‘নীতি পুলিশের’ মাতবরি আমরা কাঁহাতক সহ্য করব

প্রতীকী ছবি

সামাজিক তথ্যমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে হাত বাঁধা তিনজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন। আর শ্বেতশুভ্র শ্মশ্রুধারী বয়স্ক এক ব্যক্তি এক নারীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে কাটছেন। নারীটি অসহায়ের মতো ক্ষমা চাইছেন, চুল না কাটার জন্য অনুরোধ করছেন। কিন্তু বয়স্ক লোকটি ক্ষান্ত হন না। আশপাশে উৎসাহী মানুষও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে, কারও সাহস নেই এই উদ্ধত লোকটির হাত থেকে কাঁচি ছিনিয়ে নেয় অথবা তাঁকে প্রশ্ন করে, গায়ে হাত দেওয়ার, তার মাথার চুল কাটার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? মূলত চুরির অভিযোগে এ তিন নারীকে নির্যাতন করা হয়েছিল।

কোনো অভিযোগে আইন হাতে তুলে নিয়ে বা অভিযোগ ছাড়াই এভাবে চুল কাটার ঘটনা নতুন নয়। বাউল–ফকিরদের চুল কাটার ঘটনা তো আকছার ঘটছে। রমজানের সময় সিগারেট খাওয়ার ‘অপরাধে’ কান ধরে ওঠবস করানো দৃশ্যও আমরা দেখেছি। মেয়েদের পোশাক নিয়ে টিটকারি, এমনকি তাদের গায়ে হাত দিয়ে ভর্ৎসনার চেষ্টাও আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে নয়। এই নীতি পুলিশেরা একসময় গার্মেন্টসের মেয়েদের কাজে যাওয়া ঠেকাতে চেষ্টা করেছে। মাজার ভেঙেছে, গানের কনসার্ট বানচাল করেছে, ইসলামবিরোধী অভিযোগে নাটক বন্ধ করে দিয়েছে। ট্রান্সজেন্ডারের উল্লেখ থাকার কারণে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন দাবি করেছে।

বাংলাদেশের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারত বা পাকিস্তানেও এমন ঘটনা আকছার ঘটছে। কয়েক বছর আগে, রেস্তোরাঁয় সুরাপানের অভিযোগে বেঙ্গালুরুতে এক নারীকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করা হয়। ঘরে গরুর মাংস রাখার অপরাধে উত্তর প্রদেশের এক মুসলিম পরিবারের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানে লাহোরের মিনার-এ-পাকিস্তানে টিকটক ভিডিও করার ‘অপরাধে’ এক তরুণীকে হামলা করে তার ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রেও আমরা একই ঘটনা দেখেছি। নীতিবিরুদ্ধ বা খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে লাইব্রেরির বই পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, আক্রমণ করা হয়েছে গর্ভপাত ক্লিনিক।

সর্বত্রই দৃশ্যটি অভিন্ন। এক বা একাধিক ব্যক্তি, প্রায়শই পুরুষ, নিজেরাই নিজেদের সমাজের নীতি ও মূল্যবোধের অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে জোর করে তাদের পছন্দের নিয়মকানুন কার্যকর করতে জামার আস্তিন গুটিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে।

আরও পড়ুন

অবৈধ দাদাগিরি

প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই দাদাগিরি শুধু অনৈতিক ও অবৈধ নয়, তা বেআইনি। যারা এই দাদাগিরি করে, তারাও জানে কাজটা বেআইনি। তবু তারা করে শুধু এই যুক্তিতে যে তারা ধর্মীয় বা সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা করছে। নাগরিক অধিকারের এই লঙ্ঘন সম্ভব হয় শুধু আইন ও বিচার বিভাগের অনাগ্রহ ও অযোগ্যতার কারণে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বা গ্রুপও ফায়দা আদায়ের লক্ষ্যে এই জাতীয় ‘ভিজিলান্টিজম’ সমর্থন করে থাকে। কিন্তু সবচেয়ে বড় যে কারণে এই ধরনের ব্যবহার অন্যায় হয়েও পার পেয়ে যায়, তা হলো আমাদের, সাধারণ নাগরিকদের নীরবতা।

নীতি পুলিশের পক্ষে সবচেয়ে বড় সুবিধা ভীতি। বাউল বা বেদেনির চুল কাটা অথবা নারীর পোশাক নিয়ে কটূক্তি আমরা মেনে নিই সামাজিক অনুশাসনের ভয়ে। ধর্মের দোহাই আমাদের মনে দ্বিধার জন্ম দেয়। কিন্তু অবস্থাটা যদি এমন হয় যে আমরা ভয়কে জয় করে প্রতিবাদ করা শিখলাম?

পাকিস্তানের খ্যাতনামা মানবাধিকারকর্মী আসমা জাহাঙ্গীরের একটি কথা এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। ‘পাবলিক প্লেস’ বা প্রকাশ্য স্থানে মেয়েদের উপস্থিতি নিয়ে ধর্মগুরুদের বাড়াবাড়ি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, আমরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটা করি, তা হলো ‘পাবলিক প্লেস’, যার ওপর অধিকার নারী-পুরুষ সবার, শুধু ধর্মীয় অনুশাসন বা ধর্মগুরুদের চোখরাঙানির ভয়ে সে স্থান তাদের হাতে ছেড়ে দিই। এতে নীতি পুলিশকে উৎসাহ জোগানো হয়, চাপিয়ে দেওয়া অনুশাসন মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু মানুষ একবার যদি প্রতিবাদে নামার সাহস অর্জন করে, দেখবেন নীতিবাদীরা পরাস্থ হয়েছে।

আমাদের ধারে কাছেই অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ, কখনো একা, কখনো দলবদ্ধভাবে ভয়কে জয় করতে শিখেছে। পাকিস্তান থেকে একটা উদাহরণ দিই। ১৯৮৩ সালে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক এক আইনের প্রতিবাদে লাহোরে নারী-পুরুষ আইনজীবীরা একযোগে বিক্ষোভের আয়োজন করেছিলেন। তা ঠেকাতে ধর্মগুরু ও তাদের প্রতিনিধিরা তো বটেই, তাদের সঙ্গ দিতে এগিয়ে আসে সরকারি পুলিশও। তারা নারী আইনজীবীদের কুৎসিত ভাষায় গালি দেয়, টেনেহিঁচড়ে পুলিশ ভ্যানে তোলে। সে দৃশ্য দেশের পত্রিকায় ছাপা হলে রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিস্তৃত হয়। ক্রমে নারীর সমঅধিকারের পক্ষে দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে ওঠে। এক দিনে নয়, দীর্ঘদিনের প্রতিবাদের ফলে নারীদের অধিকার অর্জিত হয়।

আরেকটি উদাহরণ দিই ভারত থেকে। বেঙ্গালুরুতে ক্যাফে বা রেস্তোরাঁয় নারীর সুরাপানে হস্তক্ষেপের গল্পটি শুরুতে বলেছি। শ্রী রামসেনা নামে একটি রক্ষণশীল দলের নেতৃত্বে বিভিন্ন ক্যাফেতে গিয়ে মেয়েদের ওপর হামলা শুরু হয়। প্রথমে ভয়ে, অপমানে মেয়েরা স্থান ত্যাগ করে। কিন্তু খুব দ্রুত দেশজুড়ে এক বিচিত্র প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হয়। মেয়েরা বেছে বেছে শ্রী রামসেনার নেতাদের নামে গোলাপি অন্তর্বাস ডাকে পাঠানো শুরু করে। প্রথমে এই আন্দোলনের অর্থ সবার কাছে পরিষ্কার হয়নি। কিন্তু ধর্মগুরুদের যে ঠাট্টা করা হচ্ছে, সে কথা বুঝতেও খুব বিলম্ব হয়নি। এভাবে শুধু ঠাট্টা দিয়ে ধর্মগুরুদের রক্তচক্ষু উপড়ে ফেলে ভারতের মেয়েরা। ‘পিংক চাড্ডি’ নামের সেই বিদ্রূপ-লড়াইয়ের কথা মনে করে এখনো স্বনিয়োগকৃত নৈতিকতার অভিভাবকদের বিদ্রূপ করা হয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশে বাউল–ফকিরদের চুল কাটার ঘটনা ঘটছে।
ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

প্রতিবাদ, একা ও অনেকে

প্রতিবাদ সবচেয়ে কার্যকর হয় যখন নীতি পুলিশের শিকার নিজেরাই তার প্রতিবাদ করে। প্রথমে একা, ক্রমে আরও অনেকে।

বাংলাদেশের কলসুন্দর গ্রামের ফুটবলার মেয়েদের কথা মনে আছে? গ্রামের মেয়েরা ফুটবল খেলবে, এ কথা সেখানকার অধিকাংশ মানুষই মানতে রাজি হয়নি। কিন্তু মেয়েদের পাশে ছিলেন সে স্কুলের হেডমাস্টার মিনতি রানী শীল ও কোচ মফিজউদ্দিন। তাঁদের ঠাট্টা শুনতে তো হয়েছেই, চাকরি থেকে বহিষ্কারের হুমকিও শুনতে হয়েছে। বাবা-মায়েদেরও গ্রামের মাতবরদের কটুকথা শুনতে হয়েছে। অনেকে মেয়েদের খেলার মাঠ থেকে ফিরিয়েও এনেছেন। কারা মাঠ ছাড়েনি জানেন? ১৪-১৫ বছরের মেয়েরা, যারা ভয় পায়নি। তারা মাঠে ফুটবল খেলেছে এবং খেলে জিতেছে। শুধু স্থানীয় প্রতিযোগিতায় নয়, সাফ গেমসে পরপর দুই দফা শিরোপা জিতে সারা দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে।

২০২২ সালে সাফ গেমসে মেয়েদের যে দলটি চ্যাম্পিয়ন হয়, তার অন্যতম খেলোয়াড় ছিলেন তহুরা খাতুন। গ্রামের অতি সাধারণ এক মেয়ে। প্রতিবেশীরা ঠাট্টা করেছে, মা-বাবাকে একঘরে করার ভয় দেখিয়েছে, কেউ এমন মেয়েকে বিয়ে করবে না বলে হুমকি দিয়েছে। তারপরও তহুরা বলেছে, আমি খেলবই। শিরোপা জেতার পর সেই গ্রামের মানুষই বলেছে, এরা আমাদের ‘হিরো’। হিন্দুস্থান টাইমস লিখেছিল, বাংলাদেশের গ্রামের মেয়েরা বেকহামের মতো পা বেঁকিয়ে বল মারে।

চুপ থেকো না, আওয়াজ তোলো

নীতি পুলিশের বাড়াবাড়ি নিয়ে আলাপ-আলোচনায় প্রায়শই আঙুল তোলা হয় ভুক্তভোগীদের চরিত্রের দিকে। মেয়েরা মধ্যরাতে থার্টি ফার্স্ট উদ্যাপনে এসে অপমানিত হলে যারা হামলা করল, তাদের সমালোচনা করার বদলে আমরা বলি, এত রাতে মেয়েদের ঘরের বাইরে আসার দরকার কী? অনেক সময় তাদের পোশাকের দিকে আঙুল তুলি, বলি, এমন পোশাক পরলে ছেলেরা তো উত্তেজিত হবেই।

অথচ আমাদের উচিত, ভুক্তভোগীদের দিকে আঙুল না তুলে হামলাকারীদের প্রশ্ন করা, ভালো-মন্দ বিচারের এমন ক্ষমতা আপনাদের কে দিয়েছে?

কারও মূল্যবোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে বেদেনির চুল কাটবে, লাইব্রেরির বই পোড়াবে, নাটক বন্ধ হবে অথবা বাউল উৎসবে এসে হামলা করবে—এই ব্যবহার মেনে নেওয়া অর্থই হলো দেশের আইনকানুন উপেক্ষা করে নির্দিষ্ট দল বা গোত্রের বানানো আইনকানুন মেনে নেওয়া। উর্দু কবি মখদুম মহিউদ্দিন লিখেছিলেন, চুপ করে থেকো না, আওয়াজ তোলো। তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলি, স্বনিয়োগকৃত নীতি পুলিশ যখন কোনো বেদেনির চুল কাটবে অথবা মধ্যরাতে একাকী কোনো মেয়েকে দেখলে হামলে আসবে, তাদের বাধা দিন। আওয়াজ তোলেন।

  • হাসান ফেরদৌস লেখক ও প্রাবন্ধিক

  • মতামত লেখকের নিজস্ব