কুর্দি কারা? ট্রাম্প কেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের চায়?

সিরিয়ায় পাহারায় সশস্ত্র কুর্দি নারীছবি: এএফপি

কুর্দিরা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী, যাদের এখনো নিজস্ব কোনো রাষ্ট্র নেই। বিশ্বজুড়ে তাদের সংখ্যা প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি। তাদের বেশির ভাগই বাস করে আর্মেনিয়া, ইরাক, ইরান, সিরিয়া ও তুরস্কের সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চলে।

কুর্দিরা নিজেদের প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের একটি জাতি ‘মিডস’-এর সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। এক শতাব্দী আগে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সীমানা নির্ধারণের সময় কুর্দিরা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। এর পর থেকে অস্থির এই অঞ্চলের রক্তাক্ত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে তারা বারবার আটকা পড়েছে। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য প্রায়ই তাদের ভরসা করতে হয়েছে নিজেদের গড়ে তোলা মিলিশিয়া বাহিনী পেশমার্গার ওপর। ইতিহাস থেকে কুর্দিরা একটি কথাই শিখেছে—তাদের ‘বন্ধু বলতে পাহাড় ছাড়া আর কেউ নেই’।

ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকলেও কুর্দিদের একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে। তাদের ভাষা পারসিয়ান ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর বহু উপভাষা আছে। তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সংগীত, খাবার ও আলাদা পরিচয় রয়েছে।

সিরিয়ায় গত দশকের গৃহযুদ্ধের সময় কুর্দিরা সেখানে একটি স্বশাসিত অঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। তারা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের হয়ে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।

কুর্দি জাতীয়তাবাদের সূচনা উনিশ শতকের শেষভাগে। গত এক শতাব্দীতে ব্রিটেন থেকে শুরু করে পরে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিভিন্ন পরাশক্তি কুর্দিদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। কুর্দিদের অধিকাংশই সুন্নি মুসলিম, তবে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে ধর্মীয় সংখ্যালঘুও রয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই অঞ্চলের বিভিন্ন স্বৈরশাসক ও সরকার কুর্দিদের ওপর কঠোর দমন–পীড়ন চালিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরো সম্প্রদায়কেই উচ্ছেদ বা হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাইরের শক্তিগুলো প্রায়ই নিজেদের কৌশলগত সুবিধার জন্য কুর্দিদের ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। এতে কুর্দি সমাজের ভেতর বিভক্তি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তার মাশুল দিতে হয়েছে কুর্দিদেরই।

তুরস্কে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা বাহিনী ও কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকের মধ্যে সংঘাত চলছে। এই বামপন্থী সংগঠনটি প্রথমে একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্রের জন্য লড়াই শুরু করলেও পরে স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলে। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং তুরস্কের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চল থেকে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

আরও পড়ুন

ইরাকে সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেন উত্তরাঞ্চলের কুর্দিদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। তবে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর কুর্দিরা সেখানে একটি আধা–স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, যা তারা এখনো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করছে।

ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেও কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যার সূচনা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময় থেকেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এই অঞ্চল অস্থিরতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালে ইরানি–কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তাতে কুর্দি অঞ্চলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার ২০২৫ সালের শেষ দিকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনাতেও এই অঞ্চল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সিরিয়ায় গত দশকের গৃহযুদ্ধের সময় কুর্দিরা সেখানে একটি স্বশাসিত অঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। তারা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের হয়ে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।

এর একটি বড় কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত। ওয়াশিংটন নতুন একটি সিরীয় রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ককে কুর্দিদের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কুর্দিদের বহু প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। তবে এই যুদ্ধ পেশমার্গাদের একটি দক্ষ যোদ্ধা বাহিনী হিসেবে পরিচিতি আরও শক্ত করেছে। ‘পেশমার্গা’ শব্দের অর্থ যারা মৃত্যুকে খুঁজে নেয়। কঠিন ভূখণ্ড সম্পর্কে তাদের জ্ঞান, দ্রুত চলাচলের ক্ষমতা এবং প্রবল মনোবল অনেক সময় ভারী অস্ত্রে সজ্জিত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও তাদের টিকিয়ে রেখেছে।

এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কুর্দিদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে এমন কৌশলও তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন যদি তেহরানের বর্তমান শাসনকে দুর্বল করতে চায়, তাহলে ইরানের কুর্দিবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর যোদ্ধাদের ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ সমর্থন এবং মাটিতে সামরিক উপদেষ্টাদের সহায়তা থাকলে পেশমার্গারা ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলে কিছু এলাকা দখল ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত অতিক্রম করে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের নেই।

বরং লক্ষ্য হতে পারে ইরানের সামরিক বাহিনীকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ব্যস্ত রাখতে বাধ্য করা, যাতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সেনা ও সম্পদ সেখানেই আটকে পড়ে। একই সঙ্গে ইরানের অন্য জাতিগত গোষ্ঠীগুলোকেও নিজেদের আন্দোলন শুরু করতে উৎসাহিত করা হতে পারে, যা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাও পেতে পারে।

তবে এই পরিকল্পনার ঝুঁকিও কম নয়, এবং কুর্দি নেতারা তা খুব ভালোভাবেই জানেন। আপাতত ইরাকের উত্তরাঞ্চলের মূলধারার কুর্দি নেতৃত্ব বলছে, তারা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকবে। তাদের এই অবস্থান অস্বাভাবিক নয়। ইতিহাস বলছে, বড় কোনো যুদ্ধ শুরু হলেই কুর্দিরা প্রায়ই দুই পক্ষের সংঘর্ষের মাঝখানে পড়ে যায়। তখন আবারও প্রমাণিত হয়, শেষ পর্যন্ত তাদের প্রকৃত আশ্রয় একটাই—পাহাড়ের উঁচু চূড়াগুলো।

  • জেসন বার্ক দ্য গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদদাতা।

    দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত