক করে দেখানো রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু গণমাধ্যমের উচিত নয় অন্ধভাবে তা মেনে নেওয়া।
জরিপগুলো বারবার আমেরিকার রাজনৈতিক বিজ্ঞানী রবার্ট ডাহলের সেই ‘ডেমোক্রেটিক প্যারাডক্স’ বা গণতান্ত্রিক বৈপরীত্যকেই তুলে ধরছে—যেখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা প্রবল, কিন্তু বিদ্যমান বাস্তব গণতন্ত্রের পারফরম্যান্স নিয়ে ক্ষোভও চরম।
রাজনীতির এই বহুমাত্রিকতাকে উন্মোচিত করার মাধ্যমেই কেবল উগ্র ডানপন্থীদের ‘অভিজাত বনাম উগ্র ডান’ দ্বিবিভাজন এবং হতাশাবাদী ‘গণতন্ত্রের বিনাশ’–সংক্রান্ত বয়ানকে দুর্বল করা সম্ভব। আশা করা যায়, এটি পুরোনো ও নতুন লিবারেল ডেমোক্রেটিক দলগুলোকে একটু নিশ্বাস ফেলার সুযোগ দেবে, যাতে তারা প্রথাগত ভোটারদের একই পুরোনো বুলি না শুনিয়ে, গণতন্ত্রের প্রতি ক্ষুব্ধ কিন্তু আস্থাশীল তরুণ ও বিচিত্র জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত ও প্রতিনিধিত্ব করার সাহস পায়।
কাস মুডে জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক অধ্যাপক এবং দ্য ফার রাইট টুডে গ্রন্থের লেখক। দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।