এই প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহাবস্থানের খোঁজে সি-ট্রাম্প

মে মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প–সি চিন পিংয়ের বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেছবি: রয়টার্স

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর দুই দেশের সম্পর্ক যেন আবার কিছুটা স্থিতিশীলতার দিকে ফিরছে।

উভয় পক্ষই একটি ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতার সম্পর্ক’ গড়ে তোলার কথা বলেছে। মতভেদ যে মিটে গেছে, তা নয়। কিন্তু দুই দেশই এখন বুঝতে শুরু করেছে, এই দ্বন্দ্ব যদি লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে তার মূল্য অনেক বেশি; ঝুঁকিও বড়। তাই তারা এ বিষয়ে একমত যে প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে তা কিছু নিয়মের মধ্যে; বিরোধ থাকবে, তবে তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

এ উপলব্ধির পেছনে রয়েছে শক্তিশালী কৌশলগত যুক্তি। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ‘পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস’ ধারণা সরাসরি যুদ্ধ ঠেকিয়ে রেখেছিল। দুই দেশই একে অপরকে বিশ্বাস করত না, কিন্তু তারা জানত—পরমাণু শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে শেষ পর্যন্ত কেউই জিতবে না।

আরও পড়ুন

আজকের যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কেও একধরনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যদিও তা অর্থনীতির ক্ষেত্রে। অবশ্য অর্থনৈতিক নির্ভরতা পরমাণু প্রতিরোধের মতো নয় এবং এর ঝুঁকিও ততটা ভয়াবহ নয়। তবু বিশ্বায়নের এই যুগে, যেখানে উৎপাদন ও বাণিজ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তৈরি হয়েছে ‘পারস্পরিক নিশ্চিত অর্থনৈতিক ক্ষতি’র সম্পর্ক। অর্থাৎ যদি এক দেশ অন্য দেশকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করতে চায়, সরবরাহশৃঙ্খল ভেঙে দেয় বা চরম চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে সেই আঘাত তার নিজের অর্থনীতিকেও সমানভাবে আঘাত করবে। এতে দুই দেশেরই শিল্প, ভোক্তা ও আর্থিক বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ বাস্তবতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ইতিহাসে দেখা যায়, যুদ্ধের আগে দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক খুব বেশি গভীর ছিল না। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাণিজ্য বাড়লেও তা ছিল মূলত ভিন্ন ভিন্ন খাতের মধ্যে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ধীরে ধীরে একই খাতের মধ্যে বাণিজ্য বাড়তে থাকে। আর এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক সেই সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে—এটি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক গভীর ও বিস্তৃত।

সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈঠকের গুরুত্ব এখানেই। দুই দেশই বুঝতে পেরেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত দুই পরমাণু শক্তির জন্য দ্বন্দ্ব বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হতে পারে না।

২০২০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন শুধু একে অপরের মধ্যে পণ্য কেনাবেচা করছে না। তাদের অর্থনীতি একই উৎপাদনব্যবস্থা, উদ্ভাবন নেটওয়ার্ক ও আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। ফলে দ্বিপক্ষীয় দ্বন্দ্ব বাড়ানো মানে নিজের জন্যই বড় ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করা।

অবশ্য অর্থনৈতিক নির্ভরতা যুদ্ধকে পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না। কিন্তু এটি যুদ্ধের খরচ এতটাই বাড়িয়ে দেয় যে সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এটি একধরনের নিরাপত্তাবলয় বা স্থিতিশীলতার উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে শর্ত একটাই, দেশগুলোকে কিছু মৌলিক সীমা মেনে চলতে হবে, যোগাযোগের পথ খোলা রাখতে হবে এবং ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি এড়াতে হবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, কোথায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। যুদ্ধের আগে ইউরোপ ও রাশিয়ার মধ্যে জ্বালানিবাণিজ্যের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবু সেই সম্পর্ক যুদ্ধ ঠেকাতে পারেনি। কারণ, এই নির্ভরতা ছিল এক খাতে সীমাবদ্ধ, কাঠামোগতভাবে অসম এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলে সহজেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। এখান থেকে শিক্ষা হলো—অর্থনৈতিক নির্ভরতা অকার্যকর নয়, কিন্তু সেটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হতে হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক দেশ ঝুঁকি কমানো, সরবরাহশৃঙ্খল সুরক্ষা এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতার ওপর জোর দিচ্ছে। এর পেছনে যুক্তিও রয়েছে। মহামারি, নতুন যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধ—সব মিলিয়ে বিশ্বায়নের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু যদি প্রতিটি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এক ধরনের বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে আরেক ধরনের বড় বিপদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা শেষ পর্যন্ত পুরো বিচ্ছিন্নতায় রূপ নিতে পারে আর সরবরাহশৃঙ্খল রক্ষার প্রয়াস বিশ্বকে বিভক্ত শিবিরে ঠেলে দিতে পারে।

একটি খণ্ডিত বিশ্ব মোটেই নিরাপদ হবে না। বড় শক্তিগুলোর ওপর একে অপরের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে আর সংঘাতের আশঙ্কা বাড়বে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত, নির্ভরতা শেষ করা নয়; বরং সেটিকে আরও নিরাপদ, ভারসাম্যপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে তোলা। অর্থাৎ স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে হবে, তবে খোলামেলাভাব বজায় রেখে; প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে সহযোগিতাও চালিয়ে যেতে হবে; মতভেদ থাকবে, তবু যোগাযোগ বন্ধ করা যাবে না। ঝুঁকি কমানোরও সীমা থাকা উচিত, নিরাপত্তানীতি হতে হবে পরিমিত আর কৌশলগত প্রতিযোগিতারও কিছু সীমানা থাকা প্রয়োজন।

এই ধারণা প্রাচীন চীনা দর্শনের সেই মূলনীতির সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে বলা হয়েছে, ‘সামঞ্জস্য থাকবে, কিন্তু অভিন্ন রূপ নয়।’ এর অর্থ হলো, ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন সংঘাতে না গড়ায়। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও এ ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা দরকার, যেখানে ভিন্ন রাজনৈতিক পদ্ধতি, উন্নয়নের পথ এবং স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও বড় শক্তিগুলো একই কাঠামোর মধ্যে সহাবস্থান করতে পারে।

সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈঠকের গুরুত্ব এখানেই। দুই দেশই বুঝতে পেরেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত দুই পরমাণু শক্তির জন্য দ্বন্দ্ব বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হতে পারে না। ভবিষ্যতেও প্রতিযোগিতা থাকবে, টানাপোড়েন থাকবে। কিন্তু যদি সেই প্রতিযোগিতাকে নিয়মের মধ্যে রাখা যায়, নিরাপত্তা–উদ্বেগকে সীমার মধ্যে রাখা যায় এবং পারস্পরিক নির্ভরতাকে অস্ত্র না বানিয়ে স্থিতিশীলতার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে শান্তির একটি ভিত্তি তৈরি হবে।

  • সিয়ুয়ান শু চীনা সমাজবিজ্ঞান একাডেমির একজন জ্যেষ্ঠ গবেষক

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত