ইরান যুদ্ধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য বাড়ার সংকটে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সরগরম, তখন নীরবে প্রায় আড়ালেই থেকে গেল একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি মতামত। মার্কিন বিচার বিভাগের একটি শাখা বলেছে, প্রেসিডেন্টের নথি সংরক্ষণ–সম্পর্কিত ১৯৭৮ সালের আইনটি সংবিধানসম্মত নয়; অর্থাৎ তারা মনে করে, এই আইন মানার বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু একজন ফেডারেল বিচারক উল্টো সিদ্ধান্ত দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে সেই আইন মানতে বলেছেন।
ফলে এখন একধরনের সংঘাত তৈরি হয়েছে—একদিকে সরকারের আইনি ব্যাখ্যা, অন্যদিকে আদালতের নির্দেশ। এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত বড় আদালতে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই আইনের জন্ম ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর। সেই সময় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন নিজের গোপন টেপ রেকর্ডিং এবং হোয়াইট হাউসের নথিপত্রকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে দাবি করেছিলেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই আইন স্পষ্ট করে দেয় প্রেসিডেন্টের নথি আসলে জনগণের সম্পত্তি।
প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এই আইনের জোরে ক্ষমতা ছাড়ার সময় কোনো প্রশাসন সরকারি নথি ধ্বংস করতে বা ব্যক্তিগতভাবে রেখে দিতে পারেনি। কিন্তু বিচার বিভাগের এই নতুন মতামত কার্যকর হলে সেই দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে পারে। শুধু তা–ই নয়, প্রেসিডেন্ট বা তাঁর টিমের ওপর প্রযোজ্য নৈতিকতা–সংক্রান্ত নিয়ম, তথ্য প্রকাশের আইন এবং বিভিন্ন রিপোর্টিংয়ের বাধ্যবাধকতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এখানেই শেষ নয়। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ২০২০ সালের এক মামলার রায়কে সামনে এনে বলা হয়েছে, কংগ্রেস নির্দিষ্ট আইনগত উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। কিন্তু সেই মামলা ছিল প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত কর নথি নিয়ে, কোনো সাধারণ আইনের বৈধতা নিয়ে নয়। ফলে এই উদাহরণ এখানে প্রযোজ্য নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংবিধানের ‘নেসেসারি অ্যান্ড প্রপার ক্লজ’। এই ধারার মাধ্যমে কংগ্রেসকে প্রয়োজনীয় আইন তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। দুই শতাব্দীর বেশি আগে সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে, সরকার পরিচালনা, নথি সংরক্ষণ এবং আর্কাইভ গড়ে তোলার জন্য কংগ্রেস প্রয়োজনীয় কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে।
বিচার বিভাগের আরেকটি অদ্ভুত যুক্তি হলো, নথি সংরক্ষণের একমাত্র উপায় হলো সাবপোনা বা সমন জারি করা; অর্থাৎ কংগ্রেস যদি উপযুক্ত পরিস্থিতিতে সমন জারি করে, তবেই নথি ধ্বংস সাময়িকভাবে আটকানো যেতে পারে। কিন্তু এই যুক্তি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, আগে থেকেই নথি সংরক্ষিত না থাকলে, সমন জারি করেও কোনো লাভ নেই। মনে রাখতে হবে, নিক্সনের নথি ধ্বংসের চেষ্টার কারণেই এই আইন তৈরি হয়েছিল। এখানেই থেমে থাকেনি সমালোচনা। ১৯৭০–এর এক গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়, যা নিক্সনের নথি সংরক্ষণ আইনের বৈধতা নিশ্চিত করেছিল, তাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এই মতামত।
বাস্তবে ইতিহাস অন্য কথা বলে। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বরাবরই নানা কাঠামোগত আইনের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়েছে—হোক তা নিরাপত্তা–সংক্রান্ত শ্রেণিবিভাগ বা তথ্য প্রকাশের নিয়ম। এমনকি এক পুরোনো মামলায় সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের এমন এক পদক্ষেপ বাতিল করেছিল, যা আইনের সীমা অতিক্রম করেছিল। তার থেকেও বড় কথা, এই আইন প্রেসিডেন্টকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে বাধ্য করে না, শুধু নথি সংরক্ষণের একটি ব্যবস্থা তৈরি করে।
শেষে বিচার বিভাগের দাবি—এই আইন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, নির্বাহী গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং প্রশাসনিক চাপ বাড়াতে পারে। কিন্তু এই সব যুক্তিই অতীতে সুপ্রিম কোর্ট বহুবার খারিজ করেছেন।
এই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি ভুল ধারণা। সেটি হলো সংবিধান নাকি প্রেসিডেন্টের স্বাধীনতা ও ক্ষমতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। বাস্তবে তা নয়। সংবিধানপ্রণেতারা ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে একক আধিপত্যের জায়গা নেই। প্রেসিডেন্টের নথি সংরক্ষণ সেই ভারসাম্যেরই অংশ—এটি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে এবং সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে।
মার্ক জে রোজেল জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কার স্কুল অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নমেন্টের ডিন
মিচেল এ সলেনবার্গার মিশিগান-ডিয়ারবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত