সোমবার (৩১ আগস্ট) গ্রিস ও ইসরায়েল গ্রিসের ভূখণ্ড সুরক্ষায় একটি সমন্বিত ও বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে ৩৫০ কোটি ডলারের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’। প্যাকেজটির আওতায় থাকবে ডেভিড’স স্লিং ও স্পাইডার ইন্টারসেপ্টর, বারাক আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং বহুমুখী রাডার। এর পাশাপাশি কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে ড্রোন বা ইউএভির আক্রমণ থেকে সুরক্ষায় ড্রোন ডোমব্যবস্থা যুক্ত করার জন্য আলাদা একটি চুক্তিও হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি চুক্তিও এটি। চুক্তিটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এমন এক সময়ে এটি হয়েছে, যখন কয়েক দশকের মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। গ্রিসেও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশটির ৬৫ শতাংশ নাগরিক এখন ইসরায়েলকে নেতিবাচকভাবে দেখে। তাহলে প্রশ্ন হলো, এমন সময়ে কেন এথেন্স ইসরায়েলের সঙ্গে সবচেয়ে স্পর্শকাতর একটি ক্ষেত্রে অর্থাৎ প্রতিরক্ষা ও সামরিক প্রযুক্তিতে প্রকাশ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করার সিদ্ধান্ত নিল?
প্রথম কারণ হিসেবে সামনে আসে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাতের ছায়া। মার্চের শুরুতে ইরানের একটি ড্রোন গ্রিসের প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠ অংশীদার সাইপ্রাসে আঘাত হানে। এতে ২০২৪ সাল থেকেই দৃশ্যমান উদ্বেগ আরও বেড়ে থাকতে পারে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইসরায়েল প্রায় ৩০০টি ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছিল। এরপর গ্রিসের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিকোস দেনদিয়াস এথেন্সকে নিজস্ব ড্রোনবিরোধী ‘ডোম’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তাই এই চুক্তির পেছনে বাস্তব প্রয়োজনও রয়েছে। ড্রোনের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ সামরিক সমাধান খুঁজছে। যেমন সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইউক্রেন থেকে ড্রোনবিরোধী প্রযুক্তি সংগ্রহ করছে। ইউক্রেনও তার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত প্রযুক্তি হিসেবে বাজারজাত করতে পারছে।
রাজনৈতিকভাবে ইসরায়েল এখন কিছুটা অসুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও বাস্তব অভিজ্ঞতার দিক থেকে দেশটি এগিয়ে আছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ‘অস্ত্র কূটনীতি’ চর্চা করে আসছে। সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে গভীর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার হাতিয়ার হিসেবে দেশটি তার প্রতিরক্ষাশিল্পকে ব্যবহার করেছে।
দ্বিতীয় কারণটি ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের আরেকটি কৌশলগত নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি হলো ‘পেরিফেরি ডকট্রিন’। এই নীতির লক্ষ্য ছিল আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের বৈরিতার মোকাবিলায় লেভান্ট অঞ্চলের প্রান্তে থাকা অ-আরব রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। এর মূল উপলব্ধি হলো, অভিন্ন হুমকি কৌশলগত অংশীদারত্ব তৈরি করতে পারে। ইসরায়েল ও গ্রিসের ক্ষেত্রে সেই অভিন্ন হুমকি হলো তুরস্ক।
তবে এখানে একটি ঐতিহাসিক পরিহাস রয়েছে। অ-আরব রাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে সেতু হিসেবে তুরস্কই ছিল ইসরায়েলের ‘পেরিফেরি ডকট্রিন’-এর শুরুর দিকের ঘনিষ্ঠ অংশীদার। ১৯৪৯ সালে তুরস্কই প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময়ে আঙ্কারা ও তেল আবিবের মধ্যে শক্তিশালী, তবে গোপনে নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ইসরায়েলের পরিকল্পনা অনুযায়ী এই সম্পর্কই পরে আরও প্রকাশ্য ও বিস্তৃত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পথ খুলে দেয়। ২০০২ সালে ইসলামপন্থী হিসেবে পরিচিত একে পার্টি বা জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি তুরস্কের ক্ষমতায় আসার পরও এই সম্পর্ক অব্যাহত ছিল।
কিন্তু ২০০৮ সালের শেষ দিকে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযান শুরু করলে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরে। দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে ইসরায়েলের নীতির বিষয়ে পরবর্তী সময়ে মতপার্থক্য আরও বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে এতে দুই দেশের গভীর সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
২০২৪ সালে আঙ্কারা ইসরায়েলের ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কার্যত ধসে পড়ে। এখন আর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচলও নেই। জুনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, তুরস্ক যাতে ইরানের পক্ষে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ না দেয়, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কাজ করেছে। দাবিটি হয়তো অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। তবে এটি দেখায় যে ইসরায়েল ও তুরস্ক শুধু অনেক ভূরাজনৈতিক বিষয়ে পরস্পরের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে না; বরং ক্রমেই একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী এমনকি হুমকি হিসেবেও দেখছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গ্রিস খুব দ্রুত সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। আগের বছরগুলোতে তুরস্কের সঙ্গে তেল আবিবের অংশীদারত্ব এথেন্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠার পথে বাধা ছিল। এখন আর তা নেই। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইসরায়েল, সাইপ্রাস ও গ্রিস একটি ‘যৌথ কর্মপরিকল্পনা’ সই করে। এর আওতায় সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ চুক্তিকে ইসরায়েলের পুরোনো একটি কৌশলের নতুন প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এই কৌশলকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। জনমনে ইসরায়েল নিয়ে সংশয় গ্রিস-ইসরায়েল সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। তবে একই ধরনের জনমতবিরোধিতা সত্ত্বেও ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে গভীর হয়েছিল।
জ্বালানি সহযোগিতাও এই কৌশলগত ঘনিষ্ঠতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বিপুল গ্যাসের মজুত আবিষ্কারের পর ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাস পাইপলাইন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে সহযোগিতা শুরু করে।
তুরস্কের ক্ষেত্রে যেমন হয়েছিল, এখানেও নিরাপত্তা সহযোগিতার পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রায় ৭ লাখ ৪৪ হাজার ইসরায়েলি গ্রিস সফর করেন। বিপরীতে ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৫৮ হাজার ইসরায়েলি পর্যটক তুরস্ক সফর করেছিলেন।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন জোট বা ব্লকের বিভাজনও ইসরায়েল-গ্রিস সম্পর্কের দ্রুত বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েল, গ্রিস, সাইপ্রাস, ভারত এবং নাম উল্লেখ না করা কয়েকটি আরব ও আফ্রিকান দেশকে নিয়ে একটি ‘হেক্সাগন অ্যালায়েন্স’-এর ধারণা সামনে আনেন। এর ছয় মাস পর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করে। এই জোটের সঙ্গে এর আগে বিশ্লেষকেরা যে ‘ইসলামিক কোয়ালিশন’-এর কথা বলেছিলেন, তার বেশ মিল রয়েছে।
এটি একটি পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি। এক ব্লকের দেশগুলোর মধ্যকার মতবিরোধ যেমন রয়েছে, তেমনি বিভিন্ন ব্লকের মধ্যেও সহযোগিতা দেখা যাচ্ছে। তবে বিষয়টি এটাও স্পষ্ট করে যে নিরাপত্তার গ্যারান্টিদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার সংকট শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের সাম্প্রতিক যুদ্ধেরও আগে থেকেই এই সংকট তৈরি হচ্ছিল। বিষয়টি ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। কারণ, ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়া এসব দেশই যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র।
তাই ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ চুক্তিকে ইসরায়েলের পুরোনো একটি কৌশলের নতুন প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এই কৌশলকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। জনমনে ইসরায়েল নিয়ে সংশয় গ্রিস-ইসরায়েল সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। তবে একই ধরনের জনমতবিরোধিতা সত্ত্বেও ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে গভীর হয়েছিল।
সংক্ষেপে বলা যায়, পূর্ব ভূমধ্যসাগরসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের পাশাপাশি অভিজাত পর্যায়ে নিরাপত্তা সহযোগিতাও গভীর হতে থাকবে। এর মধ্যে একটি বড় পরিহাস রয়েছে। যেসব সংঘাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেসব সংঘাতই আবার তার সামরিক অভিজ্ঞতা ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে।
রব গেইস্ট পিনফোল্ড কিংস কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রভাষক, জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাঙ্কট অধ্যাপক এবং গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের জ্যেষ্ঠ অনাবাসিক ফেলো।
* আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত