ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতন এবং তার পরপরই তেহরানের বাজারগুলোতে একের পর এক শাটার পড়ে যাওয়ার ঘটনাকে পশ্চিমা বিশ্ব আবারও সেই চিরচেনা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছে।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে যে গল্পটি শোনানো হচ্ছে, তা হলো ‘ইরান ভেঙে পড়তে যাচ্ছে’। অর্থনৈতিক ব্যর্থতাকে সেখানে এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, যেন তা অবশ্যম্ভাবীভাবে একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ধসের পূর্বাভাস। কিন্তু সহকর্মীদের সঙ্গে করা আমার প্রামাণ্য গবেষণা একেবারেই ভিন্ন ও অনেক বেশি জটিল বাস্তবতার কথা বলছে।
এখানে আমরা কোনো রাজনৈতিক বিপ্লব দেখতে পাচ্ছি না। এখানে আমরা দেখছি এমন এক সমাজের হাহাকার, যার ‘অর্থনৈতিক বাফার’, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নিষ্ঠুর ও অমানবিক আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার নীতি দিয়ে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে শূন্য করে দেওয়া হয়েছে। এই অর্থনৈতিক মৃত্যুচক্রের মূল চালিকা শক্তি কারা, তা কারও অজানা নয়।
বিশ্বব্যাপী আর্থিক ব্যবস্থাকে অস্ত্র বানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে এবং ইরানের তেল রপ্তানিকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তা কার্যত প্রতিটি ইরানি শিক্ষক, নার্স ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবনের সঞ্চয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে।
২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়কে নিয়ে আমাদের গবেষণা চালানো হয়েছে। সেখানে আমরা সিনথেটিক কন্ট্রোল মেথড (একটি গবেষণাপদ্ধতি, যা ‘যা ঘটেছে’ আর ‘যা ঘটতে পারত’—এই দুইয়ের পার্থক্য দিয়ে নীতির প্রকৃত প্রভাব দেখায়) ব্যবহার করেছি। তাতে দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার প্রতিবছর গড়ে ১৭ শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে।
আদতে এটি কেবল ‘অর্থনৈতিক চাপ’ ছিল না; এটি ছিল একধরনের কাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ। যে লাখ লাখ মানুষ একসময় ইরানি সমাজের স্থিতিশীল ও মধ্যপন্থী কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন, তাঁরা নেমে গেছেন ‘নতুন দরিদ্র’ শ্রেণিতে।
যখন অ্যান্টিবায়োটিক থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিলাসপণ্যে পরিণত হয়, তখন সামাজিক চুক্তি শুধু চাপে পড়ে না, তা বাইরের শক্তির হাতে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
এই অর্থনৈতিক অবরোধ আবার বৃহত্তর এক ভূরাজনৈতিক চাপে ফেলার অংশ। ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান ছায়াযুদ্ধ (যার মধ্যে রয়েছে ইরানের মাটিতে গুপ্তহত্যা এবং ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি সামরিক হামলা) ইরানি রাষ্ট্রকে সর্বক্ষণ ‘সবার আগে নিরাপত্তা’ মানসিকতায় বসবাস করতে বাধ্য করেছে।
ইরানের অর্থনীতির সামরিকীকরণ নিয়ে আমার গবেষণা দেখিয়েছে, এই বহিঃহুমকিগুলো রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর জন্য এমন এক আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে যেখানে ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা’র নামে তারা অবশিষ্ট সম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করে। এই বহিঃ আগ্রাসন সংস্কারকে এগিয়ে নেয় না; বরং তা আরও কণ্ঠরোধ করে।
সম্প্রতি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ প্রকাশ্যে যে বক্তব্য দিয়েছে, তা আরও উদ্বেগজনক হলো। সেখানে মোসাদ দাবি করেছে, তারা ইরানের ‘মাঠে থাকা বিক্ষোভকারীদের’ সমর্থন দিচ্ছে।
একদিকে রাষ্ট্র নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চিন্তায় ব্যস্ত, আর অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো অর্থনৈতিক চাপকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এই দুই শক্তির টানাপোড়েনে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে তাদের ভবিষ্যতের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
এ ধরনের বক্তব্য ইরানি জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষোভকে অবৈধ করে তোলে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সবচেয়ে যুদ্ধংদেহী শক্তিগুলো খুব সহজেই জনগণের জীবনযাত্রা-সংক্রান্ত দাবিদাওয়াকে রাষ্ট্রবিরোধী বিদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে। এতে ইরান সরকার আরও কঠোর হতে পারে এবং সে অজুহাতে তার ওপর আরও অর্থনৈতিক অবরোধ আসতে পারে।
পশ্চিমা নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই ধরে নেন—কোনো সমাজকে শক্ত করে চেপে ধরলে শেষ পর্যন্ত সেখানে ‘শাসন পরিবর্তন’ ঘটবেই। তবে দুই দশকের তথ্যের ভিত্তিতে করা আমাদের যৌথ গবেষণা এ ধারণাকে পুরোপুরি খণ্ডন করেছে।
গবেষণায় আমরা দেখেছি, উচ্চমাত্রার নিষেধাজ্ঞা সংগঠিত গৃহযুদ্ধ বা সামরিক অভ্যুত্থানের ঝুঁকি বরং কমিয়ে দেয়। কারণ, বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে একধরনের জাতীয়তাবাদী ‘পতাকার নিচে ঐক্য’ তৈরি হয়। কিন্তু একই সঙ্গে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো সমাজকে একটি প্রেশার কুকারে পরিণত করে, যেখানে নাগরিক অস্থিরতা ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি বেড়ে যায়। নিষেধাজ্ঞা নতুন সরকার আনে না; তা আনে আরও বিভক্ত ও আরও অনিরাপদ সমাজ।
যখন একজন নাগরিক দেখেন, মুদ্রার মান অর্ধেকে নেমে গেছে, আর একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির খবর বেরোচ্ছে, তখন বিদ্রোহ তার কাছে আর ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত থাকে না, বরং শেষ অবলম্বন হয়ে ওঠে।
উচ্চমাত্রায় সংযুক্ত ডিজিটাল সমাজে এই বৈষম্য আর গোপন রাখা যায় না। আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় আমরা দেখিয়েছি, ‘দরিদ্র হয়ে পড়া মধ্যবিত্ত’ রএখন তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের কষ্ট আর সেই অভিজাত শ্রেণির বিলাস দেখতে পাচ্ছে।
আজ যাঁরা রাস্তায় নেমেছেন, তাঁরা তাঁদের দেশ ভেঙে ফেলতে চান না। তাঁরা চান তাঁদের মর্যাদা ফিরে পেতে। তাঁরা চান অর্থনৈতিক স্বস্তি পেতে। তাঁরা চান সেই সমষ্টিগত শাস্তির অবসান ঘটাতে, যা তাঁদের জীবনকে ফাঁপা করে দিয়েছে।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কৌশলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো এই কৌশল ইচ্ছাকৃতভাবে সেই শ্রেণিটিকেই ধ্বংস করেছে, যারা একটি স্থিতিশীল, সংস্কারপন্থী ও কম সংঘাতমুখী ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি সক্ষম ছিল, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
বিদেশি শক্তিগুলোর চাপ আর দেশের ভেতরের দুর্নীতি—এই দুই একসঙ্গে এমন একটি শ্রেণিকে দুর্বল করে দিয়েছে, যারা সাধারণত হঠাৎ সহিংস পরিবর্তনের বদলে ধীরে ধীরে শান্তভাবে পরিবর্তন চায়। এই শ্রেণিই ছিল সমাজের ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি। সেটি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় সমাজে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
ইরানের মুদ্রার মান হয়তো কোনো একসময় ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের মধ্যে যে আস্থা ভেঙে গেছে, সমাজের যে সম্পর্কগুলো ছিঁড়ে গেছে, সেগুলো সহজে জোড়া লাগে না।
একদিকে রাষ্ট্র নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চিন্তায় ব্যস্ত, আর অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো অর্থনৈতিক চাপকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এই দুই শক্তির টানাপোড়েনে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে তাদের ভবিষ্যতের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
তথ্য স্পষ্ট করে বলছে, এই সংকট দেশের ভেতর থেকে হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। এটি দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধ ও চাপের ফল। যত দিন এই সমষ্টিগত শাস্তির পথ ছেড়ে বাস্তব আলোচনায় ও কূটনীতিতে না যাওয়া হচ্ছে, তত দিন এই অস্থিরতা আরও বাড়তেই থাকবে।
মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান জার্মানির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অর্থনীতির অধ্যাপক।
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ