আসিফ বিন আলীর বিশ্লেষণ
নতুন বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের ঝুঁকি
বিশ্বব্যবস্থা এখন সবচেয়ে ভঙ্গুর সময় পার করছে। এই ভাঙন আমাদের সুযোগও দিতে পারে, আবার বড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। ভারত আর চীনের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা আর স্বার্থরক্ষার নামে আরও বেশি আগ্রাসী হবে না, এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের ঝুঁকি নিয়ে লিখেছেন আসিফ বিন আলী
বিশ্বব্যবস্থা এখন এক অদ্ভুত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে লিবারেল ওয়ার্ল্ড অর্ডার (উদার বিশ্বব্যবস্থা) বানানো হয়েছিল, সেই কাঠামো চোখের সামনে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে। অথচ এই কাঠামোর জন্মই হয়েছিল যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স আর সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারা একটা জিনিস বুঝেছিলেন, আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ হলে শুধু ইউরোপ নয়, পুরো সভ্যতাই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তাই এই দেশগুলোর উদ্যোগে এবং জাতিসংঘ, আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল), ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (বিশ্বব্যাংক) এই পুরো ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
জাতিসংঘের মূল ম্যান্ডেট ছিল একটা খুব সোজা কথা—তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেন না হয়। সেই দিক থেকে বলতে গেলে এই ব্যবস্থা আংশিক সফল। ভিয়েতনাম, কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান, ইরাকসহ অনেক জায়গাতেই যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ হয়নি।
কোল্ড ওয়ার (শীতল যুদ্ধ) শেষ হওয়ার পর তো অনেকে ভেবেছিল, ইতিহাসে যুদ্ধের সমাপ্তি হতে চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল, ওয়াশিংটন আর তার মিত্ররা নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করল। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা দ্য এন্ড অব হিস্টোরি লিখে বুঝিয়ে দিলেন, লিবারেল গণতন্ত্র আর বাজার অর্থনীতি এখন মানুষের চূড়ান্ত গন্তব্য।
আমরা জানি, সেই স্বপ্ন বেশি দিন টেকেনি। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করল। আফগানিস্তান দখল করল, পরে ইরাকেও হামলা করল। দুই ক্ষেত্রেই যুদ্ধ দীর্ঘ হলো, কিন্তু ‘সম্পূর্ণ বিজয়’ এল না।
বিপরীতে আমেরিকার নৈতিক অবস্থান দুর্বল হলো, অর্থনীতি আর রাজনীতির ভেতরের সংকট বাড়ল। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়া, চীন, ইরানসহ আরও কয়েকটা রাষ্ট্র নতুন ধরনের ক্ষমতার ব্লক বা মিত্র তৈরি করতে শুরু করল।
২.
এখনকার ছবিটা মোটামুটি পরিষ্কার। কেন্দ্রে আছে তিন পরাশক্তি—আমেরিকা, রাশিয়া আর চীন। তিন দেশের তিন নেতার মুখও আমাদের চেনা—ট্রাম্প, পুতিন আর সি চিন পিং। তিনজনের চরিত্র আলাদা, কিন্তু একটা জায়গায় মিল আছে। সবাই নিজেদের স্বপ্নের মানচিত্র অনুযায়ী পৃথিবীকে সাজাতে চান।
পুতিনের স্বপ্ন ‘বড় রাশিয়া’। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনকে তিনি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি মনে করেন। জর্জিয়ায় হস্তক্ষেপ, ক্রিমিয়া দখল, তারপর ইউক্রেন আক্রমণ—সবই আসলে সীমান্ত বাড়ানোর রাজনীতি। জমি দখলের পুরোনো খেলা নতুন ভাষায় ফিরে এসেছে।
চীনের স্বপ্ন ‘ন্যাশনাল রেজুভেনেশন’, মানে চীনা জাতির পুনরুত্থান। দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ বানানো, সামরিক ঘাঁটি তৈরি, তাইওয়ান ঘিরে নিয়মিত মহড়া—সবই এই বড় প্রজেক্টের অংশ। এর সঙ্গে আছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন একদিকে বন্দর আর অবকাঠামো বানাচ্ছে, অন্যদিকে অনেক দেশে কৌশলগত প্রভাব বাড়াচ্ছে।
এদিকে আমেরিকা নিজেও বদলেছে। আগে সে নিজেকে ‘ফ্রি ওয়ার্ল্ড’ বা মুক্তবিশ্বের নেতা ভাবত। ইউরোপ আর মিত্রদের নিয়ে ন্যাটো, ব্রেটন উডস সিস্টেম, বহু চুক্তি—সব দিয়ে একটা নিয়মতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করত; একই সঙ্গে সেখান থেকে সুবিধাও নিত। ট্রাম্প-যুগ থেকে সেই নীতি অনেকটাই বদলে গেল।
কথার রাজনীতি, ফেসবুকের রাজনীতি, টক শোর রাজনীতির বাইরে এসে ঠান্ডা মাথায় ভাবা দরকার। আবেগপ্রবণ জাতীয়তাবাদ দিয়ে ফেসবুক দখল করা যায়, কিন্তু ভূরাজনীতি সামলানো যায় না।
প্যারিস ক্লাইমেট অ্যাগ্রিমেন্ট, ইরান নিউক্লিয়ার ডিল, নানা আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসা, মিত্রদের বারবার অপমান করা—এসব ঘটল খুব অল্প সময়ের মধ্যে। একদিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা আর ডলারের আধিপত্যকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাপ্লাই চেইন, তেল, গ্যাস, ডলার ট্রান্সজেকশন—সবকিছুই চাপ সৃষ্টি করার টুলে পরিণত হলো।
এ অবস্থাকে অনেকে ‘রুলস-বেজড অর্ডার’ বা আইনের শাসনের ভাঙন বলছে। আগেও নিয়ম ছিল, কিন্তু সব সময় মানা হয়নি। এখন সমস্যা হলো, যারা আগে অন্তত নিয়মের কথা বলত, তারাও যখন খোলাখুলি ‘যার শক্তি তার নিয়ম’ নীতি নিতে শুরু করেছে, এ রকম অবস্থায় ছোট আর মাঝারি দেশগুলোর অবস্থা বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
ভেনেজুয়েলার ঘটনা একটা উদাহরণ। আমেরিকা একতরফাভাবে সেখানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করল। নিরাপত্তা আর গণতন্ত্রের নামে যে ধরনের চাপ প্রয়োগ হলো, সেটা দেখিয়ে দিল, বড় শক্তিগুলো চাইলে আন্তর্জাতিক নর্মস বা নিয়মনীতি পাশ কাটিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়া আর চীনও নিজেদের স্বার্থে অনেক ক্ষেত্রে একই রকম আচরণ করছে; অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদ বা আধিপত্যবাদের প্যাটার্ন (ধরন) বদলেছে, কিন্তু স্বভাব বদলায়নি।
৩.
প্রশ্ন হলো, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো দেশের অবস্থান কোথায়?
এখন পর্যন্ত লিবারেল ওয়ার্ল্ড অর্ডার বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের জন্য কিছু সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছে। আমরা শান্তিরক্ষী পাঠিয়ে সম্মান আর অর্থ—দুটিই পেয়েছি; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোন (ঋণ) আর গ্র্যান্ট (অনুদান) পেয়েছি; নানা ট্রেড রেজিমের ভেতর দিয়ে গ্লোবাল ইকোনমির (বৈশ্বিক অর্থনীতি) সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। জাতিসংঘের মতো ফোরাম অন্তত একটা নৈতিক আশ্রয় দিয়েছে, যেখানে গিয়ে ছোট দেশও কথা বলতে পারত।
এখন যদি পুরো সিস্টেমটাই ‘জোর যার মুল্লুক তার’ মডেলে চলে যায়, তখন ছবি আলাদা হবে। আমাদের সামনে ইতিমধ্যে একটা উদাহরণ আছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের যেভাবে জোর করে সীমান্ত পার করেছে, সেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় খুব বেশি কিছু করতে পারেনি। বড় বড় শক্তির সিকিউরিটি আর বিজনেস ইন্টারেস্ট (নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ) সামনে চলে এসেছে। ফলে লাখ লাখ মানুষ বাংলাদেশের কাঁধে চেপে বসেছে; কিন্তু ‘রুলস-বেজড অর্ডার’ খুব একটা কাজ করেনি।
আমাদের স্পষ্ট কোনো ইন্ডিয়া পলিসি নেই, নেই চায়না পলিসি, নেই আমেরিকা পলিসি। ক্ষমতায় যে দল থাকে, পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় সেই দলের মুড দিয়ে চলে। ভারতপন্থী সরকার এলে একধরনের ভাষা, চীনা বিনিয়োগ এলে আরেক ধরনের ভাষা, ওয়াশিংটনের সিগন্যাল এলে আবার নতুন বয়ান।
এ পরিস্থিতিতে আমাদের ভেতরে আরেকটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা বেশি বিপজ্জনক। সেটা হলো জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি আর আত্মতুষ্ট জাতীয়তাবাদের মিশ্রণ। এখানে কৌশল আর প্রস্তুতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে হুংকার আর আবেগ। রাজনীতিবিদেরা জনতার সামনে বড় বড় কথা বলছেন, ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হচ্ছে, সবাই হাততালি দিচ্ছে; কিন্তু কেউ হিসাব করছে না, এ কথা ভবিষ্যতে আমাদের কী ধরনের কষ্ট দিয়ে মেটাতে হতে পারে।
ছোট আর মাঝারি শক্তির জন্য একটা সাধারণ নিয়ম আছে। বড় শক্তির সরাসরি দ্বন্দ্বে তাদের খেলার মাঠে গিয়ে লড়াই করা যায় না। সেখানে কিছু ন্যূনতম ‘প্রেডিক্টেবিলিটি রুল’ মানতে হয়। যেমন বৈশ্বিক বিতর্কে একদম ফ্রন্টলাইনে না গিয়ে একটু পেছনে থাকা, একই সঙ্গে সব পক্ষের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়া, নিজের সীমাবদ্ধতা জেনে তবেই রিস্ক (ঝুঁকি) নেওয়া।
ইউক্রেনের উদাহরণটা আমাদের সামনে। জাতীয় গর্ব আর সিকিউরিটি ক্যালকুলেশনের মধ্যে ঠিক হিসাব মেলাতে না পারলে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, সেটা পুরো বিশ্ব এখন চোখের সামনে দেখছে।
৪.
বাংলাদেশের সমস্যা আরেকটু আলাদা। আমাদের স্পষ্ট কোনো ইন্ডিয়া পলিসি নেই, নেই চায়না পলিসি, নেই আমেরিকা পলিসি। ক্ষমতায় যে দল থাকে, পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় সেই দলের মুড দিয়ে চলে। ভারতপন্থী সরকার এলে একধরনের ভাষা, চীনা বিনিয়োগ এলে আরেক ধরনের ভাষা, ওয়াশিংটনের সিগন্যাল এলে আবার নতুন বয়ান। মনে হয় যেন একই সঙ্গে সবাইকে ব্যবহার করব, সবাইকে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করব আর কেউ রেগে গেলে তখন গ্যালারির সামনে দাঁড়িয়ে একটু জাতীয়তাবাদী বুলি ছুড়ে দেব।
এ ধরনের বোধহীন খেলা ‘ফ্রি-ফ্লোটিং’ দ্বন্দ্বপূর্ণ বিশ্বে মারাত্মক। কারণ, বড় শক্তিগুলো যখন নিজেরাও বেশি নার্ভাস আর আগ্রাসী, তখন ছোটরা যদি খুব বেশি ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ হয়ে যায়, তখন তারা বড় শক্তির টার্গেটও হয়ে যেতে পারে, আবার তাদের অগ্রাহ্যও করা হতে পারে। দুই অবস্থাই আমাদের জন্য ভালো নয়।
প্রশ্নটা শেষ পর্যন্ত খুব সোজা। বাংলাদেশ কি বুঝতে পারবে যে ফরেন পলিসি আসলে ‘পার্টির পলিসি’ নয়, এটা জাতীয় নিরাপত্তার পলিসি। আমরা কি পারব, অন্তত কয়েকটা মূল বিষয় নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য করতে? যেমন আমাদের মূল স্বার্থ কী, কারও সঙ্গে দ্বন্দ্বে যাব না, কোথায় ‘রেড লাইন’, কোথায় আপস করা যায়, আর কোথায় আপস করা যাবে না।
এ ধরনের আলোচনা আমাদের পাবলিক পরিসরে নেই বললেই চলে আর নীতিনির্ধারণী সার্কেলে থাকলেও খুব সংকীর্ণ পরিসরে থাকে।
৫.
বিশ্বব্যবস্থা এখন সবচেয়ে ভঙ্গুর সময় পার করছে। এই ভাঙন আমাদের সুযোগও দিতে পারে, আবার বড় ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। ভারত আর চীনের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা আর স্বার্থরক্ষার নামে আরও বেশি আগ্রাসী হবে না, এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। তাই কথার রাজনীতি, ফেসবুকের রাজনীতি, টক শোর রাজনীতির বাইরে এসে ঠান্ডা মাথায় ভাবা দরকার। আবেগপ্রবণ জাতীয়তাবাদ দিয়ে ফেসবুক দখল করা যায়, কিন্তু ভূরাজনীতি সামলানো যায় না।
এখনকার প্রশ্ন তাই একটাই—আমরা কি এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের ঠান্ডা মাথার, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তা দিয়ে দাঁড় করাতে পারব, নাকি পুরোনো অভ্যাসে, মুহূর্তের আবেগে, জনতার তালি নিয়ে এমন কিছু করে ফেলব, যার দাম অনেক বছর ধরে গুনতে হবে?
● আসিফ বিন আলী ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো। ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব