মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ট্রাফিক হুমকির মুখে পড়ায় তেল সরবরাহে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ট্রেডিং ইকোনমিকসের মার্চ ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৩ থেকে ১১৩ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দাম আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশের বার্ষিক জ্বালানি আমদানি বিল প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন বলছে, যদি তেলের দাম এমন উচ্চপর্যায়ে থাকে, তবে ২০২৫ সালের তুলনায় আমদানি ব্যয় ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বা ৪০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। এটি ২০২৪ সালের জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সতর্ক করেছে যে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে বৈশ্বিক জিডিপি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। বিশ্বব্যাংকের মতে, তেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশে মুদ্রাস্ফীতি শূন্য দশমিক ৪ থেকে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে তাই জ্বালানি–সংকট কেবল অর্থনীতি নয়, বরং খাদ্যনিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেও প্রভাবিত করে।
ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইথানল ও গ্যাসোলিনের মিশ্রণ (ই১০ বা ই২০) একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে। মিনেসোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিকভাবে প্রস্তুতকৃত ১০ থেকে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণ ইঞ্জিনের জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং এটি ইঞ্জিনের জীবনকাল ২০ বছর পর্যন্ত অপরিবর্তিত রাখে এবং জ্বালানির দক্ষতা বৃদ্ধি করে। ইথানলের অকটেন রেটিং ১০৮ থেকে ১১০, যা ইঞ্জিনের নকিং রোধ করে দহন প্রক্রিয়াকে মসৃণ করে। ইপিএর তথ্যমতে, ১০ শতাংশ মিশ্রণে কার্বন মনোক্সাইড নির্গমন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে এবং ২০০১ সালের পরের সব গাড়ি ই১০ জ্বালানির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আইইএ জানায়, ই১০ ব্যবহারে কার্বন নিঃসরণ ৬ থেকে ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব।
প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০২৫ সালে ই২০ জ্বালানি চালু করেছে, যার মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ ৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন টন কমানোর পাশাপাশি ৫০ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করেছে। থাইল্যান্ডে ই১০ থেকে ৬০ শতাংশ মিশ্রণ ব্যবহারের ফলে বছরে ৯০ কোটি লিটার আমদানি করা জ্বালানি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে এবং ১ লাখের বেশি কৃষক পরিবার আখ চাষে লাভবান হচ্ছে। ফ্রান্স ও জার্মানিতেও ই১০ জ্বালানি বর্তমানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশসহ আরও সাতটি দেশ ‘গ্লোবাল বায়োফুয়েল অ্যালায়েন্স’-এ যোগ দেয়, যার মূল লক্ষ্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও কার্বন নিঃসরণ কমানো।
এ ব্যাপারে ওয়াশিংটন ও দিল্লি ঢাকাকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে সহযোগিতার প্রস্তাব দিলেও তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী ও জ্বালানি উপদেষ্টা খাদ্যঘাটতির আশঙ্কায় অনীহা প্রকাশ করেছিলেন, যা বাস্তবে ভিত্তিহীন ছিল। বাংলাদেশে দৈনিক পেট্রল ও অকটেনের চাহিদা ১ হাজার ২০০ টন বা বছরে ৪ দশমিক ৫ লাখ টন। ১০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের মাধ্যমে বছরে অন্তত ৪৫ হাজার টন দেশি উৎপাদন সম্ভব, যা পরবর্তী সময় ৯০ হাজার টন পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে। বায়ুদূষণপ্রবণ বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বিশাল প্রাপ্তি হতে পারে।
ইথানলের দেশি উৎস
চিনিকলের মোলাসেস থেকে প্রতি টন চিনি উৎপাদনের পাশাপাশি ৩০০ লিটার ফুয়েল-গ্রেড ইথানল পাওয়া সম্ভব। কেরু অ্যান্ড কোং ইতিমধ্যে এর উৎপাদন শুরু করেছে।
বাংলাদেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৮ লাখ টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টন নষ্ট হয়। এই নষ্ট ভুট্টা থেকে স্যাকারোমাইসিস সেরেভিসিয়ি ইস্টের মাধ্যমে ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় প্রতি লিটার ইথানল উৎপাদনে খরচ পড়ে মাত্র ৫০ থেকে ৬৫ টাকা। এ ছাড়া ধানের খড়, ভুসি ও ব্যাগাসের মতো কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে বছরে ১৯ দশমিক ৩ গিগালিটার বায়োইথানল উৎপাদন সম্ভব। শুধু ধানের অবশিষ্টাংশ থেকেই ৩১ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন টন ইথানল পাওয়া যেতে পারে।
ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের মতে, মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ কৃষিজমি ব্যবহার করেই ই১০ লক্ষ্য পূরণ সম্ভব, যা খাদ্য উৎপাদনে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এ ছাড়া দেশে ৩৫ লাখ হেক্টর পরিত্যক্ত জমিতে শর্করাজাতীয় ফসল চাষ করে তার অবশিষ্টাংশ দিয়ে ইথানল উৎপাদন করা সম্ভব।
বায়োডিজেল
বাংলাদেশে বর্তমানে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা বছরে ৬৫ লাখ টন। ইন্দোনেশিয়া পামগাছ থেকে বি৩৫ বায়োডিজেল চালু করে তাদের আমদানি ব্যয় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছে এবং ১৭ মিলিয়ন টন কার্বন হ্রাস করেছে। মালয়েশিয়ায় বি২০ ব্যবহারে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কমেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন, মিনেসোটা, নেব্রাস্কা, মিশিগানসহ বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যে ভারী যানবাহনে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বায়োডিজেল ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের লিভারপুল, স্কটল্যান্ড ও নরউইচ অঞ্চলে কৃষিকাজে বায়োডিজেল ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউএসডিএর তথ্যমতে, বায়োডিজেল ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে শূন্য দশমিক ১৫ থেকে শূন্য দশমিক ২০ ডলার কমেছে এবং কৃষি খাতে ৭০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ব্রাজিলে ২০ শতাংশ বায়োডিজেল ব্যবহারের ফলে ডিজেল আমদানি ৪৫ শতাংশ কমেছে এবং তারা জীবাশ্ম ডিজেলের তুলনায় কম খরচে বায়োডিজেল উৎপাদন করছে।
বায়োডিজেলে সালফার নির্গমন শূন্যের কাছাকাছি এবং গ্রিনহাউস গ্যাস ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে। ঢাকার বর্জ্য কুকিং ওয়েল থেকেও বায়োডিজেল সম্ভব।
ঢাকায় প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ টন কুকিং ওয়েল নষ্ট হয়, যা থেকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টন বায়োডিজেল পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া জ্যাট্রোফা, রাবার সিড বা করঞ্জার মতো নন-এডিবল ওয়েল থেকে বছরে এক মিলিয়ন টনের বেশি বায়োডিজেল উৎপাদন সম্ভব। এডিবির গবেষণায় দেখা গেছে, পতিত জমিতে বি২০ উৎপাদন করলে খাদ্যের সংকট হবে না, বরং কর্মসংস্থান বাড়বে। বাংলাদেশ ২০ শতাংশ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলে বছরে কমপক্ষে দুই বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারবে।
বায়োগ্যাস/সিবিএম
কাতারের রাস লাফফান প্ল্যান্টে হামলার কারণে এলএনজি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ তার এলএনজি চাহিদার ৭২ শতাংশ এখান থেকেই আমদানি করে। সরকার বিকল্প হিসেবে সৌদি আরামকোর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা প্রায় দ্বিগুণ মূল্য দাবি করছে। এই পরিস্থিতিতে বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস বা সিবিএম একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা অনুযায়ী, দেশি প্রযুক্তিতে ২৭০ বিলিয়ন সিএফটি বায়োগ্যাস উৎপাদন সম্ভব। একে ১৭০ থেকে ১৮০ বিলিয়ন সিএফটি কমপ্রেসড বায়োমিথেনে (সিবিএম) রূপান্তরিত করে শিল্পকারখানা ও যানবাহনে সরবরাহ করা সম্ভব। ঢাকা ও চট্টগ্রামে দৈনিক ৭ হাজার টন বর্জ্যের অর্ধেক ব্যবহার করে দৈনিক ৪০ হাজার সিএফটি বায়োগ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব, যা ২ হাজার ৫০০টি সিএনজি যানের চাহিদা মেটাবে। পশুর মল ও বর্জ্য থেকেও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। জার্মানিতে বর্তমানে ৯ হাজার ৫০০টির বেশি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট দেশের মোট বিদ্যুতের ৮ দশমিক ৫ শতাংশ সরবরাহ করছে, যা ২০২৩ সালে ৩৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন নিঃসরণ রোধ করেছে।
সুবিধা ও নীতি সুপারিশ
বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে প্রথম সীসাবিহীন পেট্রল প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তী সময় ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বিএনপি সরকার পরিবেশ উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মর্যাদা দেয়। তৎকালীন জাতীয় পরিবেশনীতি ২০০৫-এ প্রথমবারের মতো জৈব জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এমনকি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর সময়ে পামগাছ থেকে বায়োফুয়েল উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করতে বলেছিলেন, যদিও তাঁর মৃত্যুর পর কাজটি আর এগোয়নি।
ই১০ ও বায়োডিজেল ব্যবহার করলে ঢাকার বায়ুদূষণ ও পিএম ২ দশমিক ৫ মাত্রা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে, যা স্বাস্থ্য খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করবে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে। এ ছাড়া এই খাতে দুই থেকে তিন লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং বন্ধপ্রায় চিনিকলগুলো সচল হবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে। ইরিনা–এর মতে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ২০৩০ সাল নাগাদ ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার গ্রিন ফিন্যান্সের সুযোগ রয়েছে।
এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে একটি সুস্পষ্ট ‘জাতীয় বায়োফুয়েল নীতি’ প্রণয়ন জরুরি। সেখানে ই১০, বি৫ ও সিবিজি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ, কর প্রণোদনা এবং সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে।
দেশি উদ্যোক্তাদের অন্তত ১০ বছরের কর অবকাশ–সুবিধা এবং ডিস্টিলেশন যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করলে বিনিয়োগ বাড়বে। কার্বন ট্রেডিংয়ের মাধ্যমেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বিকল্প জৈব জ্বালানি গ্রহণ করা কেবল পরিবেশগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি বাংলাদেশের ‘জ্বালানি সার্বভৌমত্ব’ অর্জনের প্রধান হাতিয়ার।
সুবাইল বিন আলম ও এ এস এম তৌফিক ইমাম সেন্টার ফর সায়েন্স টেক পলিসি এবং ডিপ্লোমেসি (সিএসটিপিডি) এবং জি ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য
মতামত লেখকদ্বয়ের নিজস্ব