হুতির হামলায় মক্কা চুক্তি কি কার্যকর হবে

হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেনের সরকারনিয়ন্ত্রিত কয়েকটি অঞ্চল দখলে নিয়েছেছবি: এএফপি

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা মোখা বন্দর দখল করেছে এবং এখন বাব আল–মানদেব প্রণালির মূল নৌপথ নিয়ন্ত্রণের হুমকি দিচ্ছে। তারা সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি শহরেও হামলা চালিয়েছে, যার ফলে নারী–শিশুসহ প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছে। সৌদি আরবের জ্বালানি, বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার পাশাপাশি ইরান ও তার ইয়েমেনি সহযোগী হুতিদের সামুদ্রিক অবরোধের কারণে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ সচল হওয়ার বিষয়টি সরাসরি সামনে চলে এসেছে।

সৌদি আরবে হুতিদের হামলা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে সক্রিয় করতে পারে। আর যদি তা হয়, তাহলে পাকিস্তান ও তুরস্কের পদক্ষেপ বা হস্তক্ষেপ ঠিক কেমন হতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন।

উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইঙ্গিত দিয়ে আসছে যে তারা চায় আঞ্চলিক দেশগুলো তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব নিজেরাই নিক; সে ক্ষেত্রে মার্কিন সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা থাকবে সীমিত। মাঠপর্যায়ে ইতিমধ্যে সে অবস্থানের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক অংশীদারদের জন্য সর্বাত্মক প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি।

আরও পড়ুন

মার্কিন উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক বোঝা ভাগ করে নেওয়ার তাগিদের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোকে একটি নতুন প্রতিরক্ষাকাঠামোর দিকে নজর দিতে হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান তাদের প্রথম পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। চলতি বছরের আগস্টে তুরস্ক যুক্ত হওয়ার পর এটি বিস্তৃত হয়ে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ রূপ নেয়।

তিনটি দেশ ইতিমধ্যে রিয়াাদে তাদের যৌথ সচিবালয় স্থাপন করেছে, যার প্রথম তিন বছরের মেয়াদে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছে পাকিস্তান। তবে চুক্তিটি এখনো এর প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কোনো সদস্যরাষ্ট্র কখন সরাসরি সামরিক অভিযানে যাবে, সেটির নির্দিষ্ট মাত্রা বা পরিস্থিতি এখনো প্রকাশ্যে চিহ্নিত করা হয়নি। যৌথ আলোচনা, সম্মিলিত প্রতিরক্ষা, প্রতিরোধের নিয়মাবলি বা নীতিসহ এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তুত হওয়া বাকি।

এখন প্রশ্ন হলো, কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে এ চুক্তি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে?

বর্তমানে ইয়েমেনের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনীর সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ফলে যে দীর্ঘমেয়াদি ও মারাত্মক প্রভাব পাকিস্তানের ওপর পড়েছিল, সেই ইতিহাসের কারণে ইরান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াতে পাকিস্তান অত্যন্ত সতর্ক থাকবে।

চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো আগ্রাসন বা ইয়েমেন সংঘাতের আঁচ সৌদি ভূখণ্ডে পৌঁছালে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তবে এ চুক্তি প্রয়োগের রূপরেখা কেমন হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিবরণ তিনি দেননি। গত মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট করেছিলেন, মক্কা চুক্তি ন্যাটোর মতোই কাজ করবে—কোনো সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটিকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা চাইতে হবে এবং ঠিক কী ধরনের সাহায্য প্রয়োজন, তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।

ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৪ কোনো সদস্যরাষ্ট্রকে পরামর্শ ও তথ্য বিনিময়ের সুযোগ দেয়। আর অনুচ্ছেদ ৫ মিত্রদের পারস্পরিক সহায়তার কথা বলে; তবে সহায়তার ধরন কেমন হবে, তা ঠিক করার এখতিয়ার প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের নিজস্ব। ২০১২ সালে সিরিয়া একটি তুর্কি যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করার পর আঙ্কারা পরামর্শের জন্য অনুচ্ছেদ ৪ প্রয়োগ করে এবং নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা সহায়তা চায়। সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের দাবি না জানিয়ে তুর্কি সরকার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অনুরোধ করেছিল। ন্যাটো সে অনুরোধ অনুমোদন করে তুর্কি আকাশসীমা রক্ষায় ব্যবস্থাটি মোতায়েন করে।

আরও পড়ুন

এ প্রেক্ষাপটে মক্কা চুক্তি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবকেই ঠিক করতে হবে তারা ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা বা অংশগ্রহণ চায়। উদাহরণস্বরূপ রিয়াদ যদি বস্তুগত ও গোয়েন্দা সহায়তার বাইরে গিয়ে পাকিস্তানের কাছে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়, তবে ইসলামাবাদ তা মানতে বাধ্য থাকবে। তবে সে অনুরোধ ও প্রতিক্রিয়ার পরিধি সমন্বয় সভার মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে হবে। এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। কারণ, রিয়াাদ পাকিস্তান বা তুরস্ক কারও কাছেই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার আবেদন জানায়নি।

ইতিমধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। ইসলামাবাদ প্রকাশ্যে ইরানকে আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা হুতিদের সৌদি আরবে হামলা চালানো এবং বাব আল–মানদেবে হুমকি সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখে। একই সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে রিয়াদের সুরক্ষায় পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা তেহরানকে মনে করিয়ে দিয়েছে। আঙ্কারাও হুতি ও ইরানকে কূটনৈতিকভাবে সংযত রাখতে নিজস্ব ভূমিকা পালন করছে।

আরও পড়ুন

কূটনীতি ব্যর্থ হলে এবং সৌদি আরব বা বাব আল–মানদেবে হুতি হামলা অব্যাহত থাকলে তুরস্ক ও পাকিস্তান সম্ভবত তাদের বিদ্যমান বিমান ও প্রযুক্তিগত সহায়তা আরও বৃদ্ধি করবে। সৌদি আরবে পাকিস্তানের ইতিমধ্যে ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার বহুমুখী যুদ্ধবিমান, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।

তবে বর্তমানে ইয়েমেনের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনীর সরাসরি সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আফগান যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ফলে যে দীর্ঘমেয়াদি ও মারাত্মক প্রভাব পাকিস্তানের ওপর পড়েছিল, সেই ইতিহাসের কারণে ইরান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াতে পাকিস্তান অত্যন্ত সতর্ক থাকবে।

কারণ, এতে তাদের পশ্চিম সীমান্ত এলাকার অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, শিয়া-সুন্নি সংবেদনশীলতা ও সামাজিক শান্তিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে হুতিদের ওপর সরাসরি হামলা বা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে পাকিস্তানি নেতাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হবে।

সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো—পাকিস্তান হুতিদের দমাতে ইরানের ওপর যৌথ কূটনৈতিক চাপ বাড়াবে, সৌদির সুরক্ষায় সমর্থন জোরদার করবে এবং বাব আল–মানদেব প্রণালি নিরাপদ রাখতে একটি বহুজাতিক নৌ জোট গঠনের জন্য তাগিদ দেবে। এই সংযম বজায় রেখেও মক্কা চুক্তির মূল নির্যাস অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

  • রিয়াজ খোকার ইসলামাবাদভিত্তিক ইনস্টিটিউট অব রিজিওনাল স্টাডিজের (আইআরএস) একজন গবেষণা কর্মকর্তা

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত