নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হয়ে গেছে। মাত্র ১২ দিন বাকি। সরকারের প্রধান নির্বাহী বলছেন, এবারের নির্বাচন হবে সেরা নির্বাচন। আমরা এটা নিয়ে গর্ব করব। নির্বাচন হবে উৎসবমুখর পরিবেশে। তারপরও মানুষ স্বস্তিতে নেই।
নির্বাচন এলেই মানুষ আতঙ্কে পড়ে যান। রাস্তাঘাটে সমাবেশ, মিছিল, মোটরবাইক ও গাড়ি নিয়ে লম্বা শোভাযাত্রা আর লাউড স্পিকারে চেঁচামেচি। চোখ খুলে নেব, জানে মেরে ফেলব—এসব হুংকার শোনা যাচ্ছে। এসব দেখে মনে হয় না, ২০২৪ সালে এ দেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে গণবিদ্রোহ হয়েছিল। মনে হয়, এ বিদ্রোহ শুধু সরকার বদলের জন্য হয়েছিল; সমাজ বদলের জন্য নয়। তা না হলে রাজনীতিবিদদের মুখের ভাষা কীভাবে থেকে যায় অবিকল, সেই আগের মতন।
বিভিন্ন জায়গায় গোলমাল হচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকদের মধ্যে বচসা থেকে মারামারি, সবই হচ্ছে। গোলমালের উসকানি দিতে কেউ কারও চেয়ে কম যান না।
সবচেয়ে হতাশার ব্যাপারটি হচ্ছে, আগেই তো ভালো ছিলাম—এই ধারণা ও বিশ্বাস কারও কারও মনে ক্রমে চেপে বসছে। তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পতিত সরকারকে গালি দিয়েও এই প্রবণতা ঠেকানো যাচ্ছে না। আগের সরকার যেমন সবকিছুতেই ষড়যন্ত্র খুঁজত, অন্তর্বর্তী সরকারের জমানায়ও কেউ কেউ ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
আমাদের দেশের রাজনীতি অতীতচারী। পঞ্চাশ বছর আগে আমরা হেন করেছিলাম, পঁচিশ বছর আগে আমরা তেমন করেছিলাম, পনেরো বছর ধরে আমরাই তো ছিলাম ‘ভ্যানগার্ড’—এসব নিয়ে চলছে ইতিহাসের জাবরকাটা এবং একই সঙ্গে জারি আছে শব্দযুদ্ধ। কেউ একটি শব্দবাণ মারল, অমনি তার জবাবে আরও কঠিন কঠোর কিছু বিষ মুখ দিয়ে উগরে দেওয়া।
নির্বাচনী আচরণবিধি বলে কিছু কথা আছে। নির্বাচন কমিশনের কর্তারা এ নিয়ে মাঝেমধ্যে দু-চার কথা বলেন। তাঁদের কথা কারও কানে মধুবর্ষণ করে না। অনেকটা যাত্রার বিবেকের মতো বলে যাওয়া। কিন্তু কাজ হয় না। রোজই আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ শোনা যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখি, কমিশন প্রার্থীদের সাবধান করে দেয়। কেউ কেউ জরিমানাও দিচ্ছেন। তাতে খুব একটা কাজ হচ্ছে বলে মনে হয় না।
বিভিন্ন মতের নেতা ও প্রার্থীরা কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন। তাঁদের কথাবার্তায় ফুটে উঠছে তাঁদের ব্যক্তিগত ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষা ও রুচি। অতীতের মতো এবারও ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ হতে পারে বলে আশঙ্কা জানিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন তাঁরা। বক্তৃতা-বিবৃতিতে তাঁরা একটা কথা বোঝানোর চেষ্টা করছেন, কোনো কোনো দল এবার নির্বাচন ‘ম্যানিপুলেট’ করতে পারে। এটা আমাদের ২০১৮ সালের নিশিভোটের কথা মনে করিয়ে দেয়।
২২ জানুয়ারি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মাঠে এক সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘এবার তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে জামাতে ফজরের নামাজ পড়ে তারপর সাতটায় গিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, এবারের ভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ আরেকটি জনসভায় স্পষ্টতই জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘যারা নিরীহ মা–বোনদের বিভ্রান্ত করে এনআইডি নম্বর নিচ্ছে, বিভিন্ন কথাবার্তা বলছে, তারা একাত্তরে যে আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে, সে সময় তাদের একটি ভূমিকা ছিল। লাখ লাখ মা–বোনের সম্মানহানি হয়েছিল সেদিন। তারা কী জিনিস, বাংলাদেশের মানুষ দেখে ফেলেছে।’
জামায়াতও ছেড়ে কথা বলছে না। মাগুরায় ২৬ জানুয়ারি এক পথসভায় দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আপনারা চারদিকে খেয়াল রাখবেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন কোনো চিল ছোঁ মেরে ভোট নিয়ে যাবে, তা হবে না।’ ঝালকাঠিতে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘বিগত দিনের মতো যদি কেউ ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং বা কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করে, তবে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।’ ২৭ জানুয়ারি সকালে যশোর ঈদগাহ ময়দানে এক জনসভায় তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে নতুন রাজনীতি নিয়ে আসব, যেখানে পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি থাকবে না।’
২৬ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরে এক সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তারেক রহমানের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘বলা হচ্ছে তাহাজ্জুদ নামাজের পর ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে। তাহাজ্জুদের পরেই তারা সিল মারার পরিকল্পনা করছে। ভোটকেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা করছে। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের নেতা-কর্মীরা এসব ষড়যন্ত্র রুখে দেবেন।’
কারও কারও কথায় সাধারণ সৌজন্যবোধের অভাব চোখে পড়ার মতন। প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে গিয়ে তাঁরা প্রায়ই পরিমিতিবোধ হারিয়ে ফেলছেন। ব্যবহার করছেন এমন সব শব্দ ও বাক্য, যা শালীনতার স্বাভাবিক দেয়াল অতিক্রম করে যায়। শব্দবাণে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করার জন্য এ রকম কলতলার ঝগড়া এখন কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার নমুনা দেখেছি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক খবরে।
২৪ জানুয়ারি রাতে বরগুনার পাথরঘাটার কাটাখালী এলাকায় বরগুনা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সুলতান আহমেদের একটি নির্বাচনী জনসভায় ডাকসুর সাবেক অবস্থান সম্পর্কে বিষোদ্গার করতে গিয়ে বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. শামীম আহসান এক পর্যায়ে বলেন, ‘আমরা দেখছি, ডাকসু নির্বাচনের পরে, যে ডাকসু মাদকের আড্ডা ছিল, যে ডাকসু বেশ্যাখানা ছিল, সেটা ইসলামী ছাত্রশিবির পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। তাই এই বাংলাদেশ থেকে সকল প্রকার অন্যায়, সকল প্রকার চাঁদাবাজ, সকল প্রকার দুর্নীতি উৎখাত করতে জামায়াতে ইসলামী সক্ষম।’
আমরা জানি, ডাকসুর সাম্প্রতিক নির্বাচনে জামায়াতের অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির জয় পেয়েছে। তাদের জয়ের পেছনে নানা কারণ আছে। কিন্তু তাই বলে এর আগের ডাকসুতে জয় পাওয়া সংগঠনগুলো সম্পর্কে এমন মন্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত, প্রগল্ভ ও রুচিহীন। অথচ জামায়াত দাবি করে, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রাজনীতি করে। এ–ই তার নমুনা!
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী। ২৭ জানুয়ারি ঢাকার হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজে একটি পিঠা উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দিতে গেলে তাঁর ওপর হামলা হয়। তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে এই হামলা করেছে। মির্জা আব্বাসের নির্দেশে তারেক রহমানের সম্মতিতে এই ঘটনা ঘটেছে। একদিকে মঞ্চে উঠে ভালো ভালো কথা বলবেন, অন্যদিকে বিরোধীদের সন্ত্রাসী কায়দায় দমন করবেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুনর্বাসন করবেন, সেটি হতে দেব না।’ উল্লেখ্য, তাঁর ওপর ডিম ছুড়ে মারার এটি দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় সিদ্ধেশ্বরীর গোল্ডেন প্লাজা গলি এলাকায় তাঁর নির্বাচনী প্রচারের পথসভায় ময়লা পানি ও ডিম ছোড়া হয়। এ ঘটনার জন্য তখন তিনি চাঁদাবাজদের দায়ী করেছিলেন। এনসিপি নেতারা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন, বিএনপির লোকেরা চাঁদাবাজি করে বেড়ায়।
এর মধ্যেও আমরা ব্যতিক্রম দেখি। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা মনে করেন, মানুষ ভোট দেন বিশ্বাস থেকে। মানুষের আস্থাই হলো শক্তি; ভাড়া করা মানুষ নিয়ে মিছিল বা কান ঝালাপালা করে দেওয়া মাইকিং নয়। ২৬ জানুয়ারি রাতে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, এই নির্বাচনে যদি দেখিয়ে দেওয়া যায় যে কান ঝালাপালা করা মাইকিং না করে, পোস্টার দিয়ে শহর জঞ্জাল না করে, কোটি টাকা খরচ করে শোডাউন না দিয়েও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী জিততে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে এমন অনেকেই রাজনীতিতে আসবেন, যাঁদের টাকা বা পেশিশক্তি নেই; কিন্তু দেশ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ও যোগ্যতা আছে। আর তখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের পুরোনো চর্চা বাদ দিতে বাধ্য হবে।
● মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব